kalerkantho

Probasher kanna

‘তার মানে আজ কোনো জানাজা পড়তে হবে না...’

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৭ মে, ২০১৮ ১৬:১৬



‘তার মানে আজ কোনো জানাজা পড়তে হবে না...’

ফাইল ফটো

দেশ ছেড়ে প্রবাস জীবননের শুরুটা আমার প্রায় ১৯ বছর আগের। দেশ ছাড়ার শেষ কয়েকটা দিন এখনো আমার স্মৃতির পাতাতে জ্বলজ্বল করছে। মনের ভেতর ছিল একটা চাপা উত্তেজনা, কিছুটা অজানা আতঙ্ক, নতুন দেশ- অজানা সবকিছু। 

অবশেষে প্লেনে চেপে বসার দিনটি চলে এলো, বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব সবার থেকে বিদায় নিয়ে চোখের পানি মুছে শেষ পর্যন্ত প্লেনে চড়ে বসলাম, সাথে আমার স্ত্রী এবং ৪ বছরের সন্তান। শুরু হলো আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায়, মানে বিদেশের জীবন, এর মাঝে একে একে কেটে গেলো ১৯টা বছর | এর-ই ভেতরে রয়েছে অনেক পাওয়া না পাওয়ার গল্প, রয়েছে অনেক ব্যর্থতা আর সাফল্যের গল্প। 

যাক সেই গল্প আর একদিন করা যাবে, আমার আজকের গল্পটা এই রকম-

শুক্রবার দিনটা কাটে আমার একধরণের ব্যস্ততা নিয়ে। দিনের শুরুতেই যাই নিজের ব্যবসায়, মানে আমি আর আমার ওয়াইফ দুইজনে মিলে ছোট একটা ব্যবসা চালাই, কাজে গিয়ে প্রথমে আগের দিনের হিসাব-কিতাব করে ছুটে যাই ব্যাংকে, তারপর ফিরে এসে কিছুক্ষন দোকানে বসতে বসতেই দুপুর সাড়ে ১২টা বেজে যায়।এবার ছুটি বাসার দিকে, বাসায় গিয়ে গোসলটা সেরে ছুটি মসজিদে,দেরি করে গেলে আবার গাড়ি রাখার পার্কিং পাওয়া যায় না।

আমার বাসার কাছেই মাশাআল্লাহ টরন্টো শহরের সব থেকে বড় মসজিদ, নাম NUGGET MOSQUE। যত ব্যস্ততাই থাকুক না কেন, সবসময় চেষ্টা করি জুম্মার নামাজটা মসজিদে গিয়ে পড়ার জন্য। 

মসজিদের পার্কিং লটে গিয়ে ইদানিং আমার চোখ প্রথমেই যেটা খোঁজে সেটা হলো FUNERAL HOME-এর লম্বা কালো গাড়িটা পার্ক করা কিনা, যদি না থাকে তার মানে আজ কোনো জানাজা পড়তে হবে না, তার মানে আজ আর কাউকে বিদায় দিতে হবে না- মনটা তখন ভালো হয়ে যায়। 

খুব কম শুক্রবারে এমন হয় যে কারো না কারো জানাজা হয় না,জুম্মার নামাজের পরেই সাধারণত মসজিদে জানাজাগুলো হয়। এমনও হয়- একসাথে আমরা ৩টা জানাজা পড়ি জুম্মার নামাজের পরে, তারপর যার যার লাশ চলে যায় কবরস্থানে, আবার কারো লাশ জানাজার পরে নিয়ে যাওয়া হয় নিজ দেশে দাফনের জন্য। এর মধ্যে বাংলাদেশি থাকে, পাকিস্তানি থাকে। আরও বিভিন্ন দেশের মানুষের জানাজা এখানেই হয়। 

প্রতি জানাজার পরে আমি মসজিদের ভিতরে অপেক্ষা করি, শেষবারের মতো কফিনের বাক্সটা ধরে আল্লাহতালার দরবারে দোয়া চাই, তার জন্যে... জানিনা কেন একধরনের মিল খুঁজে পাই নিজের সাথে আর ওই কফিনের বাক্সে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটার সাথে! এই মানুষটাও একদিন আমার মতো একবুক আশা নিয়ে নিজের দেশ আর মাটি ছেড়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে নিজের নতুন জীবন শুরু করেছিল, কতটুকুই বা ছিল তার স্বর্থকতা আর কতটুকুই বা ছিল ব্যর্থতা? 

সেইদিন এই লোকটিও আমার মতো দেশ ছেড়ে আমার মতোই প্লেনে চড়ে বসার সময় কি সে জানতো যে, নিজের দেশ ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরে কানাডার মাটিতেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে!? জানিনা, কার ভাগ্যে আল্লাহ কী লিখে রেখেছেন, তবে কবির এই কথাটি আমি মানি "জন্মিলে মরিতে হইবে সত্য"। তাই সবসময় আল্লাহ সুবাহানাহুতায়ালার কাছে দোয়া করি যেন, আমার বিদায় যেন ঈমানের এবং সম্মানের সাথে হয় ...আমিন...সুম্মা আমীন!

 কাজি সাজ্জাদ হোসেন, কানাডা থেকে



মন্তব্য