kalerkantho


১৮ দিনে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয়

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৬:৪৯



১৮ দিনে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয়

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৪ আগস্ট রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩০টি চৌকিতে জঙ্গিগোষ্ঠী ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’র (আরসা) কথিত সন্ত্রাসী হামলার পর সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা হতাহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে গত ১৮ দিনে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা।

বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশ এরই মধ্যে ওই অভিযানকে সুস্পষ্ট গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বলছে, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৬০ শতাংশই শিশু। বাংলাদেশে অবস্থানরত অন্তত দুই লাখ রোহিঙ্গা শিশুর জীবন ঝুঁকিতে আছে। তাদের বাঁচাতে জরুরি সহযোগিতা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জায়িদ রাদ আল হুসেইন গত সোমবার দাবি করেছেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া এবং ইউরোপের ২৮টি দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), মুসলমান দেশগুলোর জোট ওআইসিসহ সারা বিশ্ব। তবু মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে কি না সেদিকে আজ দৃষ্টি থাকবে সবার। বৈঠকের ফলাফল আসতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের জাতিগত নিধনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা হওয়া একটি বড় অগ্রগতি।

এর আগেও গত বছরের নভেম্বর, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও আগস্ট মাসে রোহিঙ্গা পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা পরিষদে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছে। সেসব বৈঠকের প্রস্তাবক ছিল কখনো যুক্তরাষ্ট্র, কখনো বা যুক্তরাজ্য। তবে বৈঠকগুলোতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল চীন।

এর আগে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর চলমান বর্বরতায় শঙ্কিত হয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে গত সপ্তাহে নিরাপত্তা পরিষদকে নজিরবিহীনভাবে একটি চিঠি দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গত ২৫ ও ২৮ আগস্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপর ১ সেপ্টেম্বর তিনি গভীর উদ্বেগ জানিয়ে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

ঢাকার সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কূটনীতিকরা বলেছেন, নিরাপত্তা পরিষদ যদি রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয় এবং সহিংসতা বন্ধে মিয়ানমার সরকারসহ সব পক্ষকে আহ্বান জানায়, তবে সেটিও হতে পারে একটি বড় অর্জন। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যেও দেড় সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে বিষয়টি দ্বিতীয়বারের মতো নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে আলোচনার জন্য ওঠায় এর বৈশ্বিক গুরুত্ব ও ক্রমবর্ধমান প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে।

বিবিসি জানায়, গতকাল পেইচিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়টি আবার স্পষ্ট করা হয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেন, মিয়ানমার সরকার তাদের জাতীয় উন্নয়নের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার যে চেষ্টা করছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তার পাশে থাকা।

বিবিসি মনে করে, চীন মিয়ানমারের পক্ষে এই বিবৃতি দিয়েছে যাতে আজ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো নিন্দা প্রস্তাব আনা না যায়।

জাতিসংঘের কূটনীতিকদের উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো মাথা গলাক, সেটা চীন চায় না। একইভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব উঠলে রাশিয়াও তাতে কতটা সমর্থন দেবে তা নিয়েও সংশয় আছে।  

ঢাকার কূটনীতিকরা বলেছেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বোঝা বাংলাদেশের ওপর চাপার পর ঢাকা মস্কো ও পেইচিংকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ মনে করে, মিয়ানমার সরকারের শান্তি, শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বজায় রাখার পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তারা সে অধিকার প্রয়োগ করার নামে নিজেদের লাখ লাখ লোককে বাংলাদেশে ঠেলে দেবে। বাংলাদেশ মিয়ানমারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। কিন্তু এর আগে মিয়ানমারকে গণহত্যা থামাতে হবে। কারণ মিয়ানমারের গণহত্যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। দেশে মিয়ানমারের রোহিঙ্গার সংখ্যা ইতিমধ্যে আট লাখ ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ ঢাকায় সব বিদেশি রাষ্ট্রদূত বা মিশনপ্রধানদের কক্সবাজারে নিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে মিয়ানমারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান গত সোমবার নেপিডোতে মিয়ানমারের জাতীয় পরামর্শক দপ্তর বিষয়ক মন্ত্রী ইউ কিয়াও তিন্ত সুয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ভয়েস অব আমেরিকার বার্মিজ সংস্করণের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রদূত মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা ঢল, রাখাইনের স্থিতিশীলতা বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন। গতকালও তিনি মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, ওআইসি রোহিঙ্গা নিধন থামাতে ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘ ও ইইউর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ওআইসি মনে করে, মিয়ানমার ধারাবাহিকভাবে যে বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে তা বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক কাঠামো ব্যবহার করে জাতিসংঘ, ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্সসহ প্রায় সারা বিশ্বকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে খোদ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোট আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোতেই মতপার্থক্য আছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দেওয়ার ব্যাপারে যতটা আগ্রহী এ সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারকে চাপ দিতে বা আসিয়ানে বিষয়টি তুলতে ততটা আগ্রহী নয়। আগামী সপ্তাহে ম্যানিলায় অনুষ্ঠেয় আসিয়ান সদস্য দেশগুলোর আইন প্রণেতাদের বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনার প্রস্তাব মিয়ানমারের আপত্তিতে ইতিমধ্যে বাদ পড়েছে।

জানা গেছে, অং সান সু চি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকে যাচ্ছেন না। তাঁর পরিবর্তে সেখানে যাবেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ভান থিও। তিনিই সেখানে মিয়ানমার পরিস্থিতিতে বক্তব্য দেবেন। সাধারণ পরিষদের বৈঠকে বাংলাদেশ, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনের কথা তুলে ধরবে।


মন্তব্য