kalerkantho


'গলায় কাঁচি দিয়ে ৫/৬টা পোচ দিছি স্যার'

জিহাদ কবির, পুলিশ সুপার   

২৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ২০:১৪



'গলায় কাঁচি দিয়ে ৫/৬টা পোচ দিছি স্যার'

'গলায় কাঁচি দিয়ে ৫/৬টা পোচ দিছি স্যার। এর বেশি একটাও দেই নাই। তবে কাঁচিতে ধার কম ছিল, ভালোভাবে জবাই হয় নাই। আমি ইচ্ছা করে বাচ্চাটারে মারি নাই, রাগে মাইরা ফেলছি। আমার কোন দোষ নাই স্যার। ভুল হইছে, মাফ কইরে দ্যান।'

ভাবুন তো, আপনার ০৬ বছরের একমাত্র পুত্র সন্তানের খুনি যদি সাবলিলভাবে আপনার সামনে এমন কথা বলে তবে আপনার ক্যামন লাগবে? তাহলে ক্যামন লেগেছিল পাবনার বেড়া থানাধীন খাকছাড়া গ্রামের তামিমের বাবা- মার। নিশ্চয়ই রাগে ঘৃণায় বিষিয়ে উঠছে মন, তাই না? তবে শুনুন পুরো ঘটনাটা।

গত ১০/০১/২০১৮ তারিখে বাড়ির আঙিনায় বল নিয়ে খেলা করছিল মুনছুরের পুত্র তামিম। ফুটফুটে ফুলের মত বাচ্চা একটা। একটু পর পর মা উঁকি দিয়ে দেখছিলেন বাচ্চাটাকে। বড় মেয়ে মিথিলা জন্মের প্রায় ৬ বছর পর তার ঘর আলো করে এসেছে তামিম। একটু দুরন্ত, তবে ভারী লক্ষ্মী ছেলে। সম্প্রতি খেলতে গিয়ে পায়ে ব্যাথা পেয়েছিল। একটু সাবধানে না রাখলে হয়তো আবার কোথাও ব্যাথা পাবে। তাছাড়া এই বছরই স্কুলে ভর্তি হয়েছে বাবুটা। দেখে রাখতে হবে ওকে। বাবার ইচ্ছা বড় হয়ে ভালো ক্রিকেটার হবে সে। তাই পুরো নাম রাখা হয়েছে মাশরাফি মর্তুজা তামিম। কিন্তু ছেলেটা ক্রিকেট নয় ফুটবল খেলতেই বেশি পছন্দ করে। এসব নানা এলোমেলো সুখ ভাবনা ভাবতে ভাবতে এক সময় তামিমের মা তামিমের কথা ভুলেই গেলেন। ঘণ্টা খানেক পর বাড়ির অঙিনায় তামিমকে খুঁজতে এসে পেলেন না ওকে। এরপর তামিমের বাবা বাড়ি ফিরে ছেলের খোঁজ করেও কোন হদিস পেলেন না। তবে জলজ্যান্ত বাচ্চাটা গেল কোথায়? একটু একটু করে দিনের আলো ফুরিয়ে আসতে লাগল। মা- বাবার চিন্তা বাড়তে লাগল। প্রতিবেশীরাও খোঁজা শুরু করল। হঠাৎ বাড়ির পিছনের খড়ের গাঁদার পাশে গিয়ে চিৎকার দিয়ে তামিমের মা মুর্ছা গেলেন। অন্যরা দৌড়ে এসে দেখেন, বাচ্চাটার নিথর দেহ খড়ের গাঁদার পাশে অসাড় অবস্থায় পড়ে আছে। অন্ধকারের মধ্যে ভালো বোঝা না গেলেও হাসপাতালে নেবার পথে বাচ্চাটার গলায় গভীর ক্ষত দেখা গেল। হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক বাচ্চাটিকে মৃত ঘোষণা করেন। এখন প্রশ্ন হল, ফুলের মত নিস্পাপ শিশুটিকে কে হত্যা করলো? কি ঘটেছিল তামিমের সাথে? কোন প্রশ্নেরই উত্তর পাওয়া যাচ্ছিল না।

এর মধ্যে পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়। বেড়া থানার অফিসার ইনচার্জ, ইন্সপেক্টর (তদন্ত), এসআই/সুব্রত সকলে মিলে রহস্যের কিনারা খুঁজতে থাকেন। কেউ কেউ বলাবলি করতে থাকে জিন-ভূতের কাজ এটা। কিন্তু, তদন্তকারী অফিসারের সন্দেহপ্রবণ মন ভাবতে থাকে অন্য কথা। তাই একে একে সকলকেই জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে বেড়া থানার তদন্তকারী দল। এক পর্যায়ে মা- বাবার পরকিয়া সংক্রান্তে কোন বিষয় ছিল কি না তাও জানার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তেমন কিছুই মেলে না। তবে তামিমের চাচী আঞ্জুয়ারার কথাগুলি খাপছাড়া লাগে। কেননা আঞ্জুয়ারা ঠিক সন্ধ্যার সময় কি মনে করে একজন গ্রামীণ বধু হয়েও বাড়ি ছেড়ে বাজারে ন্যাশনাল আইডি কার্ড ফটো কপি করতে গিয়েছিল তা স্পষ্ট হয়। কি এমন মহা দরকার তা বোঝার চেষ্টা করা হয়। তাছাড়া মহিলা বার বারই কেবল বাজারে যাওয়ার গল্পটাই ফলাও করে শোনাচ্ছিল। ইতিমধ্যে জানা যায়, তামিমের বাবার সাথে আঞ্জুয়ারার স্বামীর পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে বিশাল ঝগড়া হয়েছিল কিছুদিন আগে। এই সব বিছিন্ন বিষয়াদি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে আঞ্জুয়ারার আচরণ যথেষ্ট সন্দেহজনক মনে হয়। তাকে আরও বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সে তার পূর্বের বর্ণনাকৃত কথার সাথে তাল মিলাতে পারে না। এলোমেলো বর্ণনা শুরু করে। তখন পুলিশ তাকে বলে যে সরঞ্জামাদি দিয়ে বাচ্চাকে হত্যা করা হয়েছে সেটাও যদি আঞ্জুয়ারা বের করে দিতে পারে, তবে তাকে সাহায্য করা হবে। অবশেষে যে কাঁচি দিয়ে তামিমকে জবাই করা হয়েছে সেটার সন্ধান দেয়। তার দেখানো মতে তারই বাড়ি থেকে কাঁচি উদ্ধার হলে আর সন্দেহ থাকে না যে ঘটনাটি কে ঘটিয়েছে। এরপর আরোও চাপ দিলে আঞ্জুয়ারা জানায়, তার দেবর (তামিমের বাবা) গত ১৬ ডিসেম্বর বসত বাড়ি নিয়ে তার সাথে প্রচণ্ড ঝগড়া করে। এক পর্যায়ে তার মুখে থুথু ছিটিয়ে দেয়। এই রাগ সে ভুলতে পারে নাই। প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে থাকে তার মনে। সে সুযোগ খুঁজতে থাকে। সেই সুযোগ চলে আসে ১০ তারিখ বিকালে। বাচ্চাটা বল নিয়ে খেলছিল উঠানে। আশে- পাশে কেউ ছিল না। বিস্কুট দেবার লোভ দেখিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে যায় আঞ্জুয়ারা। পাশাপাশি ঘর বিধায় বেশি সময় লাগে নি। ঘরে নিয়ে প্রথমে শ্বাস রোধ করা হয় বাচ্চাটির এরপর মৃত্যু নিশ্চিত করতে কাঁচি দিয়ে গলায় পোচ দেওয়া হয়। সুযোগ বুঝে বাচ্চার মৃত দেহ কোলে উঠিয়ে ঘরের পিছনে খড়ের গাদায় ফেলে দেয় সে।

এ ব্যাপারে বেড়া মডেল থানার মামলা নং- ০৪, তারিখ- ১১/০১/২০১৮ খ্রিঃ, ধারা- ৩০২/২০১/৩৪ দঃ বিঃ রুজু হয়েছে। রুজুকালীন রহস্য উদঘাটিত না হওয়ায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা রেকর্ড হয়। পরে ধৃত আসামি আঞ্জুয়ারা বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এই হৃদয় বিদারক ঘটনায় এলাকায় শোকের মাতম চলছে। সবার একটাই প্রশ্ন নিজের চাচীর কাছেও যেহেতু শিশুরা নিরাপদ নয় তবে পৃথিবী কোন দিকে এগুচ্ছে। এমন সভ্যতা আমাদের কাম্য নয়। তামিমের আত্মা শান্তি পাক। হত্যাকারী শাস্তি পাক- এই প্রত্যাশা রইল।

অনুলিখন : মিয়া মোঃ আশিষ বিন হাছান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, বেড়া সার্কেল, পাবনা

- জিহাদ কবির, পুলিশ সুপার, পাবনা -এর ফেসবুক থেকে



মন্তব্য