kalerkantho


গোদাগাড়ীতে অর্ধশত রাঘব বোয়াল অধরা

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



গোদাগাড়ীতে অর্ধশত রাঘব বোয়াল অধরা

দেশব্যাপী চলমান মাদকবিরোধী জোরালো অভিযানের মধ্যেও এখনো অধরা রাজশাহীর গোদাগাড়ীর রাঘব বোয়ালরা। তাঁদের অনেকেই মাদকের ছোঁয়ায় রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। কিন্তু রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন তাঁরা।

রাঘব বোয়ালদের কেউ রাজশাহী শহরে, কেউ ঢাকায়, কেউবা নিজ এলাকাতেই বাড়ি-গাড়ি করে আরাম-আয়েশে দিনাতিপাত করছেন। কারো বিরুদ্ধে মামলা হলে কিছুদিন বাইরে পালিয়ে থেকে আবারও এলাকায় ফিরছেন। মাদকের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে আছে জেনেও অনেকে সাহসের সঙ্গে গোদাগাড়ীর মাদক সিন্ডিকেট শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করছেন। এরই মধ্যে গত সোমবার বিকেলে গোদাগাড়ী থেকে প্রায় সোয়া দুই কেজি হেরোইন উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এ সময় মা-মেয়েসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তবে এর মূল হোতা এখনো অধরা বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মাদকচক্রের হোতারা পরিস্থিতি বুঝে চলাফেরা করেন। ফলে এত অভিযানের পরেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন তাঁরা। তাঁরা সাধারণত দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে মাদকের বড় চালান ধরা পড়লেও তাঁদের নাম সহসা উঠে আসে না। তবে বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোপন নথিতে এসব মাদক কারবারির নাম রয়েছে।

সেই তালিকা সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর হেরোইনের তালিকাভুক্ত পাইকারদের অনেকেই এখন এলাকাছাড়া। তবে দূর থেকেই তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করছেন মাদক কারবার। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন গত নির্বাচনের মধ্যে এলাকায় ফিরে এসেছিলেন। তাঁরা হলেন রুমেন বিশ্বাস, আবুল কালাম আজাদ, আব্দুর রহিম টিপু ও সোহেল রানা প্রমুখ। একজন প্রার্থীর হয়ে কাজ করতে তাঁরা এলাকায় ফিরেছিলেন। তবে নির্বাচনের পর পরই তাঁদের কয়েকজন ফের আত্মগোপনে চলে গেছেন। গত সোমবার রাতে মাদক কারবারি মতিউর রহমান মতি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর বাকিরাও গাঢাকা দিয়েছেন।

গোয়েন্দা সংস্থা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় গোদাগাড়ীর রাঘব বোয়ালদের মধ্যে আরো রয়েছেন নজরুল ইসলাম (বারইপাড়া), মাহাবুব হোসেন (চর কোদালকাটি), হেলাল উদ্দিন (মাদারপুর), রাকিব (দাঙ্গাপাড়া), সাইদুর রহমান (বারইপাড়া), জমির হোসেন (মহিষালবাড়ি), আওলাদ হোসেন, শাহাদৎ হোসেন, মেহেদী হাসান, লতিফুর রহমান, আনারুল ইসলাম (হাজরাপুকুর), শফিক, একরাম হোসেন, শাহীন হোসেন, আমিনুল ইসলাম, মুরতুজা, ভোদল, হযরত আলী, শীষ মোহাম্মদ, হেলালুদ্দিন, রবিউল ইসলাম রবি, সেলিম, নাসির উদ্দীন নয়ন, নাজিবুর রহমান, হায়দার আলী (ডাইংপাড়া), টিপু, আনারুল ইসলাম, তোফাজ্জল, জসিম উদ্দীন, মনি, জিয়া, শরিফুল ইসলাম, জোহরুল ইসলাম (দিয়াড় মানিকচর), ইব্রাহীম হোসেন, সেন্টু প্রমুখ। এলাকার অন্তত অর্ধশত রাঘব বোয়াল মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের অনেকে এরই মধ্যে ভারতে পালিয়ে গেছেন। আবার কেউ সীমান্ত এলাকার দুর্গম দিয়াড় মানিকচর এলাকায় অবস্থান করছেন। আর ভোদল ও শাহীন সম্প্রতি পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন।

একটি সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, এসব রাঘব বোয়ালদের বেশির ভাগই ছিলেন নিম্ন আয়ের মানুষ। কিন্তু মাদকের ছোঁয়ায় এখন তাঁরা কোটিপতি। বাড়ি-গাড়িসহ অগাধ সম্পদের মালিক। ১০-১১ বছর আগেও তাঁদের কেউ ছিল ডিম বিক্রেতা, দিনমজুর কিংবা বাসের সুপারভাইজার।

তাঁদের মধ্যে ডিম বিক্রেতা থেকে কোটিপতি বনে গেছেন উপজেলার মহিষালবাড়ীর শহিদুল ইসলাম ওরফে ভোদল। গোদাগাড়ীর আরেক মাদক কারবারি মাটিকাটা এলাকার সোহেল রানা বাসের সুপারভাইজার ছিলেন। সিঅ্যান্ডবি গড়ের মাঠ এলাকার মালা বক্সের ছেলে হযরত আলী দিনমজুর থেকে আজ কোটিপতি। শীষ মোহাম্মদ নামের আরেক মাদক কারবারি একসময় যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এখন সরকারি দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ওঠেন-বসেন। রাজশাহী শহরে তাঁর দামি বাড়ি-গাড়ি রয়েছে। মহিষালবাড়ির হেলালুদ্দিন চকোলেট কারখানার শ্রমিক থেকে এখন অগাধ সম্পত্তির মালিক। এভাবে মাদকের টাকায় গোদাগাড়ীর অন্তত শতাধিক ব্যক্তি কোটিপতি বনে গেছেন।

মাদক কারবারিদের তালিকার বিষয়টি নিশ্চিত করে গোদাগাড়ী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘মাদকের সঙ্গে সরাসরি যুক্তদের পাশাপাশি অন্তরালে থেকে কারবারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও অভিযান চলছে। তবে তাঁদের অনেকেই এরই মধ্যে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। তাঁদেরও তথ্য পাওয়া মাত্র আটকের চেষ্টা চলছে।’

 



মন্তব্য