kalerkantho


পলায়মান স্ত্রীর সদয় সমবেদনা



পলায়মান স্ত্রীর সদয় সমবেদনা

ফেসবুক মারফত খবর পেলাম, স্ত্রী তার প্রেমিকের সঙ্গে পলায়নকালে এই বলে বেচারা স্বামীকে সমব্যথী করছেন যে, আমার জন্য ভেবো না। আমি চলে যাচ্ছি। অনেকটা যেন রবি ঠাকুরের স্টাইলে ফোনাঘাত করলেন ভদ্রমহিলা- 'আমাকে খুঁজো না, খুঁজলেও পাবে না'। সত্যিই তাই। কেউ যদি ইচ্ছে করে হাপিস হয়, তাকে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়! অনেকটা সেই জেগে ঘুমানোর মতোন ব্যাপার। 

তবে যে যাই বলুন, আমি কিন্তু এই স্ত্রীধনের ক্ষেত্রে কোনরকম দোষ খুঁজে পাই না। বরং তিনি বেশ ভালমানুষ ও সরেস প্রকৃতির মহিলা। তিনি তো তার স্বামীর সাথে মিছে প্রতারণা করেননি। বা হালে মেলা নেতা-পাতিনেতার মতোন জনগণকে মিছে টুপি পরিয়ে মেলা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা আবার নিজের হাতে ভাঙছেন না। 
    
হতে পারে গোড়া থেকেই স্ত্রী তার স্বামীকে নয়, বরং প্রেমিককে ভালবেসে এসেছেন। কিন্তু পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির মতো মা-বাবার পারিবারিক চাপে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, তাই দুর্ভাগ্যবশত কিছুকালের জন্য প্রেমিকপ্রবরকে তিনি বেঘোরে হারালেন। পরে আবার তার শুভবুদ্ধির উদয় হয়, আর তিনি স্বামীকে টাটা বাই বাই বলে প্রেমিককে বগলদাবা করে দিব্যি পালালেন। 
  
একটু ভেবে দেখুন, মেয়েটি কিন্তু চাইলে এই নিয়ে মেলা পানি ঘোলা করতে পারতেন। তখন আবার সেই ঘোলা পানিতে তার বাপ-শ্বশুর দুজন মিলে আরামসে মৎস্য শিকার করতে পারতেন। থানা-পুলিশ হত। দুই পরিবারের পুরুষ সদস্যদের তুলে নিয়ে গিয়ে পুলিশ টুকটাক খাতিরদারি করতেন। টানা-হেঁচড়া, জেরা-ফেরা, সে মেলা হুজ্জত। জেরায় জেরায় যাকে বলে জান জেরবার! 
    
মেয়েটি কী করলেন! তিনি নিপাট ভদ্রলোকের মতো প্রেমিকের ফোন থেকে স্বামীকে জানালেন যে তিনি পালিয়েছেন। তবে চোরের মতোন নয়, পালিয়ে তিনি প্রেমিকের সংসারে বহাল তবিয়তে আছেন। এই বলে সমবেদনা জানান যে, তাকে নিয়ে যেন মেলা টেনশন না করেন বেচারা স্বামী।
   
মেয়েটি বিদুষী, তাতে কিছুমাত্র সন্দিহান নই আমি। কারণ তিনি বুঝেশুনেই প্রেমিকের মুঠোফোন থেকে কল করেছেন স্বামীকে। অর্থাৎ স্বামীসাহেব ফোন নম্বর দেখেই বুঝে গেলেন তার স্ত্রী জায়গামতো মানে তার প্রেমিকের কোলে শুয়ে দিব্যি দুলছেন। তাই দৃশ্যত ও কার্যত স্বামী হিসেবে তার স্ত্রীর প্রতি কোনোরূপ দায় বা দয়া প্রদর্শনের আর দরকার পড়লো না। সবাই বলো, মারহাবা! 
    
মেয়েটি মোটেও চরিত্রহীনা নন। যারা মিসোজিনিস্ট, মানে কেতাবি বাংলায় নারীবিদ্বেষী, তারা দুষ্ট হলওয়েলের মতোন মেয়েটির চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের মিথ্যে প্রয়াস চালিয়ে খুব একটা সুবিধে করতে পারবেন না। কারণ পাবলিক বোবা হতে পারে, তবে বোকা নয় কিন্তু। মেয়েটির প্রেম তার প্রিয়তমার জন্য ‘ইনট্যাক্ট’ ছিল। তাই স্বামী বেচারা সামাজিক নিয়মে চর দখলের মতো তাকে কিছুদিন জবরদখল করেছিলেন বটে। তবে স্থায়ী জায়গির স্থাপন করতে পারেননি। মেয়েটি মেনে নিয়েছিল, তবে তা ক্ষণিকের জন্য। তিনি জানেন, মনে নেয়া আর মেনে নেয়া এক জিনিস নয়। যেমন চিনি আর সুইটনার। দুটোই মিষ্টি, তবে সুইটনার চিনির ন্যায় প্রাকৃতিক নয়, বরং কৃত্রিম। খেতে বিস্বাদ! 
   
নিন্দুকেরা এই নিয়ে মেলা কথা বলবেন। স্ত্রী জাতির চরিত্র নিয়ে কথা তুলবেন। মহামতি শেক্সপিয়র অবশ্য সেই কবেই তার ‘হ্যামলেট’ নাটকে বলেছেন, ‘ফ্রেইলটি, দাই নেইম ইজ ওম্যান’! মানে নারীজাতির চরিত্রের গাছপাথর নেই। ঠাকুরদার আমলের দেয়ালঘড়ির সেই পেন্ডুলামের মতো, বড্ড দোদুল্যমান। তার চোখ উল্টাতে সময় লাগে মাত্র দুদণ্ড। 
    
পালানোর মাঝে আমি আবার একরকম রোম্যান্টিকতা খুঁজে পাই। সাহস! দুরন্ত সাহস! আমরা কি ঝাঁসির রাণী কিংবা বীরাঙ্গনা সখিনার কথা ভুলে গেছি! দেশপ্রেম আর প্রেমাষ্পদের জন্য তারা কী না করেছেন! হাতে তুলে নিয়েছেন দোধারী তলোয়ার। আমার এই বোনটি এক অর্থে সঠিক কাজটিই করেছেন। তিনি অন্য অনেকের মতো স্রেফ লোক দেখানো তথাকথিত সমাজের চোখে ভালো থাকার জন্য প্রায় অচেনা একজনের সাথে এক ছাদের নিচে থানা গাড়েননি। তিনি চোর, তবে মিছে কথা বলেননি। এই গ্রাউণ্ডে তাকে আমাদের ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা উচিত।  
   
প্রেম স্বর্গীয়, প্রেম পূজা। জীবনে প্রেম না এলে সেই জীবনের অর্থ কী! তবে প্রেম পচে গেলে তাতে দুর্গন্ধ ছড়ায়। মেয়েটি স্বামী ছেড়ে প্রেমিকের ঘর করছেন। জানি না এর পরিণতি কী হবে! কারণ কানাঘুষায় শোনা যায়, স্বামীপ্রবর নাকি তাদের দুজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছেন। কোন ধারায় কী বৃত্তান্ত তা ক্রমশ জানা যাবে। তবে তাদের এই ত্রিভুজ প্রেমের ফল খুব একটা উপাদেয় হবে বলে মনে হয় না।      
     
পরিশেষে বলি, নারীর বিষয়ে আনাড়ির মতো কথা বলা আমায় শোভা পায় না। আমার ঘাড়ে দশখানা মাথা নেই যে, আমি অমনি শেক্সপিয়রের তালে গুড় ঢালবো। আমি ভাই ছাপোষা ছারপোকা। বউয়ের হাতে খাই-পরি, আমি তাই মানে মানে এবেলা সটকে পড়ি। যাবার আগে দুহাত তুলে দুলে দুলে বলি, জয়তু পলায়মান স্ত্রী।                   

লেখক : অরুণ কুমার বিশ্বাস
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রথম সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড 



মন্তব্য