kalerkantho


আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস

রোহিঙ্গা শিবিরে ৩৩ ভাগ নারীই নির্যাতনের শিকার

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:২৪



রোহিঙ্গা শিবিরে ৩৩ ভাগ নারীই নির্যাতনের শিকার

ছবি: কালের কণ্ঠ

আজ ৮ মার্চ। আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের নারী দিবসটি এমন সময়েই পালন করা হচ্ছে যখন প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা নারীদের ওপর চলছে ভয়াল নির্যাতনের ঘটনা। মিয়ানমারের সেনা, সীমানরক্ষী-বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) এবং উগ্র রাখাইনদের হত্যা, ধর্ষণ ও ভয়াল নির্যাতনের শিকার হয়ে বানের স্রোতের মতো রোহিঙ্গা নারী-শিশুরা পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে বাংলাদেশে। কত নারী হারিয়েছে ঘরবাড়ি ও তার সম্ভ্রম। কত নারী হারিয়েছে তার পিতা-মাতা, স্বামী-সন্তানসহ ঘনিষ্ট আপনজনকে-তার হিসাব মিলানো মুশকিল।

রোহিঙ্গা শিবিরের চিকিৎসা কেন্দ্র এবং বস্তিগুলোতে নির্যাতিত নারীদের আহাজারিতে এখনো পরিবেশ ভারি হয়ে রয়েছে। কত নারী গণধর্ষণের শিকার হয়ে বাক শক্তি হারিয়েছে-তারও কোনো ইয়ত্তা নেই। মায়ের সামনে কন্যা হয়েছে ধর্ষণের শিকার। আবার গণধর্ষণের শিকার হয়েছে মা এবং কন্যা এক সাথে-এরকম ঘটনারও কমতি নেই। হাজার হাজার নির্যাতিত নারী ডুকরে কাঁদছে রোহিঙ্গা শিবিরের ঝুপড়িতে। রাখাইনে গত বছরের ২৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েই সবচেয়ে বেশী নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা-এনজিও কর্মীদের তথ্য মতে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়াদের মধ্যে কমপক্ষে শতকরা ৩৩ ভাগ নারী সরাসরি নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে নারীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা জাগো নারী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শিউলী শর্মা কালের কণ্ঠকে জানান, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা নারীরা কি রকম বর্বরতার শিকার হয়েছেন তা বুঝতে পারছি এখানে কাজ করতে এসেই। না হলে আমি এ বিষয়ে একদম অজ্ঞ থাকতাম।

তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, শতকরা হিসাবে ৩৩ ভাগ নারী নির্যাতিত হয়েছেন মিয়ানমার বাহিনীর হাতে। রোহিঙ্গা নারী নির্যাতনের একটি ভয়াল ঘটনার তথ্য দিয়ে শিউলী শর্মা আরো বলেন, কুতুপালং-২ নম্বর শিবিরে আমেনা খাতুন নামের একজন নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারী রয়েছেন যিনি পুরুষ দেখলে যেমনি ভয় পান তেমনি নারী দেখলেও ভয় পান। এসব কারনে এই রোহিঙ্গা নারীকে বস্তির কক্ষের বাইরে কোনোভাবেই বের করা যায় না।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের (আরআরআরসি) এক তথ্যে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১৮ বছর থেকে ৫৯ বছর পর্যন্ত বয়সের নারীর সংখ্যা হচ্ছে ২ লাখ ২ হাজার ২৬১ জন। আর ১২ থেকে ১৭ বছরের কিশোরীর সংখ্যা ১৮ হাজার ৬৬০ জন। তবে সরকারি এই কার্যালয়ে নির্যাতিত নারীদের কোনো সঠিক তথ্য না থাকলেও বেসরকারি সংস্থাগুলোর দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী নির্যাতিত নারীর সংখ্যা বেশ উদ্বেগজনক।

রাখাইনে নির্যাতনের এমনই শিকার এক রোহিঙ্গা কিশোরী শফিকা বেগম (১৫) এবং আরেক রোহিঙ্গা তরুণী রাজুমা বেগম (২০)। এই কিশোরী এবং তরুণীর হারানোর আর কিছুই বাকি নেই। সবই হারিয়ে ফেলেছে তারা। শফিকার বিয়ে হয়নি এখনো। রাজুমা হারিয়েছে তার স্বামী ও কয়েক মাস বয়সের শিশু সন্তানকেও। এমন বয়সেই তারা নিজের চোখে দেখেছে আপনজনদের বেয়নেট, গুলিতে, পিটিয়ে, ধারালো দা দিয়ে জবাই করে সর্বোপরি আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করতে। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে (সাবেক আরাকান রাজ্য) এই রোহিঙ্গা প্রজন্ম মিয়ানমার বাহিনী ও উগ্র রাখাইনের ভয়াল নির্যাতনে হারিয়েছে নিজের বাবা, মা, ভাই-বোন, স্বামী-সন্তান ও ভাবিসহ ঘনিষ্টজনদের। রাখাইনে বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা নিজেরাও। এরপর প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেয়।

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত যেমনি কক্সবাজারে তেমনি বিশ্বের বড় শরণার্থী শিবিরটির অবস্থানও এখন বাংলাদেশের কক্সবাজারে। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরটিই এখন বিশ্বের বৃহত্তম শরনার্থী শিবির। রোহিঙ্গা কিশোরী শফিকা বেগম এবং রোহিঙ্গা তরুণী রাজুমা বেগম  কুতুপালং বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা। গত রবিবার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের এ-ওয়ান ব্লকের বস্তিতে আলাপ হয় নির্যাতিত কিশোরী শফিকা ও তরুণী রাজুমার সাথে। আগুনে পুড়ে শফিকার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ক্ষত বিক্ষত অবস্থা। আর রাজুমাও নির্যাতনে কাতর এখনও। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু থানার তুলাতলী গ্রামের বাসিন্দা তারা দু’জনই।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের সরকারি নিরাপত্তারক্ষীদের প্রায় ৩০ টি চেক পোস্টে এক যোগে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল। এই হামলায় বেশ ক’জন সরকারি নিরাপত্তারক্ষী হতাহত হয়েছিলেন। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অংসান সুচি’র নেতৃত্বাধীন মিয়ানমারের বর্বর সরকার সেই ২৫ আগস্টের হামলার ঘটনার দায় চাপায় দেশটির সংখ্যালঘু জাতি রোহিঙ্গাদের ওপর। সেই ঘটনার জের ধরেই সেদেশের সেনাবাহিনী নির্বিচারে গণহত্যায় নেমে পড়ে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এ সময়। হত্যা, গণধর্ষণ, লুণ্ঠণ, নির্যাতন থেকে শুরু করে সেনা সদস্যরা অব্যাহত রাখে রোহিঙ্গা নিধনের ঘটনা।

এমন মানবতা বিরোধী অপরাধের বিবরণ দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা কিশোরী শফিকা বেগম জানায়, সেদিন ছিল ৩০ আগস্ট বুধবার। এ দিনটি তার জীবনের জন্য একটি ভয়াল দিন। এই বুধবারেই সে হারিয়েছে তার বাবা অলি আহমদ, মা ফিরোজা খাতুন, চার ভাই যথাক্রমে সৈয়দুল আমিন, মোহাম্মদ আমিন, আবু তৈয়ব ও আবু তাহের, দুই বোন ফাতেমা খাতুন ও ছেনুয়ারা বেগম এবং তিন ভাবি যথাক্রমে হাসিনা বেগম, অজিদা বেগম ও সনজিদা বেগমসহ পরিবারের মোট এগার সদস্যকে। তের সদস্যের পরিবারটির মাত্র দু’জন বেঁচে আছে। একজন শফিকা এবং অপরজন তারই বড় বোন শওকত আরা বেগম।

কিশোরী শফিকা জানায়, মিয়ানমার বাহিনী সেদিন সকাল ৮টার দিকে তুলাতলী গ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। গ্রামের চারিদিকে ঘিরে ফেলে সেনারা একদিক থেকে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করে দেয়। সেনারা তাদের ঘরের কাছাকাছি পৌঁছলে ঘরের সব সদস্যরা দৌঁড়ে পার্শ্বের খালের বালুচরে নেমে পড়ে। খালের সেই বালুচরে সেনারা গিয়ে পুরুষদের এবং নারীদের পৃথক করে ফেলে। বর্বর সেনা ও মিয়ানমারের উগ্র রাখাইন লোকজন ধারালো দা, ছুরি ও গুলিতে নারীদের চোখের সামনেই বালুচরে জড়ো করা পুরুষ সদস্যদের নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে।

কিশোরী শফিকা চোখের পানি মুছে বলে, বালুচরে সেদিন শত শত পুরুষকে ওরা হত্যা করেছে। কাউকে জবাই করে, কাউকে গুলিতে বা কাউকে হত্যা করেছে পিটিয়ে। এখানেই আমার বাবা ও চার ভাইকে হত্যা করা হয়।

বালুচরে রোহিঙ্গা পুরুষদের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এবার আসে রোহিঙ্গা নারীদের পালা। সেই বালুচর থেকেই সেনারা সুন্দরী নারীদের বাছাই করে নিয়ে যায়। কিশোরী শফিকাকে তার মা ও বোন এবং তিন ভাবীকে ধরে সেনারা এক সাথে নিয়ে যায় তাদের ঘরে। ঘরের ভিতর এক পর্যায়ে তাকে লাঠি দিয়ে একটি আঘাত করে সেনারা। সেই আঘাতে হুঁশ হারায় শফিকা।

এর পর তার মা-বোন ও ভাবীদের ভাগ্যে কি ঘটেছে সে জানেনা। তবে আগুনের প্রচণ্ড তাপে তার জ্ঞান ফিরে আসে। দেখতে পায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে ঘরে। আগুনের লেলিহান শিখা ততক্ষণে তার চারিদিকে গ্রাস করেছে। এমন অবস্থায় সে পালিয়ে আশ্রয় নেয় ভিটার শেষ দিকে ল্যাট্রিনে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত দ্বগ্ধ হয়ে গেছে শরীরের বিভিন্ন অংশ। দিনের বাকি অংশ এবং এক রাত ল্যাট্রিনে লুকিয়ে থাকার পর পরের দিন পাহাড়ে গা ঢাকা দেয় কিশোরী। সেই পাহাড়েই গ্রামের আরো ক’জন নির্যাতিত নারীর দেখা হয়। সেখানে তিন নারীর দেহের বিভিন্ন অংশে রয়েছে কাটা দাগ।

পাহাড়ে একটানা তিন দিন কাটানোর পর ৫ নারী এক সাথে রওয়ানা দেয় বাংলাদেশের পথে। পুরো একদিন হাঁটার পর নাফ নদের পূর্বে মিয়ানমারের বালুখালী পৌঁছে তারা। সেখানে এসে শফিকা আর হাঁটতে পারেনা। বাংলাদেশমুখী অন্যান্য রোহিঙ্গারাই তাকে ভার করে নিয়ে আসে কুতুপালং শিবিরে। আগুনে দ্বগ্ধ শফিকা কুতুপালং শিবিরের এমএসএফ হাসপাতালে টানা দেড় মাস চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়। রাখাইনের তুলাতলি গ্রামের তের সদস্যের এই পরিবারটির এক সদস্য অর্থাৎ কিশোরী শফিকার বড় বোন শওকত আরা বেগম তখন অন্য গ্রামে শ্বশুর বাড়িতে থাকায় সেও বেঁচে গেছে। বর্তমানে দুই বোন বসবাস করছে কুতুপালং শিবিরে। নুরুল আমিন নামের তাদের এক মামা রয়েছেন এখানে।

রাখাইনের তুলাতলি গ্রামের হতভাগি রাজুমা বেগমেরও একই দশা। একই দিন মিয়ানামারের সেনারা হত্যা করে রাজুমার বাবা আবদুস শুকুর, মা সুফিয়া খাতুন, ছোট বোন রোকেয়া বেগম ও রুজিনা বেগম, দুই ভাই মুছা আলী ও রজব আলী, ভাবি খালেদা বেগম এবং রাজুমার স্বামী ছাদেক ও শিশু সন্তানসহ পরিবারের নয় সন্তানকে। সেনাদের নির্যাতনের পরেও অলৌকিকভাবে বেঁচে রয়েছেন রাজুমা ও তার জ্যেষ্ঠ ভাই রমজান আলী। রাজুমা হারিয়েছে তার স্বামী ও কয়েক মাস বয়সের শিশু সন্তান এবং ভাই রমজান হারিয়েছে তার প্রিয়তমা স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের। এখন ভাই-বোন রয়েছেন কুতুপালং শিবিরে।

রোহিঙ্গা শিবিরে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন এমন একজন নারী সংবাদকর্মী আইরিন আকতার জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা নারীরা বেশ পর্দানসীন। তাই নির্যাতনের শিকার অনেক নারীই সহজে মুখ খুলতে চায় না।



মন্তব্য