kalerkantho

Reporterer Diary

মুনজালা, বাংলাদেশ

মেহেদী হাসান   

২১ মে, ২০১৮ ১৬:১৯



মুনজালা, বাংলাদেশ

উরুমচি বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার পর গাড়ির চালক ও কর্মকর্তাদের কথোপকথনে একটি শব্দ বারবার কানে এলো। ‘মুনজালা’। দু’দিন পর চীনা এক সাংবাদিককে এর অর্থ জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, তারা চীনা ভাষায় বাংলাদেশকে বুঝিয়েছেন। 

ঢাকায় ফেরার সময় গুয়াংঝু বিমানবন্দরে ওই শব্দটি আবার শুনেছি। মাঝ বয়সী এক যাত্রী ফ্লাইটে ওঠার জন্য অপেক্ষমান তরুণী অপর এক যাত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘মুনজালা?’ ওই তরুণী অবশ্য হেসে আর কোনো উত্তর দেননি।

গুয়াংঝু থেকে শিনজিয়াঙের রাজধানী উরুমচিতে যেদে সরাসরি ফ্লাইটেই সময় লাগে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরের পর এ বছরের মে মাসে আবার আমার উরুমচি সফর। গত আড়াই বছরে উরুমচি অনেক বদলে গেছে। 

উরুমচি দিওপো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট নামলে নির্ধারিত সময়েরও প্রায় আধা ঘন্টা আগে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। তাই ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা নেই। লাগেজ বুঝে নিয়ে অ্যারাইভাল হলে অপেক্ষা। কেউ একজন নিতে আসবে। কিন্তু আমি তাকে চিনি না, নামও জানি না।

এই বিমানবন্দরে আগের বারের অভিজ্ঞতাটা ছিল কিছুটা ভিন্ন। আমরা কয়েক জন বাংলাদেশি সাংবাদিক বেইজিং থেকে উরুমচি পৌঁছার পর অপেক্ষা করছিলাম। তখনও আমাদেরকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। যিনি এসেছিলেন তিনি আমাদের একজনের নাম লেখা কাগজ ধরে অ্যারাইভাল হলে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু সেটি ছিল চীনা ভাষায়, যা আমরা জানতাম না। তখন বেশ কিছু সময় অপেক্ষার পর সেই ফোনালাপে সমস্যার সমাধান হয়েছিল।

এবারের প্রোগ্রামে বাংলাদেশ থেকে আমি একা। আগের বারের ভাষা সমস্যার বিষয়টি মাথায় রেখে এবার দাঁড়িয়ে ছিলাম অ্যারাইভাল হলের এক কোণায়। রিসিভ করতে আসা ব্যক্তিদের হাতে থাকা ইংরেজি নামগুলো এক এক পড়ছি। চীনা ভাষা জানি না। তাই চীনা ভাষায় লেখা নামগুলো পড়ার সাধ্য নেই। এভাবে প্রায় মিনিট দশেক চলার পর চোখে পড়লো বেশ দ্রুত ছুটে আসছে একজন। তাঁর হাতে থাকা একাধিক কাগজে নাম। হন্তদন্ত হয়ে তিনি আমার নাম লেখা কাগজটি তুলে ধরলে আমি গিয়ে পরিচয় দিলাম। বিলম্বের জন্য দুঃখপ্রকাশ করে তিনি বললেন, ফ্লাইটটি নির্ধারিত সময়ের আগে চলে এসেছে। তিনি নির্ধারিত সময় ধরেই এসেছেন। আরেকজন কর্মকর্তাকে দিয়ে আমাকে গাড়িতে পাঠালেন এবং বললেন আরো তিন জনের অপেক্ষা করছেন।

কিছুক্ষণ পরই পরিচয় হলো মরক্কোর চ্যালেঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক দ্রিস আল-আনদালুসির সঙ্গে। রাবাত থেকে প্যারিস, বেইজিং হয়ে তিনি উরুমচি এসেছেন। হোটেলে পৌঁছার পর আমরা উঠলাম পাশাপাশি কক্ষে। প্রোগ্রামে বা খাবারের জন্য রেস্টুরেন্টে—আমরা যেতাম একসঙ্গে। 

প্রথম দিনই দুপুরের খাবারের সময় আনদালুসি বললেন, বাংলাদেশের নাম তাঁর অনেক আগে থেকেই জানা। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছাত্র ছিলেন। বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার আগ্রাসনের খবর তারাও বিশ্বগণমাধ্যমে পড়েছেন। এর প্রতিবাদে ছাত্রদের বিক্ষোভে তিনিও যোগ দিয়েছিলেন।

আনদালুসি বাম রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সত্তরের দশকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক যুদ্ধ সম্পর্কে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন তাঁরা।

উরুমচিতে প্রথম দিন রাতে আদালুসি ও আমি একসঙ্গে হোটেলের বাইরে বেরিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য একটু হাঁটাহাটি আর হোটেলের চারপাশটা একটু ঘুরে দেখা। সমস্যা হলো স্থানীয় দোকানিদের বেশিরভাগই ইংরেজি জানে না। দোকানে গিয়ে নিজেই বেছে বেছে না হয় কোনো জিনিস বের করা গেলো। কিন্তু দাম? ওরা তো সেটিও বলে চীনা ভাষায়।

অবশ্য সমাধান বেরিয়ে গেলো সহজে। ওরা ক্যালকুলেটরে ইংরেজিতে দাম লিখে দেখালো। আমরাও দরকষাকষি করলাম সেই ক্যালকুলেটরে লিখেই।

একজন দোকানি অবশ্য মোবাইল ফোনে একজনকে ধরিয়ে দিলেন যিনি ইংরেজি বোঝেন। ফোনালাপের শুরুটাও হলো, ‘হু আর ইউ’, ‘হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট’, ‘হাউ মাচ ডো ইউ ওয়ান্ট টো পে’ এভাবে। শেষমেষ দামদর করেই জিনিস কেনা হলো। ভাষাগত ভিন্নতা, দূর্বোধ্যতা কোনো সমস্যা হলো না। কোনো কোনো দোকানে আবার এমন সেলসম্যান পাওয়া গেলো যারা ইংরেজি বোঝে।

দু’দিন পর আরেকটি ঘটনা ঘটলো। আনদালুসি আর আমি আবারও সন্ধ্যায় বের হয়েছি হোটেলের বাইরে। আনদালুসি হোটেলের বাইরে বার খুঁজছে। পথে এক তরুণীকে থামিয়ে আনদালুসি ইংরেজিতে জানতে চাইলো, আশেপাশে কোথায় ‘বার’ আছে? 

ওই তরুণী ও তাঁর সঙ্গী নিজেদের মধ্যে চীনা ভাষায় কতক্ষণ কথা বলে আমাদের বললো তাদের অনুসরণ করতো। আমরা বুঝতে পারছি ওরা আমাদের হোটেলের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। আনদালুসি আর আমার কথোপকথন শুনে ওরাই হয়তো বিষয়টি বুঝতে পারলো। ওই তরুণী মোবাইল ফোনে চীনা ভাষায় লিখে অনলাইনে ইংরেজিতে অনুবাদ করে আমাদের যা দেখালো তার বাংলায় অর্থ দাঁড়ায়—‘তোমাদের হোটেলে পৌঁছে দিচ্ছি’। তারা চেষ্টার কমতি করেনি। ধন্যবাদ দিয়েই আমরা ফিরলাম।

ব্যক্তিগতভাবে চলাফেরার এমন দু’য়েক একটি অভিজ্ঞতা ছাড়া চীন সফরের বাকি কর্মসূচিগুলোতে প্রতিটি বর্ণনা ইংরেজিতে অনুবাদের ব্যবস্থা ছিল। উরুমচি, কোরলায় একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পুরো সময় আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি প্রতিটি বাক্য আমাদের ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিয়েছেন। এছাড়া চীনা সাংবাদিক ও কর্মকর্তারাও চীনা বিষয়গুলো ইংরেজিতে ব্যাখ্যা করেছেন। 

তবে চীনা শিক্ষার্থীরাও এখন ইংরেজিসহ একাধিক ভাষা শিখছে। উরুমচির ৬৬ নম্বর সেকেন্ডারি স্কুল পরিদর্শন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে আমাদের। ওই স্কুলটির শিক্ষার্থীরা সাবলীলভাবে ইংরেজি বলায় পারদর্শী। এছাড়া এ সফরে চীনের বেশ ক’জন সাংবাদিক পেয়েছি যারা চীনা ভাষা ছাড়াও ইংরেজি, আরবি, তার্কিশ, ফার্সি ও রুশ ভাষায় পারদর্শী।

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ 



মন্তব্য