kalerkantho


'বন্ধন' এ জড়ালো যশোর,'মৈত্রী' তে কি জড়াবে ঈশ্বরদী?

এস এম রওনক রহমান আনন্দ   

৭ মার্চ, ২০১৯ ১৪:৫১



'বন্ধন' এ জড়ালো যশোর,'মৈত্রী' তে কি জড়াবে ঈশ্বরদী?

ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস বাংলাদেশ থেকে ভারত ভ্রমণে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) থেকে দুই দেশের মধ্যে এ ট্রেন চালু হলে চার দশকের বেশি সময় পরে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তবে চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এ ট্রেন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেবা দিতে পারেনি, যাত্রী টানতে পারেনি। নানা কাঠ-খড় পুড়িয়ে, নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে, বছরের পর বছর কার্যত লোকসান গুনে এখন মৈত্রী এক্সপ্রেস একটি সন্তোষজনক ও সত্যিকারের আনন্দদায়ক যাত্রায় রূপান্তর হয়েছে। 

বিশেষত ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন ও কলকাতার চিতপুর রেলস্টেশনে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস সেবা প্রবর্তন করার পর মৈত্রী ট্রেনের আকর্ষণ অনেক বেড়ে গেছে।বিমানবন্দরের মতো ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস তল্লাশি ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত দুই দেশের সীমান্তে গিয়ে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস তল্লাশির কাজ করতে হতো। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে যাত্রা করে বাংলাদেশের দর্শনা সীমান্তে গিয়ে নামতে হতো মালপত্রসহ। ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস তল্লাশি সেরে ওপারে গিয়ে গেদে’তে ভারতীয় অংশের ইমিগ্রেশন ও তল্লাশি সম্পন্ন করে ফের ট্রেনে মালপত্র নিয়ে উঠতে হতো। এরপর কলকাতা গিয়ে নেমে পড়া। 

বিভিন্ন সময়ে মৈত্রী ট্রেনে ভ্রমণকারীদের সঙ্গে আলাপচারিতা থেকে জানা গেছে, এ কাজে গড়ে ৪ ঘণ্টা বাড়তি সময় ব্যয় হতো যাত্রাপথে। আর দুই দেশের সীমান্তেই বিশেষত কাস্টমসের হয়রানি ছিল নিয়মিত ব্যাপার। ইমিগ্রেশনেও অনেক সময় হয়রানি হতে হতো। দুই দেশের যাত্রীরা এ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ করেছে। অবশেষে সেই অবস্থা থেকে মৈত্রী’র যাত্রীদের মুক্তি মিলেছে। আর সড়কপথে যারা দর্শনা-গেদে দিয়ে যাতায়াত করে, তাদের অবস্থারও অনেকটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু দুই দেশের চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য রয়েই গেছে। এসব চোরাকারবারির সঙ্গে দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর কমবেশি সখ্য আছে।

ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় বাংলাদেশী যাত্রীদের অনেকেই সঙ্গে ঘরের তৈরি খাবার নিয়ে ওঠে। যারা এটা করতে পারে না, তাদের নির্ভর করতে হয় রেলের নিম্নমানের খাবারের ওপর। অন্যদিকে কলকাতা থেকেও যাত্রীরা কেউ কেউ খাবার সঙ্গে নিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগই বিশেষত বাংলাদেশী পর্যটকরা অত ভোরে হোটেল থেকে স্বাভাবিকভাবেই খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে না। ফলে তাদেরকে দর্শনা পর্যন্ত ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে হয়।মৈত্রী ট্রেনে নিরাপত্তাজনিত বিষয়টি আরেকটু নজরদারির দাবি রাখে। ঢাকা থেকে দর্শনা বা দর্শনা থেকে ঢাকা পর্যন্ত ট্রেনে পুলিশের প্রহরা ও টহল থাকে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রহরায় শৈথিল্য প্রতীয়মান হয়। বিশেষত ক্রসিংয়ের জন্য কোনো স্টেশনে বা সিগনালে অপেক্ষারত থাকা অবস্থায় ট্রেনের বদ্ধ দরজায় পুলিশের কঠোর প্রহরা বাধ্যতামূলক যেন বাইরে থেকে কেউ উঠতে বা ভেতর থেকে কেউ নামতে না পারে। অথচ অনেক যাত্রী অভিযোগ করেছে যে, এ সময়কালে লোক ওঠানামার, এমনকি পণ্য ওঠানামার ঘটনা ঘটে থাকে। এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। 

গেদে-কলকাতা-গেদে রেলপথে অবশ্য নিরাপত্তা প্রহরা বেশ কড়া। গেদেতে বিএসএফ প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে ট্রেনে উঠে টহল দিয়ে যায়।  ঢাকা ও কলকাতা দুই জায়গাতেই ইমিগ্রেশন বেশ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। গেদে থেকে কলকাতা যাওয়ার পথে ট্রেনে ভারতীয় ইমিগ্রেশনের ডিসএমবারকেশন কার্ড বা অবতরণপত্র বিতরণ করা হয়। এতে যাত্রীরা ট্রেনে বসেই এ ফরম পূরণ করে ফেলতে পারে। সমস্যা হয় চিতপুর স্টেশনে নেমে লাইনে দাঁড়ানোর পর ভারতীয় কাস্টমসের কর্মীরা ফরম বিতরণ করেন। স্টেশনে কোনো টেবিল বা ডেস্কের ব্যবস্থা না থাকায় আর সবাই একটি লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় তা তখন পূরণ করা কষ্টসাধ্য হয়। ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার পর মালপত্র স্ক্যানিং মেশিনে তুলে তল্লাশি করিয়ে বের হওয়ার আগে পূরণকৃত ফরম জমা দিতে হয়। আর কাস্টমস কর্মীরা প্রতিটি যাত্রীর সঙ্গে বহনকৃত ব্যাগের তথ্যাদি নির্ধারিত খাতায় লিপিবদ্ধ করেন। এভাবে কাস্টমস তল্লাশি সারতে বেশ সময় লেগে যায়। একই অবস্থা ফেরার সময়েও। এ সময় অনেক যাত্রী হয়রানির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ এনেছে। ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে অবশ্য এখন যাত্রীদের জন্য সুব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা কক্ষ নির্মাণের কাজ চলছে। প্লাটফরমে বসার ব্যবস্থা আছে। তবে প্লাটফরমে ছাউনি দেয়া জরুরি। না হলে বর্ষাকালে যাত্রীদের ভিজে জবুথবু হতে হবে। 

সার্বিকভাবে মৈত্রী এক্সপ্রেসের সেবা ও চলাচল আরো উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে সপ্তাহে চারদিন এ ট্রেন চলছে। প্রতি ট্রেনে সর্বোচ্চ ৪৫৬ জন যাত্রী যাতায়াত করতে পারে। তার মানে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৪৮ জন যাতায়াত করতে পারে। সে হিসাবে মাসে ১৪ হাজার ৫৯২ এবং বছরে ১ লাখ ৭৫ হাজার ১০৪ জন। এর মধ্যে দুই দেশের যাত্রীই আছে, যদিও বাংলাদেশীরাই সংখ্যাগুরু। তার পরও বাংলাদেশ থেকে ভারতে ভ্রমণকারী ২০ লাখ যাত্রীর ১০ শতাংশও ট্রেনে যাতায়াত করতে পারে না। ব্যাপক চাহিদাই বলে দেয় যে, এটি সপ্তাহে ছয়দিন, এমনকি সাতদিন চালালেও কোনো লোকসান গুনতে হবে না। আর যদি রাতের বেলা চালানো যায় তাহলে পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের জন্য আরো সুবিধা হবে। ঢাকা বা কলকাতায় তারা কর্মদিবস কাজে লাগাতে পারবে।চাহিদা বাড়ায় ডিসেম্বর থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেসের টিকিটের মূল্যও বাড়ানো হয়েছে। 

ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ রেল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য এ রকম যে, এখন পুরো ট্রেনই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ইমিগ্রেশন হওয়ায় সময় ও ঝক্কি অনেক কমেছে। সর্বোপরি চাহিদা বেড়েছে। তাই ভাড়া বাড়ানো অযৌক্তিক কিছু নয়। আবার ভাড়া বাড়ানোর মধ্য দিয়ে দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষ কিছুটা আয় বাড়াতে পারছে। ইদানীং কিছুটা লাভের মুখ দেখতে পারছে। আবার এ ট্রেনের মোট আয়ের ৭৫ শতাংশ আসে বাংলাদেশে। কেননা এ রেলযাত্রার ৭০ ভাগই সম্পন্ন হয় বাংলাদেশ ভূখণ্ডে। অন্যদিকে খুলনা-কলকাতা-খুলনা রুটে বন্ধন এক্সপ্রেস চালু হয়েছে, যা এখন সপ্তাহে একদিন চলছে। কিছুদিন আগেই বন্ধন এক্সপ্রেসকে যশোর স্টেশনে স্টপেজ দেওয়া হয়েছে এলাকাবাসীর দাবি ও তীব্র আন্দোলনের মুখে ৷ 

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়,দীর্ঘদিন এলাকাবাসী দাবি জানালেও দেশের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশ মুখে অবস্থিত ঐতিহাসিক ও শতবর্ষী ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশন যা উত্তরাঞ্চলের অহংকার সেই স্টেশন দিয়ে আন্তঃনগরসহ বিভিন্ন প্রকার ৮০টি ট্রেন চলাচল করে সেই স্টেশনে মৈত্রী এক্সপ্রেসের কোন স্টপেজ নেই!  

এছাড়াও প্রতিটি ট্রেনেই আসন সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় যাত্রীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। ট্রেন, আসনসংখ্যা,যাত্রীসেবার মান ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শতবর্ষ পার হলেও রাজনৈতিক অবহেলায় প্রয়োজনের তুলনায় ঈশ্বরদী স্টেশনের কোন উন্নতি হয়নি। যাত্রীদের প্রচুর চাপ থাকা সত্ত্বেও চালু করা হয়নি নতুন ট্রেন। বাড়ানো হয়নি আসন। বাড়েনি যাত্রীদের সুযোগ সুবিধা।সঠিক পরিকল্পনা ও দুরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারলে যাত্রীসেবার মানোন্নয়নের পাশাপাশি রেল কর্তৃপক্ষ ঈশ্বরদী থেকে প্রচুর রাজস্ব আয় করতে পারে,যা রেলের জন্য খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।

ঈশ্বরদীতে স্টেশন রিমডেলিং প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের যাত্রীদের সুবিধা বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে রেলের রাজস্বও অনেক বৃদ্ধি পেত। বর্তমানে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনটি পানি নেবার জন্য এই স্টেশনে প্রায় ১০- ১৫ মিনিট বিরতি দেয় অথচ ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস সুবিধা না থাকায় যাত্রী নিতে পারে না। স্টেশনটিতে রিমডেলিং প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আন্তর্জাতিক মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনে রাজশাহী, পাবনা, নাটোর, কুষ্টিয়া ঈশ্বরদীসহ উত্তরাঞ্চলের যাত্রীদের ভ্রমন সুবিধা সৃষ্টি সহজ হতো। প্রতিদিন অন্ততঃ ৪/৫ শত যাত্রী বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সহজেই যাতায়াত সুবিধা ভোগ করতে পারতো। একই সাথে রেল কর্তৃপক্ষও প্রতিদিন শুধুমাত্র মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন থেকেই অন্ততঃ ১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারতো। এ অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে অচিরেই মৈত্রী এক্সপ্রেস কে ঈশ্বরদীতে স্টপেজ দেওয়া উচিত ৷ সব মিলিয়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস কিংবা বন্ধন এক্সপ্রেস; বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের যাতায়াতের ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে। ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো গেলে ও বিদ্যমান প্রতিকূলতা দূর করা গেলে আগামীতে এ ট্রেন যাতায়াতই দুই দেশের সম্পৃক্ততা আরো জোরদার ও সুসম্পর্ক বেগবান করবে।

লেখক : সংগঠক ও সমাজকর্মী

(পাঠকের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নন।)



মন্তব্য