kalerkantho


আগুন লেগেছে! কীভাবে নিজেকে বাঁচাবেন?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২১:০২



আগুন লেগেছে! কীভাবে নিজেকে বাঁচাবেন?

ফাইল ফটো

- পাকঘরে রান্না করছেন, হঠাৎ যদি আপনার ওড়নায় বা কাপড়ে আগুন লেগে যায় অসতর্কাবস্থায়? কীভাবে নিজেকে বাঁচাবেন?

- আপনার পাশের ঘরে আগুন লেগেছে, আপনি এখন কী করবেন?

- ঘরের বাইরে ট্রান্সফরমারে আগুন লেগেছে, এখন?

- কাউকে দেখলেন তার সাড়া গায়ে আগুন লেগে গিয়েছে কোন ভাবে, তাকে কীভাবে বাঁচাবেন?

সংক্ষেপে বর্ণনা করছি। নিজে পোস্টটি পড়ুন এবং অন্যকে পড়তে বলুন, শেয়ার দিন।

(ক) যেকোনো ধরণের আগুন লাগার জন্য তিনটি জিনিসের প্রয়োজন :

১। তাপ

২। অক্সিজেন বা বাতাস এবং

৩। জ্বালানি বা ফুয়েল (জ্বালানি বা ফুয়েল বলতে তেল, গ্যাস, কাগজ, কাঠ এধরনের সব কিছু, যাতে আগুন ধরতে পারে)

মনে রাখতে হবে এই তিনটি জিনিসের (বা মাধ্যম) যে কোন একটি মাধ্যমকে যদি সরানো যায়, তাহলে আগুন নিভে যাবে। তিনটি উদাহরণ দেইঃ

১। অক্সিজেন বা বাতাস সরিয়ে : আমরা অনেকেই এই পরীক্ষা করেছি বা শুনেছি। একটি জ্বলন্ত মোমবাতি যদি একটি গ্লাস উলটা করে ঢেকে দেই তাহলে দেখা যাবে কিছুক্ষণ পর মোমবাতিটি নিভে যাবে। কীভাবে আগুন নিভলো? গ্লাস দিয়ে মোমবাতি ঢেকে দেয়াতে আগুন জ্বলার অন্যতম উপাদান অক্সিজেন বা বাতাস প্রবাহ বন্ধ করে দিচ্ছি। গ্লাসের ভেতরের বাতাস শেষ হয়ে গেলে আগুনও নিভে যাবে। ঠিক এই জন্য যদি দেখি কোন ঘরে আগুন লেগে গেছে, তাহলে দ্রুত সেই ঘরের জানালা ও দরোজা বন্ধ করে দিন। ঘরের ভেতরের বাতাস শেষ হয়ে আসলে আগুন আপনা আপনি নিভে যাবে।

২। জ্বালানি বা ফুয়েল সরিয়ে : ধরুন আপনি একটি কাঠের টুকরায় আগুন লাগালেন (এখানে কাঠের টুকরা জ্বালনি বা ফুয়েল)। আর কোন কাঠের টুকরা বা কাগজ বা কাপড় ওই আগুনে না দিলে কী হবে? ঐ কাঠের টুকরা পুরো না জ্বলে যাওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলবে, তারপর একসময় নিভে যাবে। কিন্তু যদি আরো কাঠের টুকরা দেই? তাহলে সেই কাঠের টুকরা শেষ না হওয়া পর্যন্ত জ্বলতে থাকবে আগুন। এখন ধরুন কোথাও দেখলেন আগুন লেগেছে। তাহলে আমরা চেষ্টা করব সেই আগুনের আশে পাশের থেকে দ্রুত সমস্ত জ্বালানি বা দাহ্য দ্রব্য (তেল, কাঠ, কাগজ, কাপড় এসব যা কিছুতে আগুন লাগলে জ্বলবে) এসব সরিয়ে ফেলব। নতুন জ্বালানি দ্রব্য না পেলে আগুন একসময় নিভে যাবে। রান্না ঘরে গ্যাসের চুলায় আগুন লাগলে প্রথমেই গ্যাসের চাবি বন্ধ করে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ করে দিতে হবে। ইলেক্ট্রিসিটি বন্ধ করে দিতে হবে। এক ঘরে আগুন লাগলে পাশের ঘর বা জায়গা থেকে সমস্ত জিনিস পত্র দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।

৩। তাপ কমিয়ে বা ঠাণ্ডা করে : ম্যাচের কাঠি ঘর্ষনের ফলে আগুন ধরে। এখানে ঘর্ষনের ফলে যে তাপ তৈরি হয়, তা ম্যাচের কাঠির মাথায় সালফারকে জ্বালিয়ে দেয়। অর্থাৎ তাপ থেকে আগুন তৈরি হল। জ্বলন্ত কাঠের টুকরায় পানি ঢেলে দিলে আগুন নিভে যায়। পানি ঢেলে দিলে তাপ কমে ঠান্ডা হতে থাকবে। তাতে আগুন নিভে যাবে। ফায়ার ব্রিগেডের কর্মিরা ফায়ার হোজ থেকে পানি ছিটিয়ে দেয়। মানে ঠান্ডা করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। তবে একটু সতর্ক থাকতে হবে পানি ব্যবহারে। সব আগুনে পানি দেয়া যাবে না। যেমন আপনার ফ্রায়িং প্যান বা কড়াই এ তেলে রান্না করতে যেয়ে আগুন লেগে গেছে, সে ক্ষেত্রে পানি ছিটিয়ে দিলে আগুন ছড়িয়ে পড়বে!

তেলের আগুন আর ইলেক্ট্রিক আগুনে পানি ঢালা যাবে না। এসব ক্ষেত্রে কড়াই দ্রুত ঢেকে দিন (বাতাস বন্ধ করে দেয়া)। হাতের কাছে ঢাকুনি না থাকলে কোন কাপড়ের টুকরা বা কম্বল পানি দিয়ে ভিজিয়ে সেই ভেজা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতে পারেন। আজকাল অনেক ফ্লাট বা বাসা বাড়িতে ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকে, বেশির ভাগই পাউডার টাইপ। এই এক্সটিংগুইশার যে কোন ধরণের আগুন নেভাতে ব্যবহার করা যায়। তবে আরো অনেক ধরণের এক্সটিংগুইশার থাকতে পারে, যেমন পানি, ফোম, কার্বন ডাই অক্সাইড বা পাউডার। কার্বন ডাই অক্সাইড ঠান্ডা করে আগুন নেভায়। ইলেক্ট্রিক ফায়ারের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ এটা। ফোম তেলের আগুনে ব্যবহার করা নিরাপদ। ফোম আগুনের উপর ছড়িয়ে দিলে তা অক্সিজেন বা বাতাস সাপ্লাই বন্ধ করে আগুন নেভায়।

পাকঘরে বা কোন ঘরে আগুন লেগে গেছে। তাহলে কী করব? উপরের উদাহরণ থেকে বিস্তারিত বলছিঃ

১। জ্বালানি বন্ধ করুন। অর্থাৎ দ্রুত গ্যাসের চাবি বন্ধ করুন। মেইন গ্যাস লাইন বন্ধ করে দিন।

২। ইলেক্ট্রিসিটি বন্ধ করে দিন। এটাও জ্বালানি।

৩। দরোজা জানালা বন্ধ করে দিন (বাতাস যতটা সম্ভব আঁটকে দিন)। 

৪। আশ পাশ থেকে ‘জ্বলতে পারে’ এমন সমস্ত কিছু দ্রুত সরিয়ে ফেলুন।

এখন ছোট আগুন হলে নেভানোর চেষ্টা করুন। পানি ঢেলে অথবা ঢাকনি বা ভেজা কাপড় দিয়ে ঢেকে বা এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করে। বড় আগুন হলে একা চেষ্টা না করাই ভাল।

(খ) কারো গায়ে আগুন লাগলে কী করব?

ধরুন আপনার গায়ের কাপড়ে আগুন লেগে গেছে। কিভাবে আগুন নেভাতে পারি? উপরের লেখা থেকে বোঝা যায় তিন ভাবে নেভাতে পারব। শুধু মাত্র মাথা একদম ঠান্ডা রাখতে হবে। হাতের কাছে পাউডার টাইপ এক্সটিংগুইশার থাকলে তা ব্যবহার করুন। অথবাঃ

১। জ্বালানি সরিয়ে : কাপড় খুলতে পারলে খুলে ফেলুন। সুতি কাপড় না হয়ে নাইলন বা কৃত্রিম তন্তু হলে খুলতে না যাওয়াই নিরাপদ, কেননা এই ধরণের কাপড় আগুনের তাপে গলে গায়ের সাথে লেগে থাকবে। আর এই ধরণের কাপড়ে আগুন ছড়ায়ও খুব দ্রুত। সবচেয়ে ভাল হয় রান্না করার সময় সুতি কাপড় পরে নিলে। রিস্ক কম। 

২। ঠাণ্ডা করে : প্রচুর পানি ঢালুন। পানি স্প্রে করতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়। তাতে দু ধরণের লাভ হয়, এক- বাতসের প্রবাহ কম হবে, দুই- কুলিং ইফেক্ট বেশী অর্থাৎ ঠান্ডা দ্রুত হবে। 

৩। বাতাস বা অক্সিজেন সরিয়ে : আপনি একা থাকলেও ঘাবড়ে যাবেন না। গায়ে আগুন লাগলে সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে গাড়াগড়ি খেতে পারেন। মাটি বা ফ্লোরের সাথে গড়াগড়ি খেলে বাতাস প্রবাহ বন্ধ হয়ে আগুন নিভে যাবে। আর অন্য কারো গায়ে আগুন লাগা দেখলে হাতের কাছে কাপড় বা কম্বল থাকলে তা ভিজিয়ে তাকে ঢেকে দিন। অথবা তাকে মাটিতে গড়াগড়ি করতে বলুন। হাতের কাছে এক্সটিংগুইশার থাকলে তা দিয়ে আগুন নিভিয়ে দিন।

(গ) আগুন লাগা স্থান থেকে পালাব কীভাবে?

১। মনে রাখবেন, আগুনের ফলে ধোঁয়া হবেই। আর ধোঁয়া বাতাস থেকে হালকা। তাই তা ভাসতে ভাসতে উপরে উঠে যায়। কাজেই কোথাও আগুন লাগলে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে আসুন। নিচের দিকে ফ্লোর বা মাটির কাছাকাছি অক্সিজেন বেশী পাবেন। দম বন্ধ হয়ে মারা যাবার সম্ভবনা কমে যাবে।

২। অবশ্যই লিফট ব্যবহার করবেন না। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামুন।

৩। দৌড়াদৌড়ি হৈ হল্লা করবেন না। মাথা ঠান্ডা রাখুন। আগুন নেভানোর ব্যাপারে সাহায্য করতে পারলে চেষ্টা করুন। যেমন দরোজা জানালা বন্ধ করে দিন। আসবাবপত্র বা আগুন লাগতে পারে এমন জিনিসপত্র আশ পাশ থেকে সরিয়ে ফেলুন। অন্যকে সাহায্য করুন। এক্সটিংগুইশার হাতের কাছে পেলে তা যথাযথ ব্যবহার করুন।

(ঘ) আমাদের অসাবধানতার জন্য অনেক সময় আগুন লাগতে পারে। সচেতন হোন।

১। ঘুমানোর আগে বা বাড়ির বাইরে যাবার আগে গ্যাসের চুলা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে কিনা নিশ্চিত হয়ে নিন। কোথাও বেড়াতে গেলে অবশ্যই গ্যাস আর ইলেক্ট্রিসিটি বন্ধ করে যাবেন। 

২। এক প্লাগে অনেক সময় আমরা মাল্টি প্লাগ ব্যবহার করে অনেক ধরণের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করি। লোড বেশী হলে বিপদে পড়বেন। ভাল হয় এক প্লাগ থেকে এক যন্ত্র ব্যবহার করলে।

৩। বিছানায় সিগারেট খাবেন না। অনেক সময় সিগারেট খেতে খেতে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তে পারেন। অথবা সিগারেটের আগুন পুরোপুরি না নিভিয়ে আশে পাশে ফেললেন। এভাবে আগুন লাগার সংখ্যা অনেক। এখুনি এই বদভ্যাস পরিত্যাগ করুন।

৪। রান্নার সময় ঢোলাঢালা কাপড় না পরাই ভাল। সুতির কাপড় পরে রান্না করুন। বাতাসের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে রান্না করবেন না। আগুনের হল্কা এসে আপনার গায়ে লাগতে পারে। 

৫। ঘরবাড়ি বা অফিস সব সময় গুছিয়ে রাখুন। এলোমেলো ছড়ানো ছিটানো আসবাব পত্র বা কাপড় বা কাগজ বা নোংরা জিনিসপত্র কিন্তু দাহ্য বস্তু। আগুন লাগলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। বাগান থাকলে ঝরা ও মরা ডালপালা ও পাতা ঝাড়ু দিয়ে সরিয়ে রাখুন। 

৬। গ্যাসের লাইন, চুলা আর ইলেক্ট্রিক লাইন নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখুন কোথাও লিক আছে কিনা। শর্ট সার্কিট হতে পারে কিনা।

৭। নষ্ট বা খারাপ হয়ে যাওয়া ইলেক্ট্রিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবেন না। সময় মত সারিয়ে নিন। ভাঙ্গাচোরা প্লাগ ব্যবহার করবেন না। 

৮। ভেজা হাতে ইলেক্ট্রিক সুইচ ধরবেন না। শর্ট সার্কিট হতে পারে। আগুন লাগতে পারে। এমনকি আপনি মারাও যেতে পারেন। 

৯। বাচ্চারা যেন আগুন বা আগুন লাগতে পারে এমন কিছু নিয়ে খেলা না করে। অনেক সময় বার্থডে পার্টিতে স্নো স্প্রে ব্যবহার করি (ওই যে সাদা সুতার মত হয়ে যায়)। এটা কিন্তু অনেক বেশী দাহ্য! তাছাড়া ঝর্না বাতি বা ফায়ার ক্র্যাকার্সে আগুন লাগানোর সময় সাবধান থাকবেন। খোলা চুলে আগুন ধরে যেতে পারে। 

১০। হাতের কাছে একটি এক্সটিংগুইশার রাখুন। ব্যবহারবিধি শিখে রাখুন। এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করা কিন্তু বেশ সহজ। প্রতিটি এক্সটিংগুইশার এর গায়ে লেখা থাকে এটি কি ধরণের এক্সটিংগুইশার। কি কি ধরণের আগুনে ব্যবহার করা যাবে। ব্যবহারবিধি সবসময়ই সহজ ছবি সহ দেয়া থাকে, যাতে যে কেউ খুব সহজেই তা ব্যবহার করতে পারে।

(ঙ) গ্যাসের গাড়ির সিলিন্ডারে আগুন লাগলে?

১। গ্যাস নেবার সময় গাড়ি থেকে নেমে নিরাপদ দূরত্বে চলে যান।

২। চলন্ত গাড়ির সিলিন্ডারে আগুন লাগলে সাথে সাথে গাড়ি থামিয়ে ইগ্নিশন বন্ধ করুন ও গাড়ি থেকে নেমে নিরাপদ স্থানে সরে পড়ুন।

৩। একটা ছোট এক্সটিংগুইশার গাড়িতে রাখুন।

আজ এ পর্যন্ত। চেষ্টা করেছি যতটুকু সম্ভব অল্পতে বোঝানোর জন্য। কোন প্রশ্ন থাকলে জিজ্ঞেস করুন।

- ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেনের ফেসবুক থেকে



মন্তব্য