kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রথম রেকর্ডিং

প্রথম যেকোনো কিছুর গুরুত্বই একটু আলাদা। প্রথম রেকর্ডিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন শিল্পী

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রথম রেকর্ডিং

তপন মাহমুদ

১৯৬৯ সাল। আমি তখন ঢাকা মিউজিক কলেজে ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

মাত্রই ইস্ট পাকিস্তান প্রাদেশিক সংগীত ও নৃত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছি। সে সময়ই প্রথমবারের মতো গান রেকর্ডিংয়ের সুযোগ আসে। ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’ শিরোনামের এ গানটি ছিল বেতারের। শাহবাগে বেতারের নিজস্ব স্টুডিওতেই একদিন দুপুরে রেকর্ডিং হয়। সংগীতায়োজন করেন আবদুল আহাদ। তখন এখনকার মতো এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না। এক টেকেই গাইতে হতো। গাওয়ার পর আহাদ ভাই বলেছিলেন, ‘খুব ভালো হয়েছে। ’ এমন একটি গান দিয়ে আমার রেকর্ডিংজীবন শুরু বলতেও ভালো লাগে।

শাম্মী আক্তার

খুলনা বেতারের যাত্রা শুরু ১৯৬৯ সালে। সে বছরই আমার প্রথম গান রেকর্ডিংও সেখানে। তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেব। প্রথম অডিশন দেওয়ার পর তাঁরা বলেছিলেন, আমার গলা নাকি বাচ্চাদের মতো। আমাকে রাখাও হলো বাচ্চাদের দলে। এটা শুনে বাবা তো রেগেমেগে আগুন। আমাকে নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘তোমার গাইতে হবে না। গাইলে বড়দের সঙ্গে গাইবে। ’ মাস ছয়েক পর আবার অডিশন দিয়ে টিকি। রেকর্ডিংয়ে আমার প্রথম গান নজরুলের ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী’। রেকর্ডিংয়ের আগে খুব টেনশনে ছিলাম, ঠিকমতো গাইতে পারব তো! তিন-চারবার টেক দেওয়ার পর ওকে হয়ে যায়। শোনার পর উপস্থিত সবাই বেশ প্রশংসা করেন।

ফেরদৌস ওয়াহিদ

সালটা ১৯৭৪। যেদিন আমার প্রথম রেকর্ডিং, তার আগের রাতে একফোঁটাও ঘুমাতে পারিনি। সকালে কী খাব, কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সকাল ৯টার দিকে চলে যাই কাকরাইলের ঈপশা রেকর্ডিং স্টুডিতে। রেকর্ডিং শুরু সাড়ে ১০টায়। স্টুডিওর একজন কর্মচারী ছিল। সে জানতই না যে গানটি আমিই গাইব। বসার সময় স্টুডিওর একটা গিটার আমার শরীরে লাগে। সে আমাকে ধমক দিয়ে বলল, ‘এই মিয়া, সরেন। এভাবে বসছেন, গিটার পড়ে গেলে তো ভাঙবে! দাম দিতে পারবেন। ’ ঘটনাটি আমার সারা জীবন মনে থাকবে। যাক, কিছু চিন্তা, কিছু ভয় আর কিছু স্বপ্নের ঘোরে ভাসতে ভাসতে রেকর্ডিং শেষ হলো বিকেল সাড়ে ৫টায়। যখন বলতে শুরু করলেন—ভালো গেয়েছি, এই গান মানুষের পছন্দ হবে, তখনই খেতে গেলাম। আর সেই গানটি হলো ‘এমন একটা মা দে না’।

ফেরদৌস আরা

প্রথম গান রেকর্ডিংয়ের আগেই ১৯৭২ সালে বিটিভির একটি লাইভ অনুষ্ঠানে গান করি। তখন আমি সম্ভবত ক্লাস সেভেনে। ওই বয়সের শাড়ি পরে গানটি করেছি! সেটা দেখে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। আজমল হুদা মিঠু সাহেব তো তাঁর ছবিতে নায়িকা হওয়ার অফারও দিয়ে বসেন। এরপর খুরশিদ আলমের সঙ্গে ছবির একটি গানে হামিং দিই। তবে আমার প্রথম রেকর্ডিং ১৯৭৩-৭৪ সালে, বাংলাদেশ বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসে। সুরকার এ এইচ মো. রফিক ডাকলেন আধুনিক গান গাইতে। অথচ আমি তখন নজরুলের গান করি। রেকর্ডিংয়ে যাওয়ার পর আমার মাথার ভেতর তখন একটাই ভাবনা, কখন গানটি শেষ হবে আর কখন খেলতে বের হব। অল্প সময়েই গানটি করে ফেলি। পরদিন সুরকার ওস্তাদ কাশেম সাহেব এলেন বাসায়। বাবাকে বললেন, ‘আপনার কোন মেয়ে রেডিওতে গান করেছে?’ বাবা জিজ্ঞেস করলেন— কেন, কী হয়েছে? তিনি বললেন, ‘সে তো অসাধারণ গেয়েছে। পুরো রেডিওপাড়া গমগম করছে। সবাই তার গানের প্রশংসা করছে। ’ তিনি সেই গানটি শুনতে চান। শোনানোর পর বেশ আশীর্বাদ করেন।

ন্যান্সি

১৯৯৬ সালের কথা। আমি তখন ক্লাস টু কি থ্রিতে। তখন ‘আমরা সবাই রাজা’ গানটি বাড়িতে চর্চা করতাম। একদিন মা বললেন, ‘বেতারে তোর গান রেকর্ডিং হবে। ’ বিষয়টি নিয়ে তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত। আমিও খুব আনন্দিত ছিলাম। বেতারেও সম্ভবত এই গানটিই প্রথম রেকর্ডিং করেছি। যতটুকু মনে আছে, মিউজিকটা ছিল খুবই হালকা। সময় ছিল অল্প। কারণ আরো অনেকে অপেক্ষা করছিলেন গাওয়ার জন্য। ভয়েস দেওয়ার সময় আমার সামনে দাঁড়ানো ছিলেন মা। আমি তো ভয়ে কাঁপছি। কারণ একটু ভুল হলেই বকবেন! যাক, শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই পার করি। এর পর থেকে বেতারে নিয়মিতই বাচ্চাদের গান গাইতাম।

অনুলিখনউল ইসলাম জীবন


মন্তব্য