kalerkantho


মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তিতে যা আছে

মেহেদী হাসান, কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২৬ নভেম্বর, ২০১৭ ১৪:০২



মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তিতে যা আছে

মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ গত বৃহস্পতিবার যে চুক্তি করেছে তাতে গত বছরের ৯ অক্টোবরের পর থেকে এ দেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার কথা বলা আছে। এর আগে যে রোহিঙ্গারা এসেছে তাদের প্রত্যাবাসনে নতুন করে চুক্তি করতে হবে এমনটিও বলা আছে ওই চুক্তিতে।

অর্থাত্ এ চুক্তির মাধ্যমে ইতিপূর্বে যে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তাও স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।  

চুক্তির বিশেষ বিশেষ দিকগুলো নিম্নরূপ--

টেকসই সমাধানের আশা : সই হওয়া চুক্তির শুরুতেই বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর ঢলসহ বিভিন্ন সমস্যা শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রেখে পারস্পরিক বিশ্বাস, বোঝাপড়া ও সদিচ্ছার ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ ও আন্তরিকভাবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আগ্রহ পূণর্ব্যক্ত করেছে।  

মিয়ানমারের সমাজে অন্তর্ভূক্ত করার চেষ্টা : গত ২২ নভেম্বর নেপিডোতে আলোচনায় বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের বাসিন্দাদের টেকসই ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত ও সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্টগুলো বিবেচনা করা হয়েছে। এরপর রাখাইন রাজ্যের বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের বাসিন্দাদের দ্রুত ফিরে যাওয়া এবং মিয়ানমারের সমাজে তাদের অন্তর্ভূক্ত করতে নীতি ও উপায়গুলোর বিষয়ে একমত হওয়ার কথাও চুক্তিতে বলা হয়েছে। সাধারণ নীতি হিসেবে চুক্তির প্রথম দফাতেই বলা হয়েছে, ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে শুরু হবে। উভয় পক্ষ সম্মত সময়ভিত্তিক উপায়ে এটি সম্পন্ন হবে।

ফিরে যাওয়ার পর নাগরিকত্ব পরীক্ষা : চুক্তির দ্বিতীয় দফায় বলা হয়েছে, মিয়ানমার তার বাসিন্দাদের বাংলাদেশমুখী স্রোত থামাতে, উত্তর রাখাইন রাজ্যে স্বাভাবিক পরিস্থিতি পূণঃপ্রতিষ্ঠায় এবং মিয়ানমার ছেড়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে তাদের প্রত্যাশানুযায়ী নিজেদের মূল বাসস্থান বা বাসস্থানের নিকটতম নিরাপদ ও সুরক্ষিত স্থানে ফিরে যেতে উত্সাহিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। ওই দফাতেই আরো বলা হয়েছে, ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের অস্থায়ী কোনো স্থানে দীর্ঘ মেয়াদে না রাখা এবং বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী তাদের রাখাইন রাজ্যে চলাফেরার স্বাধীনতার উদ্যোগ নিতে মিয়ানমার সব ধরনের উদ্যোগ নেবে। ফিরে যাওয়ার পরপরই তাদের জাতীয় পরিচয় যাচাইয়ের জন্য পরিচয়পত্র দেবে।

অতীতে বসবাসের প্রমাণ লাগবে : চুক্তির তৃতীয় দফায় বলা হয়েছে, ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া জাতীয় পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া থেকে আলাদা হবে। জাতীয় পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া হলো রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরার প্রক্রিয়ার ভিত্তি হবে মিয়ানমারে অতীতে তাদের বসবাসের প্রমাণ।
 
জাতিসংঘকে সম্পৃক্তরণ : চুক্তির চতুর্থ দফায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সরকারগুলো স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে প্রয়োজন হলে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করবে। বাংলাদেশ অনতিবিলম্বে স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ইউএনএইচসিআরকে সম্পৃক্ত করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ও যথাসময়ে ইউএনএইচসিআরের সহযোগিতা নিতে মিয়ানমারও রাজি হয়েছে।

দায়মুক্তি : চুক্তির পঞ্চম দফায় বলা হয়েছে, যারা ফিরে যাবেন তাদের বিরূদ্ধে সন্ত্রাসী বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট মামলা না থাকলে মিয়ানমার তাদের অবৈধভাবে দেশ ত্যাগ ও ফেরার জন্য অপরাধী হিসেবে বিবেচনা (বিচার বা শাস্তি) করবে না।  

ফিরে যাওয়ার শর্ত : ফেরার জন্য যোগ্য ব্যক্তি হওয়ার শর্তাদি রয়েছে চুক্তির ষষ্ঠ থেকে দশম দফায়। ষষ্ঠ দফায় বলা হয়েছে, গত বছরের ৯ অক্টোবর ও এ বছরের ২৫ আগস্ট সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে মিয়ানমার থেকে বাস্তচ্যুত ব্যক্তিদের সম্পর্কে যদ্দূর সম্ভব তথ্য বাংলাদেশ ওই দেশটিকে দেবে। এরপর ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার আগে মিয়ানমারের বাসিন্দা থাকার তথ্যগুলো খুঁজে বের করতে উভয় পক্ষ দ্রুত সম্পৃক্ত হবে।

মিয়ানমারে ফেরার জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার শর্তগুলো হলো-১. তাদের অবশ্যই মিয়ানমারের বাসিন্দা হতে হবে, ২. স্বেচ্ছায় মিয়ানমারের ফেরার আগ্রহ থাকতে হবে, ৩. বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবারগুলোর সদস্যদের এবং তাদের ছেড়ে যাওয়া সদস্য ও পিতৃমাতৃহীন শিশুদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আদালতের প্রত্যয়ন প্রয়োজন হবে, ৪. মিয়ানমার সীমান্তের বাইরে জন্ম নেওয়া শিশুর বাবা, মা- দু’জনকেই মিয়ানমারের বাসিন্দা হতে হবে, এবং ৫. অযাচিত ঘটনায় জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য বাংলাদেশের আদালতের প্রত্যয়ন প্রয়োজন হবে।

ষষ্ঠ দফায় আরো বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা ছিল কি না তা যাচাইয়ের জন্য ফিরতে আগ্রহীদের ফরম পূরণ করতে হবে। চুক্তির সপ্তম দফায় বলা হয়েছে, ফিরতে আগ্রহী ব্যক্তিদের তালিকা বা তথ্য বাংলাদেশ সরবরাহ করার পর মিয়ানমার ব্যাচওয়ারি তাদের সবাইকে সপরিবারে গ্রহণের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত প্রমাণ বা তথ্য চাইবে।

এগুলো হলো ১. মিয়ানমারের বাসিন্দা ছিলেন এমন ডকুমেন্টের অনুলিপি। যেমন পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ নাগরিক পরিচয়পত্র/ জাতীয় নিবন্ধনপত্র/ অস্থায়ী নিবন্ধনপত্র (সাদা কার্ড) ও সংশ্লিষ্ট মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দেওয়া অন্যান্য ডকুমেন্ট; ২. অন্যান্য ডকুমেন্ট হিসেবে মিয়ানমারে আবাসিক ঠিকানা উল্লেখ আছে এমন ব্যবসা মালিকানা সংক্রান্ত ডকুমেন্ট, স্কুলে হাজিরা সংক্রান্ত ডকুমেন্ট বা এ সংক্রান্ত ডকুমেন্ট প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হবে।  

সংখ্যা বিবেচ্য নয় : চুক্তির অষ্টম দফায় বলা হয়েছে, ইউএনএইচসিআরের দেওয়া শরণার্থী সংক্রান্ত ডকুমেন্টধারীদের ক্ষেত্রেও অভিন্ন যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। চুক্তির নবম দফায় বলা হয়েছে, মিয়ানমারের বাসিন্দা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে পারা ব্যক্তির সংখ্যা যাই হোক না কেনো তা তাদের প্রত্যাবাসনে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না।

মিয়ানমারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত : চুক্তির দশম দফায় বলা হয়েছে, মিয়ানমারে ফিরতে আগ্রহী ব্যক্তিদের যোগ্যতা নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে তা নিরসনের জন্য দুই পক্ষ সব ডকুমেন্ট ও তথ্য নিয়ে বসবে। পরিচয় যাচাই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মিয়ানমার। মিয়ানমারে ফিরতে আগ্রহী ব্যক্তিদের যোগ্য কি না তা নিয়ে বিরোধ মিয়ানমার যত দ্রুত সম্ভব এবং সম্ভব হলে ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করবে।

আরো দলিল সই হবে : মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া ব্যবস্থার অন্যান্য নীতি সংক্রান্ত বিষয় স্থান পেয়েছে চুক্তির একাদশ থেকে উনিশতম ও শেষ দফায়। উভয় দেশ প্রত্যাবাসনবিষয়ক সব দিক দেখভালের জন্য তিন সপ্তাহের মধ্যে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠণে রাজি হয়েছে। যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের কর্মপরিধি উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে হতে হবে।

চুক্তির ১৩তম দফায় বলা হয়েছে, এই চুক্তি সইয়ের দুই মাসের মধ্যে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা এবং প্রথম ব্যাচ যাওয়ার পর যৌক্তিক সময়ের মধ্যে এটি সম্পন্ন করতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।  

চুক্তির ১৪তম দফায় আগ্রহীদের ফিরে যাওয়া, পূণর্বাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং মিয়ানমার সমাজের অংশ হিসেবে তাদের জীবন ও জীবিকা নির্বাহে সহযোগিতা করার যথার্থ ক্ষেত্রে  ইউএনএইচসিআর ও সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার পাশাপাশি আগ্রহী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলা হয়েছে।

সীমান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা : চুক্তির ১৫তম দফায় দুই দেশের সরকার সীমান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে সম্মত হয়েছে। ১৬তম দফায় উভয় দেশ এমন কোনো নীতি না নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে যা কোনো একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক। সব ধরনের সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও প্রতিবেশীর প্রতি বন্ধুসুলভ নয় এমন কাজ যেমন চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, মানব পাচারের বিরোধিতা করার বিষয়েও উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে এক দেশের অপরাধী বা সন্ত্রাসী আশ্রয় বা প্রশ্রয় না দেওয়ার বিষয়েও উভয় দেশ সম্মত হয়েছে।

আগামীতে প্রতিরোধ : চুক্তির ১৭তম দফায় বলা হয়েছে, ফিরে যাওয়া সম্পন্ন হওয়ার পর দুই দেশের সরকার অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া প্রতিরোধে সহযোগিতা করবে। উভয় দেশের সরকার এ ধরনের অবৈধ অভিবাসীদের নাগরিকত্ব বা বসবাসের সুযোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। অঅনুমোদিতভাবে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া ব্যক্তিদের ১৯৮০ সালের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতা চুক্তির সম্মত ধারা অনুযায়ী ফেরত পাঠানো হতে পারে।  

চুক্তির ১৮তম দফায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সরকার এ ধরনের সংকটের পূণরাবৃত্তি ঠেকাতে সমন্বিত ও টেকসই সমাধানের বিষয়ে কাজ করতে এবং রাখাইন রাজ্যবিষয়ক পরামর্শক কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ রয়েছে। চুক্তির শেষ দফায় বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ ও সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখা ও এ ব্যাপারে আরো উৎসাহিত করতে উভয় পক্ষের আগ্রহ স্থান পেয়েছে।  

চুক্তিপত্র


মন্তব্য