kalerkantho


এম আর খান স্যারদের মৃত্যু নেই, তাঁর কীর্তিই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে

আতাউর রহমান কাবুল   

৫ নভেম্বর, ২০১৭ ১৪:৪৬



এম আর খান স্যারদের মৃত্যু নেই, তাঁর কীর্তিই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে

এম আর খান স্যারের সঙ্গে লেখক

প্রতি বছরই এম আর খান স্যারের জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে কিছু না কিছু লিখতাম। আজ লিখছি স্যারের প্রথম মৃত্যুদিবসে।

তিনি ছিলেন আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন একজন ব্যক্তি এবং যিনি আমার অভিভাবকতুল্য।

যখন কাগজ কলমের তেমন একটা প্রচলন ছিল না। তাল পাতায় হাতের লেখা চর্চা হতো। হাড়ির কালি আর সিমপাতার রস দিয়ে বানানো কালি আর বাঁশের কঞ্চির কলমে তাল পাতায় লেখা হতো-তখনকার সময়ের ছাত্র ছিলেন শিশু বিশেষজ্ঞ, জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান স্যার। প্রবাদ আছে, কোন শিশু যত কান্নাই করুক না কেন, একজন মানুষকে দেখলে তার কান্না থেমে যেতো। রাতে ফোনে যখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন হসপিটালে ভর্তিরত শিশু রোগীদের খোঁজ-খবর নিতেন, তখন যদি শুনতেন কোন শিশু মারা গেছে-আর কোন কথা না বলে রিসিভারটি রেখে দিতেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশের শিশু স্বাস্থ্যের জনক হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত, শিশুবন্ধুখ্যাত সেই জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান স্যারের আজ প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।  

এম আর খান স্যারের পেনশনের টাকা দিয়ে গড়েন ডা. এম আর খান-আনোয়ারা ট্রাস্ট। দুস্থ মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, তাদের আর্থিক-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে এ ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি নিরন্তর কাজ করেছেন।

তাঁর উদ্যোগে গড়ে উঠেছে জাতীয় পর্যায়ের শিশুস্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠা করেছেন শিশুস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। গড়ে তুলেছেন সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতাল, যশোর শিশু হাসপাতাল, সাতক্ষীরা ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, রসুলপুর উচ্চবিদ্যালয়, উত্তরা উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতাল, নিবেদিতা নার্সিং হোমসহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া তিনি দেশ থেকে পোলিও দূর করতে উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছেন, কাজ করেছেন ধূমপানবিরোধী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান 
‘আধূনিক’-এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে। প্রতিষ্ঠানতুল্য এই মানুষটির জীবনী স্থান পেয়েছে কেমব্রিজ থেকে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল 'হু ইজ হু অব ইন্টেলেকচুয়াল'-এ। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক ম্যানিলা অ্যাওয়ার্ড, একুশে পদকসহ আরও অনেক পুরস্কার।
 
২০০৭ সালের দিকে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। স্ব-স্নেহে তিনি আমায় আগলে রাখতেন। কোন অনুষ্ঠান থাকলে তিনি আমাকে সরাসরি ফোন করতেন। হয়তোবা বিলম্বে পৌঁছেছি। লক্ষ্য করতাম, স্টেজ থেকে আমাকে দেখেই মুগ্ধ একটা হাসি দিচ্ছেন, বসতে ইশারা করছেন। আমার উপস্থিতিতে স্যার কেমন একটা আলাদা তৃপ্তি পেতেন, যদিও এর কোনো কারন খুঁজে পাইনি।  

স্যারের জীবনী নিয়ে বই জীবনের 'জ্বলছবি' প্রকাশ হয় ২০০৮ সালের দিকে। আমি তখন কাঁঠাল বাগান এলাকায় থাকি। আমার আব্বা তখন কিডনি ফেইলুওর রোগী, সপ্তাহে দুই-তিনবার ডায়ালাইসিস নিতেন। সেন্ট্রাল হাসপাতালের সহাকারী পরিচালক ডা. ফাহিম আহমেদ রুপম ভাই একদিন বললেন, 'চলো আজ স্যারের বইয়ের প্রুফ দেখি। ' চলে গেলাম সেন্ট্রাল হাসপাতালে। সারারাত দুজনে মিলে স্যারের বইয়ের প্রুফ দেখলাম। আমি যতই বইয়ের ভেতরে যাচ্ছি ততই অবাক হচ্ছি। একজন মানুষের জীবন এত ঘটনাবহুল তা ভাবতেই অবাক লাগছে। বিশেষ করে ওই সময় বিলেতে লেখাপড়াকালীন তিনি যে কষ্ট করেছেন, যে ঝুঁকি নিয়েছেন-তা পড়ে রীতিমতো অবাক হয়েছি।

এম আর খান স্যারের পকেটে সব সময় কাঠ পেন্সিল এবং সাদা কাগজ থাকতো। এর কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম একদিন। স্যার বলেছিলেন, ‌'কাঠ পেন্সিল দিয়ে লিখার সুবিধা হলো কোন ভুল হলে তা মুছে আবার লেখা যায়। '

একদিন স্যারে বাসার ড্রইং রুমে বসে গল্প করছিলাম। স্যার লুঙ্গি পরে আমার সঙ্গে বসে বসে কথা বলছিলেন। আমি স্যারকে প্রশ্ন করলাম, স্যার অনেক চিকিৎসক রোগীর পরীক্ষা-নিরিক্ষা থেকে কমিশন খায়। এটাকে কীভাবে দেখেন? তিনি শুধু বললেন, 'যারা এটা করে তারা বেশি দিন টিকে থাকে না। '

আমার সাবেক কর্মস্থল 'আমার দেশ' পত্রিকাটি ২০১৩ সালে সরকার বন্ধ করে দিল। ওই বছরই আমি বিয়ে করলাম। বিয়ে করার ওই মাস থেকে শুরু করে বছরখানেক রীতিমতো বেকার ছিলাম। স্যারের সঙ্গে একদিন সেন্ট্রাল হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে চাইল্ড হার্ট ট্রাস্টের অনুষ্ঠানে দেখা। তিনি আমার কথা জেনে, সঙ্গে সঙ্গে কাঠ পেন্সিল আর কাগজ বের করলেন। আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকার মালিক ও সম্পাদক কাজী রফিকুল আলম সাহেবের নিকট লিখে দিলেন একটা চিঠি । বললেন, 'তুমি ওখানে গিয়ে আমাকে ফোনে ধরিয়ে দিও। ' প্রথম আলোতে যাতে জয়েন করতে পারি সেজন্য আরো একটি চিঠি দিলেন। পরে চিঠি নিয়ে আসলে কারো কাছেই যাওয়া হয়নি, এখনো চিঠি সংগ্রহে রেখেছি। কিছুদিন পর কালের কণ্ঠ'র ফিচার এডিটর জামিল ভাইয়ের ফোন পাই। এরপর কালের কণ্ঠে জয়েন করি।

আমার স্ত্রী তখন সন্তানসম্ভাবা। এম আর খান স্যারের সঙ্গে সেন্ট্রাল হাসপাতালে দেখা হলে তাকে বিষয়টি জানালাম। তিনি কাগজ  ও কাঠপেন্সিল বের করে সাদা কাগজে গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মালিহা রশিদ আপার কাছে চিঠি লিখে দিলেন। বললেন, তার কাছে রেগুলার চেকআপ করাতে। মহাব্যস্ত মালিহা আপার চেম্বারে গিয়ে আমিতো অবাক। যেখানে আপার সিরিয়ালই পাওয়াই কঠিন, সেখানে তিনি স্যারের রেফারেন্স পেয়ে আমার কাছে কোন ভিজিটই নিলেন না! যারা আসলে স্যারকে ভালোবাসতেন, তারা স্যারের সবকিছুকেই সম্মান জানাতেন।

বিশিষ্ট লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মবিন খান, কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদ, বিএমডিসির প্রেসিডেন্ট, নবজাতক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা স্যারের মতো দেশের প্রখ্যাত বহু চিকিৎসকগণ এম আর খান স্যারের ছাত্র। হারুন স্যারকে দেখেছি, তিনি এম আর খান স্যারকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। কিডনি ফাউন্ডেশনের কোনো অনুষ্ঠানে অন্য কেউ থাকুক আর না-ই থাকুক, এম আর খান স্যারকে প্রধান অতিথি বা বিশেষ অতিথি হিসেবে রাখবেনই। একদিনের অনুষ্ঠানে কোনো এক মন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করায় মন্ত্রীতো নিজেকে অপমানিত বোধ করে বলেই ফেললেন, এম আর খান স্যার থাকতে অন্য কাউকে প্রধান অতিথি মানায় না।

এম আর খান স্যার যখন অসুস্থ হয়ে সেন্ট্রাল হসপিটালে ভর্তি ছিলেন, তখন আমার স্ত্রীকে নিয়ে স্যারকে একদিন দেখতে গিয়েছিলাম। সেদিন আমার মনটা বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। স্যারের চেহারা কেমন জানি ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। মুখে নেই সেই জৌলুস, নেই চিরাচরিত সেই হাসি! এমন ফ্যাকাশে মুখ এর আগে কখনো দেখিনি। কিন্তু এমন একজন মহান মানুষের জীবন সায়াহ্নে তাঁকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার সরকারি কোন উদ্যোগ ছিলো না। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কোনো মন্ত্রী স্যারকে দেখতেও আসেনি। হয়তো এখনকার চিকিৎসকদের মতো তিনি ড্যাব বা স্বাচিপ করতেন না বলে। তিনি অতটা দলকানা হয়ে কারো লেজুরবৃত্তি করেননি বলে। এ নিয়ে আমার বেশ কষ্ট হচ্ছিল। একদিনতো প্রতিবাদী স্ট্যাটাস লিখেই ফেললাম ফেসবুকে।

সেন্ট্রাল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধী অবস্থায়ও স্যারকে দেখতে গিয়েছি। তাকে আগে যেভাবে দেখেছি সেভাবেই তিনি নির্লিপ্ত থাকতেন। কখনো মৃত্যুভয়ে ভিত হতে বা আবেগপ্রবণ হতে দেখিনি স্যারকে।  

তিনি আসলে কি ছিলেন, এটা বুঝছি তাঁকে হারিয়ে। এম আর খান নেই, যেন মাথার ওপর ছাতাটা সরে গেছে। স্যার আসলে মরেননি। তাঁর কৃতিই স্যারকে বাঁচিয়ে রাখবে শত শত বছর।

লেখক : বিভাগীয় সম্পাদক, স্বাস্থ্য, দৈনিক কালের কণ্ঠ  


মন্তব্য