kalerkantho


তাঁকে নিয়ে দুই গান

আজ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। দিনটিকে সামনে রেখে তাঁকে নিয়ে করা দুটি গানের গল্প নিয়ে এই আয়োজন।

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তাঁকে নিয়ে দুই গান

শোনো একটি মুজিবরের থেকে

কথা : গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার

সুর ও কণ্ঠ : অংশুমান রায় 

১৯৭১

 

শোনো একটি মুজিবরের থেকে

লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি

আকাশে বাতাসে ওঠে রণি

বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ

বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ

 

সেই সবুজের বুক চেনা মেঠো পথে

আবার যে যাব ফিরে আমার

হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাব

শিল্পে কাব্যে কোথায় আছে হায়রে

এমন সোনার দেশ

 

বিশ্বকবির সোনার বাংলা

নজরুলের বাংলাদেশ

জীবনানন্দের রূপসী বাংলা

রূপের যে তার নেই কো শেষ

বাংলাদেশ

 

জয় বাংলা বলতে বললে

আমার এখনো কেন ভাবো

হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাব

অন্ধকারের পুব আকাশে

উঠবে আবার দিনমণি

 

ভাস্কর রায় (অংশুমান রায়ের ছেলে)

১৩ এপ্রিল ১৯৭১। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ তখন আন্দোলনে উত্তাল।

দুই বাংলার শিল্পীরা প্রায়ই মিলিত হচ্ছিলেন আড্ডায়। এসব আড্ডায় আলোচনার মূল বিষয়  একটাই—মুক্তিযুদ্ধ। ১৩ এপ্রিলের আড্ডায় হাজির ছিলেন গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, অংশুমান রায়, দীনেন্দ্র চৌধুরী, উপেন তরফদারসহ অনেকে। সেখানে টেপ রেকর্ডারে শোনা হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। ভাষণের সঙ্গে ভেসে আসছিল জনতার সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। সেই সময়ই গানটি লিখে ফেলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। গানটি রচনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে সুর দিলেন বাবা (অংশুমান রায়)। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সঙ্গে সেই গান বাজানো হলো আকাশবাণী কলকাতায় সেদিন রাতে প্রচারিত ‘সংবাদ বিচিত্রা’ অনুষ্ঠানে। পরের দিন চারদিকে হইচই পড়ে গেল। যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাসহ সবার মুখে মুখে তখন এই গান।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিজে গানটির জন্য বাবাকে ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ড মেডেল’ দেওয়ার ঘোষণা দেন। বাবার কাছে আমন্ত্রণপত্র আসে। কিন্তু এরই মধ্যে আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত। এরপর বাবার আর বাংলাদেশে যাওয়া হয়নি। অনেক বছর পর ২০১২ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ সরকার গানটির জন্য বাবাকে ‘মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা’ ও ‘মরণোত্তর মুক্তিযোদ্ধা সম্মান’ প্রদান করে।

[বাংলা নিউজ থেকে]

 

যদি রাত পোহালে শোনো যেত

কথা : হাসান মতিউর রহমান

সুর ও কণ্ঠ : মলয় কুমার গাঙ্গুলী

১৯৯০

 

যদি রাত পোহালে শোনা যেত

বঙ্গবন্ধু মরে নাই

যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো

বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই, মুক্তি চাই, মুক্তি চাই

তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা

আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা

যদি রাত পোহালে শোনা যেত

বঙ্গবন্ধু মরে নাই

 

যে মানুষ ভীরু কাপুরুষের মতো

করেনি তো কখনো মাথা নত

এনে দিলে হায়েনার ছোবল থেকে

আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা, স্বাধীনতা, স্বাধীনতা  

তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা

আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা

যদি রাত পোহালে শোনা যেত

বঙ্গবন্ধু মরে নাই

 

কে আছে বাঙালি তাঁর সমতুল্য

ইতিহাস একদিন দেবে তাঁর মূল্য

সত্যকে মিথ্যার আড়াল করে

যায় কি রাখা কখনো তা, কখনো তা, কখনো তা

তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা

আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা 

যদি রাত পোহালে শোনা যেত

বঙ্গবন্ধু মরে নাই

 

হাসান মতিউর রহমান

১৯৯০ সালের কথা। আওয়ামী লীগের সম্মেলন হবে। সম্মেলনে পরিবেশনের জন্য বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে দুটি গানের পরিকল্পনা করা হয়। আমার করা ‘আমি বন্দি কারাগারে’সহ কয়েকটি গান তখন বেশ জনপ্রিয়। আওয়ামী লীগের এক নেতা আমাকে বলেন, আমি যেন মলয় কুমার গাঙ্গুলীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের পর রাতে গানটি লিখতে বসি। অনেক ভেবেও কোনো লাইন পাচ্ছিলাম না। ঠিক আজানের আগে একটা প্লট পেলাম। মনে হলো রাত তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই!’ সঙ্গে যোগ করলাম, ‘যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো বন্ধবন্ধুর মুক্তি চাই!’ এতে কল্পনায় বঙ্গবন্ধুকে যেমন বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে, তেমনি জেল থেকে তাঁকে মুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। এরপর পুরো গানটা শেষ করি। সকাল ১০টায় মলয় কুমার গাঙ্গুলীর কাছে নিয়ে যাই। লেখাটা পড়ে তিনি বলেন, ‘অসাধারণ হয়েছে। চলেন দুজন মিলে সুর নিয়ে বসে যাই। ’ লেখার সময় সুরের একটা আইডিয়াও মাথায় ছিল। সেটা শেয়ার করার পর তাঁর জন্য কাজটা আরো সহজ হয়ে যায়। সম্মেলনে গানটি তিনি লাইভ পরিবেশন করেন। শেখ হাসিনাসহ উপস্থিত সবার বেশ প্রশংসাও কুড়ান। তবে গানটি আলোচনায় আসে ১৯৯১ সালে। নির্বাচনের সময় এই গানের সঙ্গে আরো কিছু গান ও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ ‘জনতার নৌকা’ নামে একটি অ্যালবাম বের করি আমার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চেনাসুর থেকে। এক দিনেই সারা দেশে ছড়িয়ে যায় গানটি। ক্যাসেটটি কেনার জন্য মানুষ মারামারি পর্যন্ত করেছে। ভেরিয়েশনের জন্য ১৯৯৭ সালে গানটি সাবিনা ইয়াসমীনকে দিয়ে আবার গাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নেন নেত্রী। তাঁর সঙ্গে জীবনে যতবার দেখা হয়েছে ততবারই গানটির প্রশংসা করেছেন। বঙ্গবন্ধুভক্ত অসংখ্য মানুষের ভালোবাসাও পেয়েছি।

[অনুলিখন : রবিউল ইসলাম জীবন]

 

 


মন্তব্য