kalerkantho


ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন এসআই শফিকের

মাহমুদ হাসান আরিফ   

২২ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৮:০৫



ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন এসআই শফিকের

ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন পুলিশের এসআই শফিকুল ইসলাম। সে লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর মতো একজন ব্যক্তির একার পক্ষে একটি দেশ নিজের মতো করে সাজানো সম্ভব নয়, এটি তিনি মানেন। তবে তিনি মনে করেন, তিনি যে কাজ শুরু করেছেন, এটি সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারলে বাংলাদেশ ঠিকই একদিন ধূমপানমুক্ত হবে।

কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ধূমপান শুরু করেছিলেন শফিকুল ইসলাম। একসময় গলাব্যথা, কাশিসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। চিকিৎসকের পরামর্শে তখন ধূমপান ছেড়ে দেন। ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো অনুধাবন করতে পেরে এর বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির ব্যাপারে প্রতিজ্ঞা করেন শফিকুল ইসলাম।

শফিকুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কাদৈর গ্রামে। বাবা তফাজ্জল হোসেন ও মা মহারানী বেগম। দুজনই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। ১৯৯৬ সালের মার্চে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপিতে) কনস্টেবল পদে যোগদান করেন তিনি। চাকরির পাশাপাশি তিনি রাজধানীর সরকারি কবি নজরুল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে ঢাকা মহানগর পুলিশের বাড্ডা থানায় উপপরিদর্শক (এসআই) পদে কর্মরত আছেন। তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। পরিবার নিয়ে থাকেন ঢাকার উত্তরার পুলিশ অফিসার্স কোয়ার্টারে।

কর্মজীবনে ঢোকার পর ধূমপানের ক্ষতিকর দিক নিয়ে আরো অভিজ্ঞতা অর্জন হয় শফিকুল ইসলামের। ২০০৩ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু করেন ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ আন্দোলন। চাকরির বাইরে অবসর সময়টুকু ধূমপায়ী রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ফুটপাথের দোকানদারসহ নিু আয়ের মানুষকে ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো বোঝাতে থাকেন। এমনকি ডিউটি অবস্থায়ও সুযোগ পেলে ধূমপায়ীদের ধূমপান না করার ব্যাপারে সচেতন করতে চেষ্টা চালাতেন।

ধীরে ধীরে তাঁর সচেতনতামূলক এই আন্দোলন দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বর্তমানে তাঁর এই সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে আছেন ২৯২ জন বিসিএসধারী কর্মকর্তা। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় তাঁর সংগঠনের সদস্য রয়েছেন। যাঁরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়েও শিক্ষার্থীদের সচেতন করার চেষ্টা করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ নামের একটি গ্র“প খুলেছেন শফিকুল ইসলাম। সেখানে বর্তমানে সদস্যসংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার।

‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ আন্দোলন এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপানসহ বেশ কিছু দেশে প্রবাসী বাঙালিরা এই সচেতনতামূলক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

২০০৪ সালে ঢাকায় র‌্যাবে যোগদান করেন শফিকুল ইসলাম। তখন র‌্যাবের পোশাক পরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে তিনি মানুষকে ধূমপান ছেড়ে দিতে বলতেন। তবে কাউকে কখনো জোর করেননি। তিনি বলেন, “আমি মানুষকে বলতাম, ‘ভাই আপনারা যদি ধূমপান ছেড়ে দেন, তবে আমি প্রতিদিন আপনাদের কাছে আসব। যাঁরা ধূমপান ছেড়ে দেবেন, তাঁরা আমার বন্ধু হবেন। তখন আমার কথায় অনেকে ধূমপান ছেড়ে দেয়। খাতা-কলমে তাদের সদস্য করে নেওয়া শুরু করলাম। কখনো ধূমপায়ী না হলেও আমার স্ত্রী এই সংগঠনের প্রথম সদস্য। তাঁকে দিয়েই শুরু করলাম।”

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েকটি সিগারেট কম্পানি বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে এই আন্দোলন থামিয়ে দিতে চেয়েছে। এমনকি এই কাজ থেকে সরে আসতে আমাকে আর্থিক প্রলোভনও দেখানো হয়েছে। তবে আমি কোনো কিছুর কাছেই নতিস্বীকার করিনি। নানারকম প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’

ধূমপানমূক্ত বাংলাদেশ চাই আন্দোলনের উপদেষ্টা ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি একজন অধূমপায়ী হিসেবে চাই, দেশের একজন মানুষও ধূমপান না করুক। এ জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো দেশের প্রতিটি নাগরিককে বোঝাতে হবে। সচেতন সবাইকে এই কাজে এগিয়ে আসতে হবে। এর মধ্য দিয়ে ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।’

চাই আন্দোলনের অন্যতম উপদেষ্টা বাড্ডা জোনের পুলিশের এসি মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ধূমপানে একদিকে যেমন অর্থের অপচয়, তেমনি এর মধ্য দিয়ে প্রতিটি মানুষই নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। সামাজিকভাবেও এর নানা কুফল লক্ষ্য করা যায়। আমি ‘ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ চাই’ আন্দোলনের সার্বিক সাফল্য কামনা করি।’

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী



মন্তব্য