kalerkantho


স্মরণ

ছবির সাথেই বসবাস আমার

মিতা দাশ গুপ্ত    

৩ এপ্রিল, ২০১৭ ১৪:০৮



ছবির সাথেই বসবাস আমার

২০১৬-এর ৩ এপ্রিল। আমার এবং আমার মেয়েদের জীবনের এক চূড়ান্ত বিপর্যয়ের দিন।

এই দিনে আমরা আমাদের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে হারিয়েছি। যাকে ছাড়া আমাদের একটি দিনও চলতে চাইতো না, যার সঙ্গে  আলোচনা না করে আমরা একটি সিদ্ধান্তও নিতে পারতাম না, সেই মানুষটাকে আমরা হারিয়ে ফেললাম চিরদিনের জন্য।

হ্যাঁ, বলছিলাম আমার স্বামী অচিন্ত্য দাশ গুপ্তের কথা, যিনি ছিলেন একজন গবেষক। যার গবেষণার বিষয় ছিল প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা। যার জন্য তাকে ছুটে বেড়াতে হয়েছে শহর থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে। সেই সদা কর্মব্যস্ত মানুষটি হঠাৎ অশরীরী হয়ে গেল। শরীরী মানুষটি  আমার কাছে ছবিতে রূপান্তরিত হলো। হ্যাঁ, সত্যি তুমি ছবি হয়ে গেলে আমাদের জীবনে। তোমার স্মৃতি, আদর্শ, তোমার নীতিই এখন আমাদের কাছে একমাত্র সম্বল।

আজ ২০১৭-এর ৩ এপ্রিল পূর্ণ হলো একটি বছর। আজও তোমাকে নিয়ে লিখতে বসে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে বার বার। হাজারো প্রশ্ন জাগে মনে। কিন্তু এসব প্রশ্নের জবাব আমাকে কে দেবে? তাই আবার নিজেকে নিজেই শান্ত করার চেষ্টা করি। নিজেকে বার বার বলতে থাকি-- বাস্তবতা তো তোমাকে বুঝতে হবে! মানতে হবে! তাই চেষ্টা করছি তোমার ছবির সঙ্গে বাস করতে, ছবির সঙ্গে কথা, ছবির সঙ্গে আলোচনা করতে। এমনকি পরামর্শ চাওয়ার মতো কাজগুলিও আমি করে থাকি এভাবে।

উৎসর্গ করা তো হয় হরহামেশায়। মেয়েদের সব অর্জন তোমাকে উৎসর্গ না করতে পারলে তো আমার নিজেকে ভীষণ অকৃতজ্ঞ মনে হয়। আমার সব সময় মনে হয় একজন কৃষক ফসল উৎপাদনের জন্য ফসলের মাঠকে যেমন তৈরি করেন, তার জন্য তাকে যে কী নিরন্তর পরিশ্রম করতে হয়; রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে কৃষক কাজ করে যান ভালো ফসলের আশায়, অধিক ফসলের আশায়। তেমনি তুমি নিরন্তর পরিশ্রম করেছিলে তোমার মেয়েদের তৈরি করার জন্য।

মেয়েদের পড়াশুনো, তাদের মানুষ করার জন্য তোমার ছিল অক্লান্ত পরিশ্রম। এ ব্যাপারে তোমাকে কখনো ক্লান্ত হতে দেখিনি। বিশেষ করে আমি দেখেছি যখন আমাদের ছোট মেয়ে অসুস্থ ছিল তখন তুমি যা করেছ তার জন্য তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার নেই। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, সে এক অসাধ্য কাজ করেছিলে তুমি। সেজন্য স্যালুট তোমাকে।

২০১৬-এর মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় হবে। তখন তোমার শরীর খুব খারাপ। কিন্তু তুমি ছিলে অবিচল, নির্ভীক এবং শান্ত; যেন মৃত্যুকে তুমি বীরের মতো  বরণ করে নিয়েছ। যখন তোমার শ্বাসকষ্ট খুব বেড়ে যেত, আমি এত অস্থির হয়ে পড়তাম, কি করবো, কি করে তোমার কষ্ট কমানো যায়- তার জন্য সমানে দৌঁড়াতে থাকতাম। তুমি হাত দিয়ে ইশারায় বলতে,  বস বস, ঠিক হয়ে যাবে। এমনি করে কঠিন দুর্যোগের সময়ও আমাকে সাহস দিয়েছ।

একদিনের কথা খুব মনে পড়ছে। আমি তোমার দুই গালের উপর হাত রেখে বলছিলাম, 'কেন তোমার এত তাড়াহুড়ো! কেন এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে চাইছ তুমি? এত কষ্ট করলে মেয়েদের জন্য, মেয়েদের সাফল্য তুমি দেখবে না?' আমার এ আবেগময় অভিব্যক্তিতেও তোমার মধ্যে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করিনি। তুমি একটুও আবেগপ্রবণ হলে না। একেবারেই স্বাভাবিক রইলে।

তিন দিন পর তুমি আমায় বললে, 'তুমি যে সেদিন আমায় বললে মেয়েদের জন্য এত কষ্ট করলে, মেয়েদের সাফল্য দেখে যাবে না! সত্যি আমার খুব ভালো লেগেছিল। কারণ তুমি এত আন্তরিকভাবে কথাটা বলেছিলে। '

সত্যি আমি আন্তরিকভাবেই কথাটা বলেছিলাম। মেয়েদের সাফল্য উপভোগ করার অধিকার শুধু তুমিই রাখ। তোমার পাওয়ার পর যদি কিছু থাকে সেটুকু হলো আমার। এর বেশি কিছু নয়। ওই যে আগেই বলেছিলাম, একজন কৃষক ফসলের মাঠ তৈরির জন্য যেমন নিরন্তর পরিশ্রম করে, সমস্ত পরিশ্রমের কথাই কৃষক ভুলে যায় যখন ফসলের মাঠ ঝলমল করে ওঠে। তখনই কৃষকের আসল আনন্দ, আসল তৃপ্তি। আর তোমার ফসলের মাঠ যখন ঝলমল করছে তখন সেই আনন্দ উপভোগ না করেই তুমি চলে গেলে। তোমাকে ছাড়া কি আমি তা উপভোগ করতে পারি?

- স্বামী অচিন্ত্য দাশ গুপ্তের মৃত্যুর এক বছর পূর্ণ উপলক্ষে তাঁর স্মরণে স্ত্রী মিতা দাশ গুপ্ত


মন্তব্য