kalerkantho

জরু সমাচার

অরুণ কুমার বিশ্বাস    

২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ১২:৩০



জরু সমাচার

ভ্যানতারা বাদ দিয়ে সরাসরি কাজের কথায় আসি। ইন্টারভিউ চলছে। সামরিক বিভাগে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছিল। পদের নাম চৌকস গোয়েন্দা। ছোকরাপানা হলে হবে না, বা থুত্থুড়ে বুড়োও নয়। চওড়া সিনাওয়ালা গোঁফ-দাড়ি সমেত পাক্কা পুরুষ চাই। নইলে জাতশত্রুর বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করবে কী করে!

বোর্ডের মধ্যমণি গমগমে গলায় বললেন, দেখুন মিস্টার, আমরা এমন একজনকে খুঁজছি যে কিনা চরিত্রগতভাবে সন্দেহবাতিকগ্রস্ত, খুনে চোখওয়ালা, প্রচণ্ড ঈর্ষাকাতর, কারো ভালো সইতে পারে না, দেখামাত্র শত্রু মনে করে, বিপুল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়, মানবতা কী জিনিস সে জানে না, প্রয়োজনে বুভুক্ষের সামনে বসে মজা করে কাবাব-নান খেতে পারে। সবচে বড় কথা প্রতিপক্ষকে দেখামাত্র তার গলা টিপে ধরতে পারে। 
    
একটু দাঁড়ান, আমি বলছি। সহসাই বোর্ডকে থামিয়ে দেয় অ্যাপ্লিক্যান্ট। মানে আমি বলতে চাই কি স্যার, এই পদের জন্য আমার স্ত্রী আবেদন করতে পারেন কি? আমার মনে হয় এর সবকটা গুণ তার আছে। তিনি দেশের জন্য তুখোড় গোয়েন্দা হিসেবে বেশ লড়তে পারবেন। শি ইজ ইউনিক।   
   
কী বুঝলেন! মেয়েদের ব্যাপারে আমি একটু বেশিই নেগেটিভ! নেভার। কক্ষণো না। নারী দেখলে আমি বরং আনাড়ি হয়ে পড়ি। নারী মায়ের জাত, বোনের বংশধর, স্ক্রী-বান্ধবী, কী না বলুন। নারী নমস্য, নারী হাঁড়ির খবর জানে। নারী নইলে উনুনে হাঁড়ি চড়বে কী করে! আমার ঘাড়ে একটাই মাথা- বেশি কথা বলে ওটা খোয়াতে চাই না। তবে ব্যাপার কী জানেন তো, নারীকে খুঁচিয়ে আমি বিমল আনন্দ লাভ করি। এটা জাস্ট একটা ফান। মানে রম্য ম্যাগাজিন। নেভার টেক সিরিয়াসলি। 
   
এবার আসল কথা- আমি জরু নিয়ে ভাবছি। এক সময় কারো গেরস্থালির অবস্থা বোঝাতে বলা হত, তিনি জরু-গরু-জমিজিরেত নিয়ে বেশ আছেন। জরু মানে স্ত্রী। স্ত্রীধন যার না আছে, সে জানে না জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে রহস্য আর সর্বনাশের বিভীষিকাময় উপাখ্যান। 
  
নিন্দুকেরা বলে- ভাগ্যবানের মরে জরু, অভাগার মরে গরু। মোদ্দাকথা, এই জরু জিনিসটা থাকার চেয়ে না থাকা মন্দ নয়। 

গুরুজী মানে রবীন্দ্রনাথ অবশ্য একখানা বেফাঁস কথা বলে ফেলেছেন। তিনি মনে করতেন স্ত্রী বুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী। মানে স্ত্রীর কথায় ওঠবস মোটেও কাজের কথা না। কিছু কিছু মেনিমুখো পুরুষ অবশ্য এখনও আছেন, যারা কিনা বউয়ের কথার বাইরে এক পাও যেতে রাজি নন। 
    
রবি ঠাকুর মোটেও অমন ছিলেন না। অন্তত তার জীবনীকার তা বলেন না। তবে তিনি একজনের বশ ছিলেন বলে শোনা যায়। তাঁর বৌঠান। বেশ ভালই সমীহ করতেন তাকে। নইলে কি আর গান হয়- ‘যামিনী না যেতে জাগালে না, বেলা হল মরি লাজে’। সেই রাতে তিনি মানে ঠাকুরমশাই কোথায় ছিলেন, লজ্জার কথা কেন আসছে- এসব নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে। আমি ভাই মামুলি আদার বেপারি, জাহাজের খবর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করাই মঙ্গল। নইলে মুফতে হয়তো আবার একখানা কেস খেয়ে বসে থাকবো।
    
ছোটবেলায় একটা টিভিসি খুব হতো। পপুলারও ছিল। ট্যাগলাইন ছিল, আমার ইয়ে সব জানে। ইয়েটা যে কিয়ে, তা বুঝতে স্কুলের গণ্ডি পেরোতে হয়েছে। সেখানে দেখা যায় এক বেকুব বোকাটাইপ লোক দুশ গজ দূর থেকে চেঁচিয়ে তার বউকে বলে, শোনো, হাঁড়ির ভিতর টাকা রাখা আছে। পাড়া-পড়শি যেন না জানে।
     
স্বামীটি ঘরে ফিরলে বউ তাকে আচ্ছাসে নাকখত দেওয়ায়। তারপর বলে, ভুলেও তুমি গলা তুলবে না। গলা খুলে যা বলো তাতে ঘরবাড়ি সব অন্যের কব্জায় যেতে মোটেও সময় নেবে না। তুমি একটা গাধা। মানুষের অযোগ্য।  
     
দিল্লি কা লাড্ডুর কথা বারবার বলা শোভন নয়। কেন, এ মুলুকে কি ও জিনিস হয় না! তবে স্ত্রী জিনিসটা অনেকটা অমনই। খুব কম পুরুষ আছেন, যারা স্ত্রীধনে ধনী বলে নিজেকে দাবি করেন। অনেকটা সুলেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই বইকেনা প্রবন্ধের মতো। গরবিনী গিফট কিনতে গিয়ে বলেন, বই! ও একখানা ঘরে আছে। 
    
বেশির ভাগ পুরুষের ভাবখানা এই, যেন স্ত্রী? ও তো ঘরে একখানা আছে। মানে সাইনবোর্ড হিসেবে একখানা থাকতে হয়। নইলে নিন্দুকে চরিত্র-ফরিত্র নিয়ে টুকটাক কথা তোলে। বিশেষ করে সিরিয়াল-খোর বেকার ও অলস মহিলা আমার দু’চক্ষের বিষ। এরা সমাজ ও সংসারে অগ্নিসংযোগ ছাড়া আর কিচ্ছু করে না। টিভির সামনে বসে বসে কুটনিপনা না শিখে দুপাক ঘুরে এলেও শরীরটা ঝরঝরে হয়। দেখতে মেয়ে মনে হয়। 
   
ও হ্যাঁ, মেয়ে আর মহিলার ফারাক বোঝেন তো! মেয়ে মানে মায়াবী, মেয়ে মানে যার বাঁকা চাহনি মর্মমূলে আঘাত হানে। আর মহিলা? দার্শনিক ফ্রন্সিস বেকনের ভাষায়, ওরা স্রেফ গাভার্নেস। প্রয়োজনে কাজে লাগে। সেবা-শুশ্রূষা, এটা ওটা সেটা এগিয়ে দেয়া। বড্ড পানসে আর মামুলি। এদের দেখে শরীরে শিহরণ জাগে না। আরো দুটো দিন বাঁচার সাধ হয় না।
  
তবে ভুলেও ভাববেন না, আমি শুধু শরীরের গুণ গাইছি। কে বলে মন বলে কিছু নেই! মন আছে, ছিল-থাকবে। মন না থাকলে সে তো তাহলে ভয়ানক দুশমন। কথায় বলে, বিউটি ইজ ওনলি স্কিনডিপ। মানে আসল সৌন্দর্য মনে, গাত্রবর্ণে নয়। কী, জম্পেশ একখানা মন-বিজ্ঞাপন দিয়ে ফেললাম! 
     
যুগটাই এখন গলাবাজির। নেতা থেকে অভিনেতা। চাপা চুপ করিয়ে রাখলেন তো, সবাই ভাববে আপনি দুর্বল। বিনয় এখন বেকুবিপনার নামান্তর। তবে পারসোনালি আমি মন-শরীর দুটোই চাই। দেহ মুটিয়ে গেলে যেমন মোহ কেটে যায়, তেমনি মনের মজা না পেলে সবকিছু কেমন আঁশকাটা মোয়ার মতো মিইয়ে যেতে থাকে। সম্পর্কের ফেঁসো উঠে গিয়ে পুরনো জামার মতো বেহুদা ঝোলে। দেখতে-শুনতে বড্ড বর্ণহীন হয়ে যায়। 
    
জরুর কথায় ফিরে আসি। জরুতে শুরু, জরুতেই শেষ। এই যে আসছি, আর কোত্থাও যাবো না। কথা দিলাম। তবে ভুলেও ভাববেন না যেন, আমি নারীবাদী। আমি এমন অনেক নারী নেত্রীকে চিনি, যারা কিনা মঞ্চে উঠে গলা ফাটিয়ে চেলস্নায়। আবার ঘরে ফিরে মেনি বেড়ালের মতো স্বামী দেবতাটির পায়ে পায়ে ঘোরে। মিষ্টি করে তেলতেলে কথা হয়। 

জরুদের জন্য কিছু পরামর্শ দেয়া যেতেই পারে। নইলে নারীগণ ভাববেন, বেহুদা ছাইপাশ গিলছি। এসব পড়ে কী এমন হবে! কথা সত্যি। আজকাল কেউ কিছু করতে চায় না। এমন কি উঠতি প্রেমিকারাও বাদাম ও তা ছিলে দেবার প্রতিশ্রুতি ছাড়া পার্কে যেতে চায় না। এই যেমন জরুরা স্বামীকে গরুর মতো ট্রিট করবেন না। হাজার হোক, সে অবসরে বিনে মাইনায় আপনার বকবক শুনছে। জেনে রাখুন, মাইনা মানে মাহিনা বা বেতন। ভাষার ব্যাপারে ইদানিং কারো মহব্বত দেখা যায় না। কী কী সব ভেজাল ভাষায় কথা বলে। জানা উচিত, ভুল বাংলা আর আঞ্চলিক ভাষা কিন্তু এক কথা নয়।
     
স্বামীরা কিন্তু অনেক উপকারী প্রাণী। পুরুষগণ মাইন্ড করবেন না। যার প্রাণ আছে সেই প্রাণী। আপনি নিশ্চয়ই নিষ্প্রাণ নন। সুন্দরী যুবতী দেখলে নিশ্চয়ই আপনার রক্তে অক্সিজেনের উপস্থিতি বেড়ে যায়! আপনি সন্দেহজনক নড়াচড়া শুরু করেন। 
   
যা বলছিলাম, স্বামীরা জরুদের অনেক উপকারে আসেন। বউয়ের সমালোচনা মানে কিন্তু তার নিন্দেমন্দ নয়। স্বামী চান, তার স্ত্রী যেন আরো উন্নতি করে, সমলোচনা থেকে শেখে। বিনে পয়সায় এমন বিশ্বস্ত টিউটর আপনি কই পাবেন! 
    
অনেকেই অভিযোগের আঙুল তোলেন স্বামীর নাক ডাকার বিষয়ে। প্রথমত, এটা কেউ ইচ্ছা করে করে না। টেকো হবার মতো। চাইলেও চুল চাঁদির সাথে আটকে রাখা যায় না। এ ক্ষেত্রে স্বামীদের হাত বা পা কোনটাই নেই। তাই মেনে নিন। তা ছাড়া একবার ভাবুন তো, স্বামীটিকে আপনি কত সুখে রেখেছেন যে তিনি নাক ডেকে শান্তিতে ঘুমোতে পারেন! কবি কামিনী রায় কী লিখেছেন- আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে। সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে! 
  
তার নাক ডাকার শব্দে আপনি ঘুমাতে পারেন না। ভালই তো। দুজন একযোগে ঘুমোলে চোর ধরবে কে! এই দুনিয়ায় কেউ কষ্ট করে বলেই তো অন্যে কেষ্টটা পায়। 
    
সেদিন কী হল, আমার এক বন্ধু মাঝরাতে আমাকে ফোন দিল। বলে কিনা ওর ভীষণ মন খারাপ, কারণ জন্মদিনে ওর স্বামী কোন গিফট না নিয়েই বাসায় এসেছে। ভাবুন, কী নির্মম! কী পৈশাচিক। একবার ভাবলাম উসকে দেই। তাতে মুফতে আমার লাভের সম্ভাবনা বেশি। পরে আবার বিবেক বাবাজি ফিসফিস করে বলল, আস্তে। বেশি লাভের লোভ করো না। লাভের গুড় পিঁপড়ে খেতে কতক্ষণ? তখন দেখবে আম্র-থলে দুটোই গায়েব, তুমি বসে ফুটো নায়েব। 

বন্ধুকে বললাম, তোমার জন্মদিনে খালিহাতে গৃহে প্রত্যাবর্তন ভয়ানক অপরাধ। এটা কোনভাবেই মানা যায় না। তুমি স্বামীর বিরুদ্ধে অকৃজ্ঞতার মামলা কারো। স্বামী এবার আসামি। স্ত্রীরত্ন কঠিন জিনিস। তাকে নিয়ে হেলাফেলা করা অনুচিত। চরম অন্যায়। পরে অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে বললাম, দেখো মেয়ে, স্বামী যা করছে তোমার ভালোর জন্যই। উপঢৌকন আনে নি তো কী হয়েছে! উপঢৌকনের টাকাটা তো বেঁচে গেল, তাই না। তোমার দুর্দিনের সঞ্চয়। কী বলো! মানে আমি বলতে চাইছি, কোনো মন্দই পুরোপুরি মন্দ নয়। কিছু না কিছু উপকার তাতে হবেই। আমি আরোকিছু কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে যাই। আমার হৃৎপিণ্ডেএ টান পড়ে।   
    
এই রে, দরজায় কোকিল ডাকছে। এবার আমাকে থামতে হয়। আমার ইয়ে মানে জরু এসে গেছে। বেচাল কিছু শুনলে আমাকে গরু কী, ঘোড়া, হাতি, বেবুন-বাঁদর আরো কতো কী বানিয়ে ছাড়বে!  
   
পুনশ্চ: কাশ্মীর পৌঁছে এক সুরসিক স্বামী ভালো দেখে একখানা হোটেল খুঁজে নেন। হোটেলরুমে ঢুকে মালপত্র সব গুছিয়ে রেখে শেষে ভাবলেন, পৌঁছার খবরটা জানিয়ে স্ত্রীকে একটা এসএমএস পাঠালে হয়। নইলে দেশে বসে বেচারি হয়তো ভাববে। স্বামী-স্ত্রীতে খুব বেশি পেয়ার-মহব্বত কিনা! স্বামীটি কষে একখানা টেক্সট লিখলেন। ভাব-ভালোবাসায় মাখোমাখো। পাঠালেনও। কিন্তু টেক্সট পাঠালেন ভুল নম্বরে। ভাব বেশি হলে যা হয় আর কি! বোধবুদ্ধি লোপ পায়। টেক্সট যার কাছে গেল সেই মহিলার সদ্য পতিবিয়োগ হয়েছে। এমনিকে তার মন খারাপ। এই জন্যে যে তিনি একা হলেন। বরং ভাবছেন এই বয়সে নতুন কোন বন্ধু জুটবে তো! সে যাকগে, ভদ্রলোকের ভুল করে পাঠানো টেক্সট পড়ে ভুল মহিলা জ্ঞান হারালেন। 
    
এবার শুনুন কী খবর ছিল সেই খুদেবার্তায়। তিনি লিখেছেন- এই মাত্র ভূস্বর্গে এসে পৌঁছলুম। কী সুন্দর জায়গা! মেঘে আর নীলে মাখামাখি। একটুও নোংরা-ময়লা নেই। চারদিকে শুধু সুন্দর আর সুন্দর। চোখ জুড়িয়ে যায়। বইয়ে পড়া স্বর্গই বটে। কিন্তু তোমাকে খুব মিস করছি গো! ভাবছি দু-চারদিনের মধ্যেই তোমাকে গিয়ে নিয়ে আসবো। 
  
ভুল মহিলা নিশ্চয়ই ভেবেছেন, স্বামীটি মরে গিয়েও তাকে ভুলতে পারেন নি। এবার ভূত হয়ে এসে তাকেও নিয়ে যাবে স্বর্গে। মানে তার মৃত্যু অবধারিত।   

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রথম সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড



মন্তব্য