kalerkantho


বই আছে, পাঠক নেই

ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



বই আছে, পাঠক নেই

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঠাগারে পাঠক সংকট দেখা দিয়েছে। বই নিতে কেউ না আসায় অলস সময় কাটাচ্ছেন কর্মকর্তা। ছবি : কালের কণ্ঠ

পাঠক সংকটে ভুগছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সাধারণ পাঠাগার। বছরপাঁচেক আগেও পাঠকের উপস্থিতিতে জমজমাট থাকত পাঠাগার চত্বর। কিন্তু এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে বই নিতে দুই-তিন দিনেও কেউ পাঠাগারে আসে না। বর্তমান বাস্তবতায় পাঠাগারটির প্রায় ২৫ হাজার বই নষ্ট হতে বসেছে। এদিকে সদস্য সংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির আয়ও কমে গেছে। তাতে সংবাদপত্রের বিলসহ কর্মচারীদের এক বছরের বেতন-ভাতা বকেয়া পড়েছে।

১৯৫৮ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রথম পাঠাগার হিসেবে জেলা শহরের প্রেস ক্লাব রোডে স্থাপিত হয় এই সাধারণ পাঠাগার। ১০ কাঠা পরিমাণ নিজস্ব জায়গায় রয়েছে পাঠাগারটির দ্বিতল ভবন। প্রতিষ্ঠান পর থেকেই জ্ঞান বিকাশে অনবদ্য ভূমিকা রেখে আসছে পাঠাগারটি। প্রথমে সীমিতসংখ্যক কিছু বই নিয়ে এর যাত্রা শুরু হলেও দিনে দিনে বইয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ৬০ বছরের পুরনো এই পাঠাগারে বর্তমানে ২৫ হাজারের বেশি বই রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অনেক মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য বইও। এ ছাড়া জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্র মিলিয়ে ১৫টির মতো দৈনিক পত্রিকা রাখা হয়।

বছরপাঁচেক আগেও প্রতিদিন গড়ে ১০-১৫ জন করে পাঠক এখান থেকে বই নিয়ে যেত। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ মানুষ আসত পত্রিকা পড়তে। কিন্তু দিন দিন সেই সংখ্যা কমতে কমতে পাঠক এখন প্রায় শূন্যের কোটায়। এমনকি টানা দুই-তিন দিনেও বই নিতে কোনো পাঠক পাঠাগারে আসছে না। সদস্য সংখ্যা কমে যাওয়ায় পাঠাগারের আয়েও ভাটা পড়েছে। গত এক বছরের বেতন-ভাতা বকেয়া পড়েছে এখানে কর্মরত চারজন কর্মচারীর। পাশাপাশি বকেয়া পড়েছে এক বছরের সংবাদপত্রের বিল।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সাধারণ পাঠাগারের গ্রন্থাগারিক সোলাইমান করিম আক্ষেপ করে বলেন, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই পাঠাগারে কাজ করছেন তিনি। কিন্তু এমন পাঠক সংকট আগে আর দেখেননি। তিনি বলেন, বাড়িতে বই নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠাগারের সদস্য হতে হয়। পাঁচ বছর আগেও সাধারণ সদস্য ছিল চার শর বেশি। অথচ বর্তমানে সেই সংখ্যা ৯৩ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই মাসের পর মাসও পাঠাগারে আসে না। তবে বিকেলে কিছু লোক পত্রিকা পড়তে আসে।

পাঠাগারের সহগ্রন্থাগারিক সত্যেন সাহা জানান, রবিবার ছাড়া সপ্তাহের অন্য ছয় দিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। তিনি বলেন, একসময় পাঠক উপস্থিতিতে সরগরম থাকত পাঠাগার। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী নিয়মিত এখানে আসত। কিন্তু এখন পাঠক না আসায় কর্মচারীদের কোনো কাজ নেই। তাঁদের এখন অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আগ্রাসনে তরুণ-তরুণীরা এখন আর বই পড়তে চায় না। তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণেই পাঠাগারে পাঠক কমেছে বলে মনে করেন তিনি।

পাঠাগারের আজীবন সদস্য নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ড. অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম তরু বলেন, এই পাঠাগারের অতীত খুব উজ্জ্বল। একসময় পাঠাগারে সংস্কৃতিসেবী ও সাহিত্যিকদের আড্ডা হতো। নেতৃত্ব দিতেন যোগ্য লোকজন। কিন্তু কালের বিবর্তনে সব কিছু হারিয়ে গেছে।

পাঠাগারের পাঠক কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে অভিভাবকরাই ছেলে-মেয়েদের পাঠাগারে নিয়ে আসতেন বই পড়ার জন্য। কিন্তু এখন লেখাপড়ার ক্ষতি হওয়ার অজুহাতে ছেলে-মেয়েদের বই পড়তে অনুৎসাহী করছেন অভিভাবকরা। তাঁদের এ ধারণা পুরোপুরি ভুল। পাঠাগার বিমুখ হওয়ায় পাঠ্যসূচির বাইরে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ছে না। এ অবস্থার উত্তরণে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সাধারণ পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান বলেন, বর্তমানে পাঠাগারে কিছু লোক আসে পত্রিকা পড়তে। বই পড়ার পাঠক নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, আয় কমে যাওয়ায় পাঠাগারে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে আয় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

 



মন্তব্য