kalerkantho

'বাঁশ' নিয়ে প্রশ্ন করাতেই চলে গেলো জীবন!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৪:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



'বাঁশ' নিয়ে প্রশ্ন করাতেই চলে গেলো জীবন!

অনুসন্ধান...

ঘটনাটি ১৫.৯.২০১৮ তারিখ রাত ৮:৩০ টায়, ফরিদপুর থানার শাকপালা গ্রামে। শুরুতে ঘটনার একটু পেছনে যাই- ১৮ বছরের সজিব গ্রামে সকলের কাছে অতি প্রিয়। অমায়িক এবং পরিশ্রমী এক যুবক। অষ্টম শ্রেণী পাস করার পর সাংসারিক প্রয়োজনে পিতা শুকুর আলীর সাথে কৃষি কাজে নিয়োজিত হয়। পরবর্তীতে ছেলেকে বিদেশ পাঠাবে এবং সংসারের স্বচ্ছলতা আসবে এই আশায় একমাত্র সম্বল আবাদী জমি বিক্রি করে তার পিতা বিদেশ যাবার ৩.৫ লক্ষ টাকা জোগাড় করে। 

সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সজিব মালয়েশিয়ার ভিসা পায়। সব কিছু কনফার্ম, ১৭.৯.২০১৮ তারিখ ফ্লাইট। এবার এলাকার রেওয়াজ অনুসারে আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে দোয়া নেবার পালা। ১৫.৯.২০১৮ তারিখ অর্থাৎ বিদেশ যাবার একদিন আগে ফুপুর বাসা থেকে দোয়া নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরছিল। বিধি বাম! সেই ফেরা আর হলো না। বাড়ি যাবার আগেই ক্ষত বিক্ষত মাথা এবং রক্তাক্ত মুখ নিয়ে চাচার বাড়ির সীমানা এসে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। তৎক্ষণাৎ পাবনা হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে রাজশাহী মেডিক্যালে দীর্ঘ ৭ দিন কোমায় থেকে ২২.৯.২০১৮ তারিখ রাতে সজিব মৃত্যুর কাছে পরাজয় বরণ করে।

এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে পুরো গ্রামবাসী হতবিহ্বল হয়ে যায়। সজিবকে কেউ এভাবে আঘাত করতে পারে এটা তাদের বোধগম্য হয় না। যাই হোক, একটি রাস্তা এবং তৎসংলগ্ন বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে ঘটনাস্থল হিসাবে ধারণা করে পুলিশের তদন্ত শুরু হয়। তদন্তের এক পর্যায়ে সড়ক থেকে ৫ কিমি দূরে বিলের মধ্যে কতিপয় জেলেদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, ঘটনার দিন রাতে তারা এক ব্যক্তিকে ঝোলা (ছোট খাল) পার হয়ে যেতে দেখেছে। অতঃপর সন্দেহভাজন সেই লোকটির পরিচয় এবং আনুষঙ্গিক তথ্য নিয়ে আমরা নিশ্চিত হয় যে, এই ঘটনার সাথে তার কিছুটা হলেও সম্পৃক্ততা রয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম ইব্রাহিম হোসেন পিয়াস। এই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পিয়াসকে আটক করাই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। 

এই ক্ষেত্রে রফিকুল যিনি পিয়াসের স্ত্রীর খালাতো ভাই, তিনি আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। পিয়াসের সাথে রফিকুলের সম্পর্ক অত্যন্ত অন্তরঙ্গ এবং তাদের প্রায় মোবাইলে কথাবার্তা হতো। আর আমাদের কাছে আরো বিশেষভাবে ধরা পড়ে যে, এই রফিকুল এবং ফরিদপুর থানার এসআই রাজ্জাকের ভয়েস ও ভাষা হুবুহু একই রকম। আমরা এই সুযোগকে কাজে লাগালাম। সবার সহযোগিতায় দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা পিয়াসের সাথে এসআই রাজ্জাকের কথাবার্তা শেষে নানা রকম আশ্বাস এবং প্রলোভন দেখিয়ে আমরা পিয়াসকে ঢাকা থেকে তাকে পাবনায় আনতে সক্ষম হই।

পিয়াসকে গ্রেপ্তার করার পর তার কাছ থেকে সজিবের স্যামসাং মোবাইল উদ্ধার করা হয়। এরপর জিজ্ঞাসাবাদে পিয়াস ওই দিনের সকল ঘটনা অকপটে বর্ণনা করে। ঘটনার দিন রাত ৮:৩০টার দিকে পিয়াস গোপালনগরে তার নানার বাসায় এবং সজিব তার বাড়ি শাকপালায় ফিরছিল। মৃধাপাড়ার নির্জন রাস্তার কাছাকাছি আসতে রাস্তার ওপর তাদের মুখোমুখি দেখা হয়। সজিব পিয়াসকে থামতে বলে তার নাম এবং পরিচয় জিজ্ঞেস করে। পিয়াস তার পরিচয় দিয়ে চলে যেতে থাকে। হঠাৎ পিয়াসের হাতে বাঁশ দেখে সজিব আবার তাকে ডাক দেয় এবং জিজ্ঞেস করে “এত রাতে বাঁশ হাতে নিয়ে কই যাও? চুরি টুরি করবা নাকি?” এই কথা শুনে উগ্র এবং নেশাগ্রস্ত পিয়াস হাতের বাঁশ দিয়ে সজিব কিছু বোঝার আগে তার মাথার পিছনে সজোরে আঘাত করে। মুহূর্তে সজিব মুখ থুবড়ে পাকা রাস্তার ওপর পড়ে যায়। এরপর পিয়াস বাঁশটা দিয়ে মাথার পেছন একই জায়গায় আবারো দুইটা আঘাত করে। মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে সে তখন সজিবের হাতে থাকা স্যামসাং এবং সিম্ফনি মোবাইল ২টা নিয়ে দৌড় দিয়ে বিলের মধ্যে নেমে যায় এবং যাবার সময় পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে বাঁশটি ছুড়ে ফেলে। এরপর ঝোলা পার হয়ে ওপারে যায়। 

এদিকে ভিকটিম সজিবের বিষয়ে পরিস্কার কোনো কিছু জানার আর সুযোগ হয়নি। তবে ধারণা করা হয় স্বপ্ন ও অদম্য বাসনা তাকে হয়তো উঠে দাঁড়াতে এবং রাস্তা থেকে কিছু দূরে (৫০ গজ) তার চাচার বাড়ি পর্যন্ত যেতে সহায়তা করেছে। এদিকে পিয়াসকে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ ৫/৬ ঘণ্টা অনুসন্ধান করে সকল গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে হত্যার কাজে ব্যবহৃত সেই বিশেষ ধরনের বাঁশটি উদ্ধার করা হয়েছে। বাঁশটি যথেষ্ট ভারি এবং অনেকটা লাঠিয়ালদের লাঠির মতো। পিয়াসের অপরাধ রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ইতিপূর্বে থানায় তার বিরুদ্ধে দুইটি মামলাও রয়েছে এবং মাদকসেবি হিসেবে এলাকায় নিন্দিত। এই নৃশংস ঘটনায় আদালতে পিয়াস নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দী প্রদান করেছে। সজীবদের বাড়িতে এখনো শোকের মাতম চলছে। সজিবের বাবা মায়ের কাছে তার ছেলে আর ফিরে আসবে না এবং তাদের স্বপ্নও হয়ত স্বপ্ন থেকে যাবে। তবে তার ছেলে হত্যাকারী একমাত্র আসামী পিয়াসের মতো একজন অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে অত্যন্ত আন্তরিকতা এবং পেশাদারিত্বের সাথে আমরা নিরন্তর কাজ করেছি।

সার্বিক সহায়তায় এবং কৃতজ্ঞতায়- 
পুলিশ সুপার, পাবনা। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(প্রশাসন ও অপরাধ), পাবনা। ওসি, ফরিদপুর থানা, পাবনা 
এস আই মাহমুদ, রাজ্জাক এবং তাদের টিম।
পোষ্ট সংগ্রহে, কবিরুল সাগর। 

ফেসবুক থেকে সংগৃহিত...

(এই বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়)

মন্তব্য