kalerkantho


অভিমানে আত্মহত্যা করতে গিয়েও যেভাবে ফিরে এসেছি

কাওসার বকুল   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৯:৫৬



অভিমানে আত্মহত্যা করতে গিয়েও যেভাবে ফিরে এসেছি

বছর চারেক বয়সেই ‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা’, ‘আম পাতা জোড়া জোড়া’, ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি’, ‘ওই দেখা যায় তালগাছ’সহ বেশকিছু কবিতা ঠোঁটস্থ করে ফেলেছিলাম। সেই সঙ্গে কিছু সূরা, নবী-রাসূল আর সাহাবায়ে কেরামের নামও বলতে পারতাম। এছাড়া জাতীয় ফল, পাখি, কবির নামও জানা ছিল। আত্মীয়-স্বজনরা তখন আমাদের বাড়িতে এলেই আমার কাছে এসব ব্যাপারে জানতে চাইতো; আমিও গড়গড় করে বলতাম সেসব।

একবার বাড়িতে আসলেন আমার নানা। আমার মুখে ছড়া-কবিতা শুনে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবেন। আমার বাবা-মাও তাতে সাঁয় দিলেন। পরদিনই তিনি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে নওগাঁর মান্দা উপজেলার একরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘ছোটো ওয়ানে’ ভর্তি করিয়ে দিলেন।

ওই সময় আমাদের গ্রামের অনেকেই ছোটো ওয়ানে পড়ে; আর সেই স্কুলে আমার চাচাত ভাইবোনদের অনেকেই পড়ে। ফলে স্কুলে গিয়েও তাদের সঙ্গেই থাকতাম। ছোটো ওয়ান বলে আমাদের তেমন একটা পড়ানো হতো না। যারা চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে এবং রোল নম্বর ১ কিংবা ২; তারা এসে আমাদের নামতা, ছড়া পড়াতো।

আর বেশিরভাগ সময় স্কুলের মাঠে খেলা কিংবা পাশের ডোবাতে শাপলাফুল তোলা, গাছে চড়ে পাখির বাচ্চা দেখা, জাম খাওয়া, আম কুড়ানোতে ব্যস্ত থাকতাম।

ইতোমধ্যেই নিজের বইয়ে পড়ার মতো আর নতুন কিছু না পেয়ে বিরক্ত হয়ে পড়েছি। এই ফাঁকে বলে রাখি, আমরা যেখানে বসতাম সকালে, আমাদের ছুটির পর ক্লাস ফাইভের শিক্ষার্থীরা সেখানে বসতো। তো আমার বেঞ্চে বসতো এক হিন্দু ছেলে। তার হিন্দু ধর্মশিক্ষা বইয়ে দারুণ দারুণ ছবি দেখে আমি ওই বইয়ের প্রেমে পড়ে যাই।

স্কুল ছুটির পর সেই বইও সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে যাই। ওই বই আমার কাছে দেখেই বকাঝকা শুরু করেন আমার মা; একপর্যায়ে মারধর। তার পর বলতে থাকেন, হিন্দু সেই ছেলের বাড়ি রাতের বেলাই নিয়ে যাবেন এবং সবাইকে বলবেন আমি চোর। ওই সময় আমি ভেবে পাই না, আমি যে বইটি চুরি করেছি এটা সবাই জানলে কীভাবে স্কুলে যাবো। তবে ওই যাত্রায় বেঁচে যাই।

তার কিছুদিন পরই অন্য ছেলেদের সঙ্গে স্কুলের নলকূপের কিছু অংশ দিয়ে হাওয়ায় মিঠাই খাই। সেই নালিশ আসে বাবার কাছে। এবার উত্তম-মধ্যম জোটে আমার কপালে। সেই সঙ্গে সতর্ক বাণী, লাখ টাকা রাস্তায় পড়ে থাকলেও যেন ছুঁয়ে দেখা না হয়।

কে শোনে কার কথা, এর কিছুদিন পর স্কুল থেকে ফেরার পথে বাড়ির পাশেই একজনের জমি থেকে মিষ্টি কুমড়ার দু’টি চারা আর কিছু মরিচ গাছ তুলে নিয়ে আসি। এরপর বাড়ির পেছন দিকে খোঁড়াখুঁড়ি করে সেগুলো লাগিয়ে রাখি। তবে পরদিন দুপুরের দিকে সেটা দেখে ফেলেন ওই জমিওয়ালা।

তিনি এবার আমার বাবা-মাকে সেই বিষয় জানিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে মা আমাকে আবারো উত্তম-মধ্যম দেবেন বলে শাসাতে শুরু করলে বাড়ি থেকে পালিয়ে অন্য পাড়ায় চলে যাই। সে যাত্রায় অবশ্য বেঁচে গিয়েছিলাম। এর কিছুদিন পর মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যাই খালার বাড়ি।

আমার খালাতো ভাই আবার বয়সে আমার বছর তিনেকের বড়। দারুণভাবে লাটিম ঘুরাতে পারতো সে। পরদিন সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পথে সেই লাটিম আমি গোপনে নিয়ে চলে আসি।

ব্যস বাড়ি ফিরে সেই লাটিম ঘোরাতে গিয়েই ধরা পড়ে যাই মায়ের হাতে। বাবা-মা দু’জনেই বললেন, তাদের ছেলে মনে হয় চোর হতে যাচ্ছে। মা বললেন, এর  চেয়ে আমাকে আরো ছোট থাকতে নাকি মুখে লবণ দিয়ে মেরে ফেললেই ভালো হতো।

আমিও ভাবলাম তাইতো, আমি তো নষ্ট হয়ে গেছি। আর এরকম চোরদের নাকি জাহান্নামে যেতে হয় (মা-বাবার কাছে জেনেছি)। মা বললেন, এর চেয়ে তুই গলাই দড়ি দিয়ে মরে যা। তাতে অন্তত আমাদির মান-সম্মান বাঁচে।

আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম মরে যাবো। বাড়ির পেছনে গিয়ে গরুর দড়ি খুলে নিয়ে এবার মারা যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নিরিবিলি জায়গা খুঁজতে খুঁজতে চলে গেলাম দাদার বাড়ির পেছনে। সেখানে আমগাছে চড়ে এক ডালে সেই দড়ি বাঁধার পর কপালের ঘাম মুছতে গিয়ে উৎকট গন্ধ পেলাম। বুঝতে বাকি থাকলো না, সেটা আসলে গরুর দড়ির গন্ধ।

এরকম উৎকট গন্ধের ঠেলায় গলায় দড়ি দেওয়ার কথা বাদ দিয়ে হাত ধোয়ার তাগিদ অনুভব করলাম। পাশেই আমার চাচার বাড়ি; তাদের বাড়িতে গেলাম নলকূপের পানিতে হাত ধোঁয়ার জন্য।

সেখানে গিয়ে আরেক কাণ্ড; সেদিন শুক্রবার, বিটিভিতে চলছে বাংলা সিনেমা। সেই সিনেমায় নায়ক রুবেলের নাচাগানা আর কুংফু ক্যারাটে দেখে মুগ্ধ হয়ে সেখানেই বসে থাকলাম। একজন দর্শকের মুখে শুনলাম পরের শুক্রবার নাকি গরীবের বউ সিনেমা দেখানো হবে। মারা গেলে তো সেটা দেখা থেকে বঞ্চিত হবো; গলায় দড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে এবার সরে এলাম।

এদিকে আমাদের গরু সারাগ্রাম দৌড়ে বেড়াচ্ছে। সেই গরু ধরার জন্য বেঁধে গেল হুলুস্থুল। সিনেমাশেষে গরু ধরার জন্য বাবার পেছন পেছন দৌড় ধরলাম। আর দড়ি সারারাত একা ঝুলে থাকলো সেই ডালে।



মন্তব্য