kalerkantho


মংডু খেকে কালের কণ্ঠকে এক রোহিঙ্গার মোবাইল

সাঁতার কেটে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে আসল ওরা ১১ রোহিঙ্গা

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০২:২৩



সাঁতার কেটে নাফ নদ পাড়ি দিয়ে আসল ওরা ১১ রোহিঙ্গা

নাফ নদ পাড়ি দেওয়ার কোন উপায়ন্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত ওরা ১১ রোহিঙ্গা সাঁতার কাটতে শুরু করেন। গতকাল বুধবার সকাল ৭ টা।

মিয়ানমারের নাফনদ তীরের নাইক্ষ্যংদিয়া নামক বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ থেকে সাঁতার কাটতে নামেন ওরা। লক্ষ্য ওদের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে সাঁতার কেটে শেষ পর্যন্ত ওরা পৌঁছেও যান শাহপরীর দ্বীপে। টানা আড়াই ঘণ্টা সাঁতার কেটে ১১ রোহিঙ্গা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে শাহ পরীর দ্বীপ জেটি ঘাটে পৌছে যান।

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে আরো হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পথে রয়েছে বলে গতকাল বুধবার রাখাইনের মংডু সুইজা দলিয়ার পাড়ার একজন রোহিঙ্গা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন। পাড়াটিতেও হাজার খানেক রোহিঙ্গা অপেক্ষায় রয়েছে এপারে পাড়ি দিতে। দুর্গম পাহাড়ের পথে পথে রোহিঙ্গারা অপেক্ষা করছে সংখ্যায় ভারি হবার জন্য। এক সাথে ৮/১০ হাজার হলেই দলবদ্ধভাবে এপারে পাড়ি দিতে রওয়ানা হবে রোহিঙ্গার ঢল।

টেকনাফের কোস্টগার্ড স্টেশন কমান্ডার লেঃ জাফর ইমাম সজীব জানান, প্লাস্টিকের খালি কন্টেইনার নিয়ে ওরা ১১ রোহিঙ্গা নাফনদে নিরাপদ সাঁতার দিয়ে নির্দ্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যান।

তিনি জানান, মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদিয়া দ্বীপ থেকে ওরা ১১ জন সাঁতরাতে নেমে ৫ জন আগে ভাগেই জেটিতে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। অপর ৬ জন তাদের অনেক পেছনে ছিল। বয়সেও ছিল তারা কম। নদের মাঝখানে তাদের সাঁতরাতে দেখে কোস্টগার্ড টহল দল ছুটে গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর বিজিবি’র হাতে হস্তান্তর করা হলে বিজিবি যথারীতি বালুখালী শিবিরে আশ্রয়ের জন্য পাঠিয়ে দেয়।

নাফনদে সাতাঁর কেটে আসা ওরা ১১ যুবক সবাই রাখাইন রাজ্যের ভুচিদং এলাকার পুইমারি, কাইন্দা পাড়া, আজলী পাড়া, কাঞ্জম পাড়া, ইসমাঈল পাড়া, তিংদং ও হরমুরু পাড়ার বাসিন্দা। ওরা যথাক্রমে ফয়েজুল ইসলাম, হামিদ হোসেন, কামাল হোসেন, মোহাম্মদ উল্লাহ, আনসার হোসেন, ইমাম হোসেন, মোহাম্মদ রিয়াদ, রমজান আলী, সৈয়দ হোসেন, মোহাম্মদ আরজ ও আবদুল মতলব। তাদের বয়স ১৫ থেকে ২৮ বছর।  

নাফনদ তীরের নাইক্ষ্যংদিয়া থেকে সাঁতার কেটে আসা রোহিঙ্গা যুবক ইমাম হোসেন (২০) জানান, তারা ভুচিদং পুইমারি গ্রাম থেকে ৮ দিন হেঁটে নাফনদ তীরের নাইক্ষ্যংদিয়া দ্বীপে এসে অপেক্ষায় থাকেন এপারে পার হবার জন্য। আসার পথে বেশ কয়েক স্থানে মিয়ানমারের সেনারা পেয়েছিল তাদের। সেনারা তাদের আসতে বারণ করেছিল। বাংলাদেশমুখী এসব রোহিঙ্গাদের সেনারা বলেছিল-তারা যেন এলাকায় ফিরে গিয়ে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে। কিন্তু রোহিঙ্গারা সেনাদের কথায় নিরাপদ মনে না করে নাফনদ পাড়ি দিতে রওয়ানা দেয়।

সাঁতরিয়ে আসা ভুচিদং কাইন্দা পাড়ার রোহিঙ্গা সৈয়দ হোসেন জানান, তারা নাইক্ষ্যংদিয়া দ্বীপে এসে এপারে আসার জন্য কোন ভাবেই নৌকা পাচ্ছিলেন না। খাবার-দাবারেরও অভাব সেখানে। শত শত লোক পাড়ি দিতে অপেক্ষা করছে দ্বীপটিতে। তারা সবাই বৃষ্টিতে ভিজছে আর রোদে পুড়ছে। পানিরও অভাব সেখানে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের উল্টোদিকে অবস্থিত দ্বীপটিতে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে একবার ঢুকে গেলে বের হবারও কোন সুযোগ নেই।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাঈনুদ্দিন খান জানান, নাফনদ তীরের এই দ্বীপ থেকেই গত রবিবার রাতে একটি ছোট নৌকায় ৫০/৬০ জনের রোহিঙ্গা চেপে বসে রওয়ানা দিয়েছিল শাহপরীর দ্বীপে। নাফনদের মোহনায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই হওয়ার কারণে এটি ডুবে যায়। ওই নৌকা ডুবিতে এ পর্যন্ত ৩০ জন রোহিঙ্গা যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

এদিকে রাখাইনের পথে পথে এখনো বাংলাদেশমুখি রোহিঙ্গার স্রোত রয়েছে। তাদের মধ্যে পূর্ব রাখাইনের বাসিন্দাদের বাংলাদেশ সীমান্তে এসে পৌঁছতে সময় লাগছে। ইতিমধ্যে গত সোমবার রোহিঙ্গাদের একটি বড় ঢল যার সংখ্যা ৩০/৩৫ হাজার ঢুকে পড়েছে উখিয়ার পালংখালী সীমান্ত দিয়ে। এরকম আরো বেশ কয়েক দফায় রোহিঙ্গা ঢল ঢুকার অপেক্ষায় রয়েছে বলে এপারে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছে।

রাখাইনের মংডু টাউনশীপের মাইল দুয়েক দূরত্বের সুইজা দলিয়ার পাড়া থেকে একজন রোহিঙ্গা গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠ’র এ প্রতিবেদককে মোবাইলে এসব তথ্য জানিয়েছেন। অনুরুপ তথ্য জানা গেছে, মঙ্গলবার এপারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিকটও। রোহিঙ্গারা জানান, বাংলাদেশমুখি দলে কম সংখ্যা হলে সেনারা ঝাপ্টা মেরে সর্বস্ব কেড়ে নেয়।  

মংডু টাউনশীপের নিকটস্থ সুইজা দলিয়ার পাড়ার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক (নিরাপত্তা জনিত কারণে) রোহিঙ্গা জানান, গ্রামটিতে হাজার খানেক রোহিঙ্গা অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে। তারা সবাই দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। দিন মজুরি করেই জীবিকা নির্বাহ করে। চোখ বুজে অবস্থান করে আসছিল গ্রামটিতে। তাদের ধারণা ছিল-হয়তোবা মাস খানেকের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্ত দিন দিন সেই ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। তাই তারা এপাওে পাড়ি দিতে চান। কিন্তু তাদের টাকা-পয়সা নেই।

মংডু টাউনশীপের নিকটস্থ সুইজা দলিয়ার পাড়ার এই বাসিন্দা জানান, আমার নিকটাত্মীয় যারা কুতুপালং শিবিরে রয়েছে তাদের সাথে যোগাযোগ করে আপনার (কালের কণ্ঠ’র এ প্রতিবেদক) মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেছি। আমরা এখানে শুনেছি বাংলাদেশের অনেকেই রয়েছেন যারা অসহায় রোহিঙ্গাদের রাখাইন থেকে নিতে সহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন। ’

তিনি বলেন, তাদের নিকট এখন টাকা-পয়সা নেই। কোন সুযোগ নেই ঘরের বাইরেও বের হবার। তাই আয়-রোজগার বন্ধ। ক্ষেত-খামারে যাওয়া অসম্ভব। এক কেজি চালের দাম ৫০০ টাকারও বেশী। চালের এ দাম রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ঘরে মওজুদ করা খাবার শেষ। বড়ই দুর্দিন চলছে।

মংডুর রোহিঙ্গা ব্যক্তিটি আরো জানান, মিয়ানমারের সেনারা কখন কি করে বসে সেটাই বলা মুশকিল। যদি বলি সেনারা নির্যাতন বন্ধ করেছে-পরক্ষণেই দেখা যায় নতুন করে শুরু করেছে। তাই এখানে সব কিছুতেই অনিশ্চিত অবস্থা।

তিনি জানান, মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে মিয়ানমারের একদল সেনা তাদের পাড়ায় হানা দেয়। সেনারা পাড়ার অর্থশালী ব্যক্তি সাদেকের ঘরে ঢুকে গোপনে অস্ত্র ফেলে দিয়ে সেই ঘরের দুই নারীকে তুলে নিয়ে গেছে।

এ সময় ঘরে কোন পুরুষ ছিলনা। নারীদের তুলে নিতে একটি অজুহাত সৃষ্টির জন্যই ঘরে অস্ত্র ফেলে দেওয়ার মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে সেনাদের। একই রাতে গ্রামের আরেক অর্থশালী ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ডিলার রশিদের ঘরেও সেনারা হানা দেয়। কিন্তু ঘরে কাউকে পায়নি সেনারা। মিয়ানমার সেনাদের হাতে সেখানে কেউ নিরাপদ নয় জানিয়ে তিনি বলেন-‘আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন। ’


মন্তব্য