kalerkantho


সাড়ে ৩ কোটি টাকা গচ্চা

বদলগাছীতে সাবেক এমপির অনিয়ম

এমদাদুল হক দুলু, বদলগাছী, (নওগাঁ)   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



সাড়ে ৩ কোটি টাকা গচ্চা

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার হাটের নামে ভরাট করা হয়েছে ছোট যমুনা নদী। এসব ব্যক্তিমালিকানার জমিতে ভবন তোলা হচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল’—কথাটি আক্ষরিক ও আলংকারিক উভয় অর্থে মিলে গেছে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার একটি প্রকল্পে। কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও কর্মসৃজন প্রকল্পের সাড়ে তিন কোটি টাকায় ব্যক্তিমালিকানার নিচু জমি হাটের নামে ভরাট করা হয়েছে। ফলে পুরো টাকা গচ্চা গেছে।

এর নেপথ্যে রয়েছেন নওগাঁ-৩ (বদলগাছী-মহাদেবপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) ড. আকরাম হোসেন চৌধুরী।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে কর্মসৃজন কর্মসূচির আওয়তায় বদলগাছী কেন্দ্রীয় বাজার সংস্কারের নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। পরে তৎকালীন এমপি কেন্দ্রীয় বাজার সংস্কার না করে সমবায় মডেল হাটের জায়গা নির্মাণ করেন। কর্মসৃজনের ৪০ দিনের কর্মসূচির ৯৪৯ জন শ্রমিক দিয়ে বদলগাছী ডাকবাংলোর পাশে ছোট যমুনা নদীর পশ্চিম পাশ ভরাট করেন। এ জমিগুলো ব্যক্তিমালিকানার, যা অবৈধভাবে জবরদখল করা হচ্ছিল। ২০১১ সালের ২১ নভেম্বর এ প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়। আট ইউনিয়নের কর্মসৃজন প্রকল্পের সব শ্রমিক টেনে এনে এখানে কাজ করানো হয়। কর্মসৃজন প্রথম এবং দ্বিতীয় দফাসহ ৭২০ টন কাবিখা প্রকল্পের চাল এ প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয়। সরকারি মূল্য অনুসারে মোট তিন কোটি ৬৭ লাখ ১১ হাজার ২২৩ টাকা ব্যয় করে মডেল সমবায় হাটের জায়গা নির্মাণ করা হয়।

এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরপরই জমির মালিকরা তাদের জায়গায় দোকানপাটসহ খণ্ড খণ্ড অংশে বাসাবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছে। অনেকে জমি কিনে নিয়ে এখানে বাড়িঘর নির্মাণ করছে। এ জমির মূল মালিক বদলগাছীর মুনির আলী ও তাঁর উত্তসূরিরা। পরে তারা বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করেছে। এসএ ও আরএস খতিয়ান বর্তমান মালিকদের নামে রেকর্ড রয়েছে।

একাংশের মালিক আমিনুর বলেন, ‘তৎকালীন এমপি জোর করে আমাদের রবিশস্য নষ্ট করে মালিকানা জমি জবরদখল করে নদীর বালু কেটে ভরাট করেছেন। বাধা দিলে আমাদের পুলিশ দিয়ে তাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর আমরা জমি দখল করে বাড়িঘর নির্মাণ করছি।’

আরেক মালিক নারায়ণ মুস্তফী বলেন, ‘মডেল সমবায় হাটের নামে সাবেক এমপি আমাদের দুই বিঘা পৈতৃক সম্পত্তি দখল করে বালু ভরাট করেছেন। আমি বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে দাবি করেছি আমার জমি বের করে দেওয়ার জন্য।’

বদলগাছী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমার কলেজের নামে দুই বিঘা জমি সেখানে রয়েছে। শিগগিরই মাপজোখ করে সীমানা পিলার দিয়ে ঘিরে নেব।’

উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ প্রকল্পে প্রায় ১৩ বিঘা জমি ভরাট করা হয়েছে। অথচ এখানে কোনো খাসজমি নেই। তাহলে কেন প্রকল্প নেওয়া হলো? এ প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূমি কর্মকর্তা বলেন, ‘এ প্রকল্প নিয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই।’

এদিকে জমির মালিক আমিনুল ইসলাম আদালতে মামলা করেছেন। ২০১৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিবাদীপক্ষের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কারণ দর্শানোর জবাব পাঠিয়েছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। তিনি জবাবে উল্লেখ করেছেন, নালিশি সম্পত্তির হাল রেকর্ড ব্যক্তিমালিকানাধীন। সেখানে হাট স্থাপনে কার্যক্রম চলছে। ওই সম্পত্তি বাদীর দখলে নেই।

এ বিষয়ে সাবেক এমপি ও রাজশাহী বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আকরাম হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘নদী ভেঙে গেলে আর ব্যক্তিমালিকানা থাকে না। এ কারণে তৎকালীন ইউএনও একে খাসজমি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একটি ভালো প্রকল্প হাতে নিয়েছিলাম। কিন্তু বর্তমান এমপি সেটি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেননি।’

তবে বদলগাছীর বর্তমান ইউএনও মাসুম আলী বেগ বলেন, ‘জমি নদীতে ভেঙে গেলে গর্ভে যে অংশ থাকে, অর্থাৎ যেখান দিয়ে মূল স্রোত বয়ে যায় সেই অংশটি শিকস্তির আওতায় পড়ে। এতে আর ব্যক্তিমালিকানা থাকে না। কিন্তু বাকি (যেমন বর্ষাকালে বিস্তৃত প্লাবিত) অংশ শিকস্তির আওতায় পড়ে না।’

অন্যদিকে বদলগাছী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের মাঠ থেকে হাট সরিয়ে নিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুরেশ সিংহ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন জানান, বিদ্যালয়ের মাঠে হাট বসে। এ কারণে হাটুরেদের কোলাহলে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের খেলাধুলা।

এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মস্তফা অলি আহাম্মেদ রুমি চৌধুরী বলেন, ‘যেহেতু হাটের জায়গা নির্মাণ করা হয়েছে মালিকানা সম্পত্তি দখল করে, এখানে আমার কিছু বলার নেই।’



মন্তব্য