kalerkantho


চার হাজার বই বন্দি

নজরুল ইসলাম, গফরগাঁও (ময়মনসিংহ)   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



চার হাজার বই বন্দি

পাকা সুরম্য ভবন। ঝকঝকে তকতকে মেঝে। আলমারিতে ঠাসা ৪১৩০টি বই। চেয়ার-টেবিলও আছে। নেই পাঠক। ছবিটি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বার গ্রন্থাগারের। ছবি : কালের কণ্ঠ

পাকা সুরম্য ভবন। ঝকঝকে তকতকে মেঝে। পরিচ্ছন্ন আলমারিতে ঠাসা ৪১৩০টি বই। চেয়ার-টেবিল সবই আছে। দেখভালের লোকও আছে। কিন্তু বই বিতরণের নিয়ম না থাকায় তা কেউ পড়তে আসে না। তিন-চার কিলোমিটারের মধ্যে ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও বই পড়ার সুযোগ বঞ্চিত। এই অবস্থা ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার জব্বারনগর (পাঁচুয়া) গ্রামের ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বার গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে এ এইচ এম আসাদ (নয়ন) ভাষাশহীদ জব্বারের জন্মভিটা দান করেন। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. আনোয়ারুল ইকবালের উদ্যোগ দেন। স্থানীয় সরকার বিভাগ অর্থায়ন করে। ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ করে। উদ্বোধনের সময় সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠানটিতে চার হাজার ১৩০টি বই দেওয়া হয়। ১১টি আলমারিতে থরে থরে সাজানো তালাবদ্ধ গ্রন্থগুলো পড়ার সৌভাগ্য কোনো পাঠকের হয়নি। জেলা পরিষদ থেকে প্রতিষ্ঠানটি দেখভাল করার জন্য একজন কেয়ারটেকার ও একজন গ্রন্থাগারিক দিলেও তাঁদের বেতন অত্যন্ত কম। বই বিতরণের নিয়ম না থাকায় কোনো শিক্ষার্থী বা পাঠক প্রতিষ্ঠানটিতে আসে না। কেয়ারটেকার আর গ্রন্থাগারিকের সারা দিন বসে থাকা ছাড়া কোনো কাজ নেই। ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বারের নামের প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে এলাকাবাসী গর্ববোধ করলেও বছরে শুধু ২১ ফেব্রুয়ারি এক দিন জেলা পরিষদ ঘটা করে অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় এবং বাকি দিনগুলোতে কোনো কার্যক্রম না থাকায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, জেলা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় সম্মানী ভাতা দিয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতিমনা গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হলে পাঠক সৃষ্টিসহ স্থানীয়ভাবে শিশু সংগঠন, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠত। এতে প্রতিষ্ঠানটি প্রাণ ফিরে পেত, উদ্দেশ্য সফল হতো।

ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বার স্মৃতি ছাত্রসংঘের সাবেক সভাপতি এবাদুর রহমান বলেন, ‘ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে যেমন বিশ্ব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আমরাও গফরগাঁওয়ে ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বারের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চাই।’

ভাষাশহীদ আব্দুল জব্বারের ছেলে সাবেক সেনা সদস্য বাদল মিয়া বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে আমাদের আবেগ রয়েছে। এটি আমার বাবার জীবনদানের স্মৃতি। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার জন্য। তবে খুবই কষ্ট হয় যখন দেখি বছরে মাত্র এক দিন সবাই ফিরে তাকায়। বছরের বাকি দিনগুলোতে প্রতিষ্ঠানটির দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। আলমারিতে সাজানো বইগুলো পাঠকের হাতে দেওয়া হয় না। পাঠক বই না পড়লে সেই বইয়ের কী মূল্য আছে? এলাকার ছেলে-মেয়েদের পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে। ওরা পড়লেই তো আমার বাবা, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস জানতে পারবে।’

গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মাহবুব উর রহমান বলেন, ‘স্থানীয় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিমনা গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি করে প্রতিষ্ঠানটি সুন্দরভাবে পরিচালনা করা যায় কি না, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব। স্থানীয়ভাবে শিশু সংগঠন, শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলারও উদ্যোগ নেওয়া হবে।’



মন্তব্য