kalerkantho


সেই গ্রীক পুরাণেই 'সেলফি'!

সিফাজুল নাঈম নিলয়    

২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৪:০৩



সেই গ্রীক পুরাণেই 'সেলফি'!

কয়েক বছর আগেও সেভাবে সেলফির প্রচলন ছিল না। কিন্তু বর্তমানে সেলফি সংস্কৃতি অনেকটাই বেড়ে গেছে। এমনকি সেলফি তুলতে গিয়ে প্রাণ হারানোর খবরও গণমাধ্যম মারফত আমরা দেখছি।

রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে অনেককেই সেলফি তুলতে দেখি, কারো সঙ্গে ঘোরার সময়ও সেলফি তুলতে দেখা যায়। এমনকি মৃত ব্যক্তির সঙ্গেও  সেলফি তুলতে দেখা যায়। 

এই তো বছর কয়েক আগেও প্রেমের খবরটি বেশিরভাগ মানুষ গোপন রাখতো। কিন্তু এখন প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার সঙ্গে সেলফি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগেরমাধ্যমে দিতে অস্বস্তিবোধ হয় না। 

সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় সেলফির ছড়াছড়ি। কেউ জন্মদিনের কেক কাটার সময়কার সেলফি দিয়েছেন, তো কেউ দিয়েছেন পুরনো বন্ধুর সঙ্গে। রান্না করার সময় সেলফি দিচ্ছেন, এমনকি বাথরুমেও অনেকে সেলফি তুলে সেটা আপলোড করেন।

কিন্তু এই সেলফির শুরুটা আসলে কোথায়। এক সহকর্মী বন্ধুর কাছে এ ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলাম। সে আমাকে বলেছিল গ্রিক পুরাণের এক কাহিনির কথা!

পাঠককে বিষয়টি জানানোর জন্য সেই গল্প এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করছি। নার্সিসাস নামের এক ব্যক্তি নাকি অসম্ভব সুদর্শন ছিলেন। তার মোহে স্বর্গের দেবীরাও নাকি কামুক হয় উঠতেন। আর নার্সিসাস কেবল নিজের সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন। অন্যদের তিনি মোটেও মূল্যায়ন করতেন না।

অন্যদিকে সুন্দরী বনপরী ছিলেন ইকো। তিনি ছিলেন অন্য রকম আবেদনময়ী। দেবতারা পর্যন্ত নাকি স্বর্গ থেকে তার কাছে চলে যেতেন। কিন্তু এক দেবতার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের সময় তার স্ত্রী সেটা দেখে ফেলেন। আর ইকোকে সেই দেবী অভিশাপ দেন, সে যেন আর কখনো নিজের মনের কথা মুখে বলতে না পারে। কেবল অন্যের কথার প্রতিধ্বনি করতে পারে যেন। 

সেই ইকো আবার ছিলেন নার্সিসাসের রূপের পাগল। তার আশায় পথ চেয়ে থাকতেন। কিন্তু নার্সিসাস আর আসে না। একবার তারা সামনাসামনি পড়ে যান। কিন্তু নার্সিসাস তাকে পাত্তা দেন না। এক পর্যায়ে কোনো ব্যক্তির পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে তাকে সামনে আসার কথা বলে নার্সিসাস। কিন্তু বেচারা ইকোর তো নিজের কথা বলার ক্ষমতা নেই। সে কারণে প্রতিধ্বনি করতে থাকেন তিনি। এক পর্যায়ে আবেগে নার্সিসাসকে জড়িয়ে ধরেন।

কিন্তু তাকে প্রত্যাখ্যান করে নার্সিসাস। এমনকি তাকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন, বনপরী কখনোই নার্সিসাসকে পাবে না। ইকো এই কথারও প্রতিধ্বনি তোলেন। তারপর থেকে পাহাড়ে না খেয়ে পড়ে থেকে থেকে মারা যান পরী।  সেখানেই তার দেহ পচে যায়। কিন্তু তার প্রতিধ্বনি করার অভিশপ্ত ক্ষমতা পেয়ে যায় পাহাড়।

ইকোকে ভালোবাসতেন প্রতিশোধের দেবী নেমেসিস। ইকোর মৃত্যু কোনোভাবেই তিনি মেনে নিতে পারেনি। তিনি অভিশাপ দেন নার্সিসাসকে।

একদিন নার্সিসাস একটা ডোবার পাশে যান। পানির দিকে তাকিয়ে দেখেন সুন্দর এক মানুষকে। তৎক্ষণাৎ সেই মানুষের প্রেমে পড়ে যান তিনি। 

তবে তাকে ধরতে গেলেই পানির ঢেউয়ে হারিয়ে যাচ্ছিলেন মানুষটা। আসলে ওটা ছিল তারই প্রতিবিম্ব। কিন্তু নিজেকে কখনো না দেখার ফলে নার্সিসাস এই বিভ্রমের মধ্যে পড়ে যান। পানির ওই মানুষটিকে পাওয়ার বাসনা মন থেকে মুছে ফেলতে পারেন না নার্সিসাস। দিনের পর দিন সেই প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একপর্যায়ে মারা যান তিনি।

নার্সিসাস যেমন নিজের প্রেমে পড়েছিল। সামাজিক যোগাযোগেরমাধ্যম ফেসবুকে প্রবেশ করলেও খানিকটা সে ধরনের প্রেম চোখে পড়ে। বর্তমানে সেই প্রেম অনেকটাই ফিরে এসেছে সেলফি হয়ে। সেলফিতে আত্মমগ্ন মানুষের আর নিজের প্রতিচ্ছবির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া সেই নার্সিসাসের মধ্যে অমিল তো চোখে পড়ে না।

যদিও আমরা কখন থেকে সেলফিকে সেলফি নামে ডাকি, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। কিন্তু মনে পড়ে, ২০০৪ সালে সনি এরিকসন জেড১০১০ মডেলের ফোন বাজারজাত করে। সেই মোবাইলের সামনে একটা ক্যামেরা ছিল। সেখানে যদিও সেলফি তোলার জন্য ক্যামেরা লাগানো হয়নি। ভিডিওকলে নিজেকে দেখাতেই ওই ব্যবস্থা। তবে জানা যায়, অস্ট্রেলিয়ার একজন ২০০২ সালে নিজেই নিজের ছবি তুলে নাম দেন সেলফি।

আইফোন৪ ২০১০ সালে বাজারে আসার পর থেকে সেলফি শব্দটির প্রচলন বেড়ে যায়। ২০১২ সাল থেকে সেলফি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। শব্দটি ২০১৩ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে স্থান পায়। বর্তমানে হরহামেশাই সেলফি শব্দটা ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ছবিতে বেশ কয়েকজন থাকলে সেটাকে উইফও বলা হয়। তখন আর সেটাকে সেলফি বলা চলে না।

 



মন্তব্য