kalerkantho


ব্যথামুক্ত স্বাভাবিক প্রসব, এটাও কি সম্ভব?

তানজিনা আকতারী মৌমি    

৫ অক্টোবর, ২০১৮ ১০:৩২



ব্যথামুক্ত স্বাভাবিক প্রসব, এটাও কি সম্ভব?

ঘুম থেকে ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখে আতঙ্কিত রিতুর ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে বারবার। ভয় আর আতঙ্ক কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছেনা সে। বিছানা থেকে ভারী শরীরটা নিয়ে নেমে পানি খেয়ে সামান্য হাঁটাহাঁটি করে এসে আবার শুয়ে পড়লো। কিন্তু ঘুম এলো না সারা রাতেও। রিতুর ভয়ের শুরু প্রায় সপ্তাহখানেক আগে থেকে। ওর বান্ধবী তিতলির কন্যা সন্তান হয়েছে গত সপ্তাহে। প্রথমে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তীব্র ব্যথায় সে বারবার জ্ঞান হারানোয় শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম হয়েছে। তিতলির সেই গা শিউরে ওঠা ভয়ানক ব্যথার বর্ণনা শোনার পর থেকে রিতুর ভয় কাটছেই না। আর কাটবেই বা কি করে, আর মাত্র ২ মাস পর যে তারও সন্তান জন্ম দেবার সময়। তাহলে কি ডাক্তারকে সরাসরি অস্ত্রোপচার করতেই বলবে সে? এমন ভাবনা অনেকেরই। 

এখন এমন সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, যে সময়টাতে ডাক্তার কারনে কিংবা কারন ছাড়াই অস্ত্রোপচার বা সিজার করতে বলছেন। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে রোগী ও তার আত্নীয়দের ইচ্ছেতেই সিজার হচ্ছে। তাছাড়া নারীর বয়স ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থায় সিজারের পরিমান বেড়ে যায়। তবে যেটাকেই আমরা কারন বলে উল্লেখ করি না কেন, এটা অস্বীকার করার কোন উপায়ই নেই যে, বর্তমান সময়ে সিজারের পরিমান আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। দিনে দিনে সিজারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রসূতি মায়েদের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। জরিপের তথ্য থেকে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ জন নারী সন্তান প্রসবের জটিলতায় মারা যাচ্ছে। বছরে প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর সংখ্যা ৫-৭ হাজার। আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থায় ৫-১৫% প্রসূতির ক্ষেত্রে সিজার হওয়া উচিত। কিন্তু সিজার হচ্ছে ২৩% ক্ষেত্রে। সেগুলো সিজার রোগীর ইচ্ছের চেয়ে ডাক্তারের প্ররোচনাতেই বেশি হচ্ছে বলে জানান অনেকেই। বিশেষজ্ঞের মতে, ২০০১-২০১০ সালের মধ্যে সিজারের পরিমান ১০% বেড়েছে। স্বাভাবিক প্রসবের ব্যথার সময় ১৮-২৪ ঘণ্টা সময়কাল ব্যাপী হতে পারে। আর সময়সাপেক্ষ তীব্র ব্যথার কারনে গত ১০ বছরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু জন্মের পরিমান প্রায় ৫ গুন বেড়েছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম দেয়া ২৬% মায়ের এভাবে সন্তান জন্ম দেবার প্রয়োজন ছিল না। মাতৃত্বকে পুঁজি করে যেন অর্থ উপার্জনের এক রমরমা উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে কতিপয় অসাধু ডাক্তার ও হাসপাতাল পরিচালনা পরিষদের। মনে প্রশ্ন জাগে, কোনভাবেই কি আবার স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহ প্রদান করা যায়না? 

স্বাভাবিক প্রসবকে ব্যথামুক্ত ভাবে সম্পন্ন করতে রাজধানীর ইমপালস হাসপাতালের একদল বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এখন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এ বছরের মে মাস থেকে বেশ কয়েকজন প্রসূতিকে ব্যথাবিহীন ভাবে স্বাভাবিক প্রসব করিয়ে তারা সফল হয়েছেন। তারই ফলশ্রুতিতে তারা ব্যথামুক্ত সন্তান প্রসব চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন মাত্র কদিন আগে। ব্যথাবিহীন এই প্রসব পদ্ধতির নাম ‘’ইপিডুরাল’’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তানের জন্ম হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিতে প্রসবের আগে প্রসূতির শরীরে বিশেষ ব্যবস্থায় বেদনানাশক দেয়া হয়, তবে এই ওষুধ কোনভাবেই মায়ের রক্ত থেকে শিশুর রক্তে প্রবাহিত হবে না বলে তাদের দাবী। সেই বেদনানাশকের প্রভাবে প্রসূতি সন্তান জন্মদানের সময় কোন ব্যথা অনুভব করেন না কিন্তু কোনভাবেই অবশ হবে না। প্রয়োজনে প্রসূতি হাঁটাহাঁটি করতে পারবেন এবং স্বাভাবিক প্রসব প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করার ক্ষেত্রে কোন বাধা তৈরি করে না। এমনকি নবজাতক জন্মের পর তাৎক্ষণিক বুকের দুধ পান করাতেও কোন সমস্যা হয় না। সাধুবাদ জানাই তাদের, নারী বান্ধব এত চমৎকার পদ্ধতি আমাদের দেশে চালু করার জন্য।  

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতির মাধ্যমে নবজাতকের জন্ম হয় অনেক বছর আগে থেকে। ডাক্তারের দেয়া তথ্য অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে শতকরা ৬০ জন নারী ব্যথাবিহীন প্রসব পছন্দ করেন এবং শতকরা ৮০ জন এই পদ্ধতি গ্রহনে আগ্রহী। কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে শতকরা ৬০-৭০ জনের ক্ষেত্রে ইপিডোরাল পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। জাপানে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া সিজার করে না। সমগ্র ইউরোপে ৭০ ভাগ প্রসব ব্যথামুক্তভাবে করা হয়।

ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে এই পদ্ধতি চালু থাকলেও সামগ্রিকভাবে এর ব্যবহার হয় না, তবে হায়দ্রাবাদের একটি হাসপাতালের ৪ হাজার নবজাতকের মধ্যে ৬৫ ভাগের জন্ম হয়েছে এই পদ্ধতির মাধ্যমে। বাংলাদেশেও বিচ্ছিন্নভাবে কোন কোন হাসপাতালে ব্যথামুক্ত প্রসব হলেও সার্বিকভাবে খুব একটা প্রভাব না থাকায় এর কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে প্রসূতি সন্তান জন্ম দেবার সময় খুব জরুরী প্রয়োজনে ফরসেফ কিংবা সিজার লাগতে পারে যদিও সেটা খুব কম ক্ষেত্রেই প্রয়োজন। 

নারীরা তার গর্ভের মাধ্যমে একটি শিশুকে পৃথিবীতে নিয়ে আসে। সেই নারীকেই সন্তানটিকে ভূমিষ্ঠ করার সময় হাড় ভেঙ্গে যাবার মত তীব্র ব্যথা, মানসিক অবসাদ, নয়তো সিজারের মত জটিল কাটাছেঁড়া, সিজার পরবর্তী জটিলতা বয়ে বেড়াতে হয়। আসুন, আমরা নিজেরা জানাই সব গর্ভবতী মা ও তাদের নিকটজনকে ব্যথামুক্ত প্রসবের ব্যাপারে। ইমপালস হাসপাতালের মত অন্যান্য সব হাসপাতাল চালু করুক এই মহান সেবা। এগিয়ে আসুক সরকার, শুধু রাজধানী নয় এই সেবা ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি জেলায়, উপজেলায়, পাড়া ও মহল্লার সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সব মায়েরা তাদের কোলের ছোট্ট শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ব্যথায় কাতর না হয়ে, হাসতে হাসতে ঘরে ফিরুক। মা, তুমি সুস্থ থেকে, কষ্ট কম পেয়ে একটি সন্তানকে জন্ম দাও। এটুকুই চাওয়া।

লেখক : সংবাদ পাঠক, বাংলাদেশ বেতার



মন্তব্য