kalerkantho


রফিকের জন্মভিটা অরক্ষিত

মোবারক হোসেন, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ)   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



রফিকের জন্মভিটা অরক্ষিত

এক চালা, চারপাশে শোলার বেড়া। ওপরের দিকে খোলা। নতুন করে লেপা হয়েছে মেঝে। এই জরাজীর্ণ ঘরেই জন্ম নিয়েছিলেন ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ। ছবিটি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রাম থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

এক চালা, চারপাশে শোলার বেড়া। ওপরের দিকে খোলা। নতুন করে লেপা হয়েছে মেঝে। এই জরাজীর্ণ ঘরেই কিনা জন্ম নিয়েছিলেন ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ। অথচ আজ এখানে রাখা হয় জ্বালানি কাঠ। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামে রফিকের জন্মভিটায় গিয়ে এমনটা দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখে এ প্রতিবেদক সম্প্রতি গিয়েছিলেন সেখানে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালে পারিল গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রফিকনগর করা হয়। স্থানীয় সমাজ হিতৈষী লে. কর্নেল (অব.) মজিবুল ইসলাম খান পাশার দান করা ৩৪ শতাংশ জমির ওপর ২০০৮ সালে নির্মাণ করা হয় গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। দীর্ঘদিনেও তা পূর্ণতা পায়নি। সেখানে শহীদ রফিকের দুটি ছবি ও কিছু বই ছাড়া স্মৃতিবিজড়িত কিছুই নেই। এই ভাষাসৈনিকের ব্যবহৃত চেয়ার-টেবিল, পাঞ্জাবি, লুঙ্গি এবং নকশা করা রুমালসহ অনেক জিনিসপত্র থাকলেও এর কিছুই ঠাঁই পায়নি জাদুঘরে। ভবনটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন সৌন্দর্য হারাচ্ছে। চত্বরজুড়ে অনেক ফুলগাছ লাগানো হলেও পরিচর্যার অভাবে এখন সব গাছ মরে গেছে। জাদুঘরের হলরুমে প্রায়ই সালিস বসায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তাদের ভয়ে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না। শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদের বাড়ি ঘেঁষে নির্মিত শহীদ মিনারটিও অরক্ষিত। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় বর্ষা ও ভারি বর্ষণে শহীদ মিনারটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয় লোকজন।

এ ছাড়া শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদের জন্মভিটা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০০০ সালে বেসরকারি সংস্থা প্রশিকা দুটি আধাপাকা ঘর তৈরি করে দেয়। সেখানে বসবাস করে শহীদ রফিকের প্রয়াত ভাই আব্দুল খালেকের সত্তরোর্ধ্ব স্ত্রী গুলেনুর বেগম ও ভাতিজা শাহাজালালের পরিবার। বাড়িটিতে আত্মীয়স্বজন ও দর্শনার্থীদের থাকার উপযোগী কোনো ঘর নেই। নেই স্বাস্থ্যসম্মত একটি শৌচাগার। যে ঘরে রফিকের জন্ম সে ঘরটি এখন জরাজীর্ণ। সে ঘরে এখন জ্বালানি কাঠ রাখা হয়।

গত মঙ্গলবার বাড়ির আঙিনায় দেখা মেলে শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদের ভাবি গুলেনুর বেগমের। তাঁর স্বামী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক মারা গেছেন অনেক আগে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই বিধবা নারী নানা জটিল রোগে আক্রান্ত। লাঠি ভর দিয়ে চলতে হয় তাঁকে। গুলেনুর বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভাষার মাস আসলে আপনারা আসেন। সারা বছর কত কষ্টে আমাদের দিন চলে সে খবর কেউ রাখে না। ছেলে শাহাজালালকে নিয়ে রফিকের স্মৃতি রক্ষার্থে এই বাড়িতে থাকি। ভালো ঘর-দরজা নাই। কেউ আসলে বসতে দিতে পারি না।’

শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদের একমাত্র জীবিত ভাই খোরশেদ আলমসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা জেলা শহর ও ঢাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা স্মৃতি জাদুঘর এবং রফিকের বাড়ি দেখতে আসে।

একমাত্র জীবিত ভাই খোরশেদ আলম জানান, শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদকে কবর দেওয়া হয় ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে। এখনো তাঁর কবরটি চিহ্নিত করা হয়নি। কবরটি চিহ্নিত করে নামফলক লাগানো হলে শ্রদ্ধা নিবেদন করা যেত। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঈদ, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসসহ বিশেষ দিনে রাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সরকারপ্রধানের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সুযোগ পান। কিন্তু ভাষা দিবসে ভাষাসৈনিকদের পরিবারের সদস্যরা এ ধরনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের জন্য এটা বেদনাদায়ক।’

অমর একুশে পরিষদের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার তোবারক হোসেন লুডু বলেন, ‘শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ আমাদের অহংকার। ভাষা আন্দোলনে তাঁর আত্মদানে সিংগাইরের মাটি ও মানুষ ধন্য।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মাজেদ খান বলেন, ‘সারা বছর গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসে। থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা না থাকায় হতাশ হয়ে ফিরে যায় তারা। এতে দিন দিন দর্শনার্থীর সংখ্যা কমছে। জাদুঘরকেন্দ্রিক গণমুখী উদ্যোগ ও শহীদ রফিকের বাড়িটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’

সিংগাইর পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম ভূইয়া জয় বলেন, ‘বাড়ির এই অবস্থা জাতির জন্য লজ্জাকর।’

সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাহেলা রহমতুল্লাহ বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। এরই মধ্যে ওই বাড়িতে গিয়েছিলাম। বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

 



মন্তব্য