kalerkantho

Probasher kanna

জুয়েল এখনো হয়তো টিকিটের টাকা জোগাড় করতে পারেনি ...

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৬ মার্চ, ২০১৮ ১০:২৭



 জুয়েল এখনো হয়তো টিকিটের টাকা জোগাড় করতে পারেনি ...

প্রতীকী ছবি

জুয়েল আমার বন্ধু ছিল। ভীষণ ক্যাজুয়াল ফ্রেন্ড। গ্যাদা কালের বন্ধু। হারামিটা বড় হয়েই বদ হয়ে গেলো। রাতের বেলা নানান মাইয়ারে ফোন দিয়ে -"ক্যামনে ঘুমাও? কি পইড়া ঘুমাও" জিজ্ঞেস করে বলে আমরা নালিশ পাই। পড়াশুনার আশেপাশেও নাই।

সেই জুয়েল ক্যামনে ক্যামনে একটা স্কলারশিপ পেয়ে চলে গেলো ইংল্যান্ড। যাবার সময় তার সে কি উল্লাস -'এইবার শালা একটা কাণ্ড কইরা ফালামু দেখিস। লাভার বয় হইয়া যামু একেবারে। আমাগো মাইয়াগুলা এমন ব্যাকডেটেড। হাত ধরা পর্যন্ত যাইতেই এগো দুই তিন বছর লাইগা যায়। আমার যৌবন এক্কেরে শ্যাষ হয়ে গেল এই দ্যাশে জন্মায়। এইবার একটা দ্যাশের মত দ্যাশে যাইতিছি। লাভার বয় হইয়া যামু দেখিস'।

জুয়েল ফর্সা মসৃণ পায়ের স্বপ্ন মাথায় নিয়ে ইংল্যান্ড চলে গেলো। একমাস পর আমায় একদিন ফোন দিয়ে ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো-'বর্ষা এসে গেছে নারে?'

আমি তখন মিরপুর বাঁধের ওপর আরও পাঁচ ছয় বন্ধুর সাথে ঝুম বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে চটপটি খাচ্ছি। হাউকাউ করে বললাম- 'সেই বৃষ্টি হইতেসেরে মামা (আমাদের দেশে একবার এমন ট্রেন্ড এসেছিল, আমরা সবাই সবার মামা হয়ে গিয়েছিলাম) চটপটি খাই আর ভিজি।

ওপাশে জুয়েলের কোন শব্দ নাই। অনেকটা সময় থেমে বলল -'চলনবিল যাবো ঠিক করছিলাম না এইবার। তোরা কি জাচ্ছিস?'

সেই পরিকল্পনা মনে পরতেই আমি আরও একবার উৎফুল্ল হয়ে বললাম- 'অবশ্যই যাইতিছি। তুমি মামা ইংল্যান্ড বইসা বইসা ঠ্যাং দ্যাখো।" 
বলেই মনে হোল জুয়েল ফোনের ওপাশে কাঁদছে। ততক্ষণে আমি একটু বুঝতে পারছি, ফাইজলামি বন্ধ করে শান্ত গলায় বললাম -'তুই ভাবিস না তো। সামনের বছর তুই সেমিস্টার ব্রেকে আইলে আবার যাবো।'

জুয়েল ধরা গলায় রাগী ভঙ্গিতে বলল -'চলনবিল যাওয়ার প্ল্যান করছি আমি, তোরা কত বড় কুতুব হইছস, আমারে ছাইড়া চইলা যাইস? আম্মা আমারে খুব গালাগাল করবে এখন আইসা পরলে। গাইল দিলে গাইল দিক, আমি কি ডড়াই। এই বা ..র দেশে মানুষ থাকে? সাদা ঠ্যা‌ঙ্গের গুষ্টি কিলাই। আমি টিকিটের টাকা জোগাড় করতে পারলেই চইলা আসবো। খবরদার তোরা একলা যাবি না।"

তেরো বছর আগের কথা বলছি।

আমরা আজও চলনবিল যাইনি। এর ভেতর আরও তিনজন বন্ধু দেশ ছেড়েছে। জুয়েল এখনো হয়তো টিকিটের টাকা জোগাড় করতে পারেনি।

প্রতি বর্ষায় আমি আমাদের পরিকল্পনাকে ঘশেমেজে আবার ঠিক করি। হোটেলগুলোতে ফোন দিয়ে ভাড়া জেনে নেই। চলনবিলের পানি কমে যাচ্ছে দিনে দিনে, সেটা নিয়ে চিন্তিত হই।

আর অপেক্ষায় থাকি তাদের ফিরে আসার। আমি জানি তারা ফিরে আসবে। জুয়েলের চোখের পানি নি‌র্ভেজাল বাঙালির অশ্রু। এ অশ্রু ছল জা‌নে না। ওরা ফিরে আসতে বাধ্য।

দু'দিন আগে আর পরে এই যা। ফিরে ওরা আসবে। চলনবিল আমরা যাচ্ছি। দুইদিন আগে বা পরে............... হয় এই শ্রাবনে নয় অন্য কোন শ্রাবনে...

রবি ঠাকুর বলেছেন, " তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিলে রে, তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি। তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কী দীপ জ্বালিস ঘরে, তখন খেলাধুলা সকল ফেলে, ও মা, তোমার কোলে ছুটে আসি ॥"

রবি ঠাকুর মিথ্যা বলতে পারেন না। বাংলা মায়ের সকল সন্তান এই ধূলাতেই ধন্য। সন্ধ্যাদীপ জ্বললেই তারা মায়ের কথা ভাবে, মায়ের কোলে ফিরে আসতে চায়। দেশ-বিদেশে থাকা সকল বাংলা মায়ের সন্তানকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।

তামান্না সেতুর ফেসবুক থেকে



মন্তব্য