kalerkantho

Reporterer Diary

ভাবতেই পারিনি বেঁচে ফিরবো

এম সোহেল, রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি    

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৭:৪৭



ভাবতেই পারিনি বেঁচে ফিরবো

সন্ধ্যায় রাঙ্গাবালী প্রেসক্লাবে বসে জমিয়ে আড্ডা চলছিল। আড্ডার ফাঁকে এক সহকর্মী বলে উঠল, আমাদের পাশের ইউনিয়ন চালিতাবুনিয়ায় আগুণমুখা নদীর ভাঙনে দিশেহারা মানুষ। তাই আমরা দু-এক  দিনে ওখানে যেতে চাই। এর পর পরই কাকতালীয়ভাবে নদী ভাঙনের ওপর প্রতিবেদন তৈরির অনুরোধ জানিয়ে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের ফোন আসে আরেক সহকর্মীর ফোনে। এই সুযোগ। যেই কথা সেই কাজ। রাতেই ক্লাবের গ্রুপ ম্যাসেঞ্জারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো- আগামীকাল যাচ্ছি।

পরদিন সকালে উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরের কোড়ালিয়া লঞ্চঘাটে অবস্থান করলাম সবাই। ওইদিন বৈরী আবহাওয়ার কারণে লাইনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। আমি যেতে অনিচ্ছা পোষণ করি। এ সময় সহকর্মী যুগান্তরে সাংবাদিক কামরুল ভাই বলেন, ‘আজ যাবোই। ওখানে হাজারো মানুষের ভিটে-বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা মুহূর্ত তাদের কান্নায় ওখানকার আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। সেখানে আমাদের মতো কয়েকজন মানুষের জীবন ঝুঁকি নেয়া কোনো ব্যাপার না।’ 

তখন নদী পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছি, ওপারে উত্তাল নদীর উঁচু উঁচু ঢেউয়ের খেলা। সফরসঙ্গী আরেক সহকর্মী দৈনিক সংবাদের প্রতিনিধি বলে উঠলেন, ‘ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। আমরা আজ যাচ্ছি কথা ফাইনাল।’ কি আর করা, আমি মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে রাজি হয়ে গেলাম। এরপর ছোট একটা জেলে ট্রলারকে ১ হাজার টাকা চুক্তিতে ওপারে যেতে রাজি করালাম। ট্রলার ছুটল ওপারের উদ্দেশ্যে। 
ট্রলারটা যখন নদীর মাঝামাঝি যায়, তখনই বুঝতে পারি আগুণমুখা নদীর ভয়াবহতা। একেকটা ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল প্রায় ৮ থেকে ১০ ফুট। দুই ঢেউয়ের ভাঁজে যখন আমাদের ট্রলার অবস্থান করছিল, তখন দুপাশে পানি, আর ওপরে নীল আকাশ ছাড়া কিছুই দেখতে পাইনি। এভাবেই উত্তাল ঢেউয়ের সাথে ট্রলারের পৌনে এক ঘণ্টার যুদ্ধ চলে। ওপারের কূলে ভীড়তে আর দু’তিন মিনিটের ব্যবধান হয়তো, তখনই উঁচু এক ঢেউ ডেকের ওপর বসে থাকা সকলকে ভিজিয়ে দিল। এভাবে দীর্ঘ সময়ে পাড়ি দিয়ে আমরা ভাঙন কবলিত এলাকায় পৌঁছাই।

কূলে ভিড়তেই দেখি ওই এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্যসহ এলাকার শ খানেক মানুষ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। সাময়িক কুশলাদি বিনিময় শেষে নেমে পরলাম কাজে। নদী ভাঙন এলাকার স্থির চিত্র নেয়াসহ এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সাক্ষাৎরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য নোট করে নিলাম। এবার বাড়ি ফেরার পালা।

ওই এলাকার চেয়ারম্যান আমাদের আসার জন্য একখানা ট্রলার ভাড়া করে দিলেন। তখন দখিনের আকাশে হালকা মেঘ ছিলো। এক এক করে সকলে উঠে পরলাম ট্রলারে। ট্রলার ছুটল আমাদের নিয়ে। মিনিট দশেক যেতে না যেতেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পরতে শুরু করল।  আমরা সবাই ট্রলারের ছাউনির মধ্যে ঢুকে পড়লাম। এর কিছু সময় পরেই বাতাস বাড়তে লাগল, সাথে বৃষ্টি ফোঁটা। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই নদী উত্তাল হয়ে গেল। শুরু হলো ঝড়। আমরা ছাউনির মধ্যে থেকে সবাই বেরিয়ে পড়লাম। নদীর উত্তাল ঢেউয়ের সাথে দুলতে রইল ট্রলারখানা। তখন আমরা নদীর মাঝামাঝিতে, এমনটাই জানালেন মাঝি। আমরা খুবই ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবছি এখনই বুঝি নদীর গভীরে তলিয়ে যাবো। হয়তো বেঁচে ফেরা হবে না। এ সময় ইঞ্জিন রুমের পাশে থাকা দুটি লাইফবয়া দেখতে পাই। আমি দ্রুত ওখানে ছুটে গিয়ে বয়াগুলো নিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করি। মাঝি আমাদের নানাভাবে স্বান্তনার বাণী শোনালেও তিনি নিজেই আতঙ্কে ছিলেন। এভাবে দীর্ঘ সময়ে ঝড়ের মধ্যে ঝুঁকিতে ছিলাম। তখনও ভাবতে পারিনি বেঁচে ফিরবো আমরা। কিছু সময় পর ট্রলার এসে ভেড়ে ঘাটে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া থাকার কারণে ওইদিন আর ট্রলারের মাঝি ফিরতে পারেননি।
    
পরদিন কালের কণ্ঠ’র প্রিয় দেশ পাতায় 'আগুনমুখা নদীর গতিপথ পরিবর্তন, দিশেহারা ১৫ হাজার মানুষ রাঙ্গাবালীতে ভাঙন আতঙ্ক’ শিরোনামে  প্রকাশিত হয়। এভাবেই নানা প্রতিকূলতার মাঝে মফস্বল সাংবাদিকরা সংবাদ খুঁজে বেড়ান প্রতিনিয়ত। 



মন্তব্য