kalerkantho


৪৭ বছরের ক্ষত

নির্মলেন্দু চক্রবর্তী, ফরিদপুর   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



৪৭ বছরের ক্ষত

‘সে এক দুঃসহ দিন। ১৯৭১ সালের ১১ মে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরই জানতে পারলাম ভোরে কুসুমদী বাজারে আগুন দিয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। প্রাণভয়ে সবাই গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে। পরিবারের সঙ্গে আমিও পালিয়ে জীবন বাঁচাতে চেষ্টা করছিলাম। সকাল ৮টার দিকে হানাদার বাহিনীর গ্রামে আসার কথা শুনে একটি বড় গর্তে লুকিয়ে ছিলাম। কিন্তু কয়েকজনের সঙ্গে হানাদারদের হাতে ধরা পড়ি। আমাদের এক সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি চালায় হানাদার বাহিনীর এক সদস্য। এতে আমার ভাই পঞ্চানন বাগচীসহ ছয়জন নিহত হয়। আমার বাঁ হাঁটুতে তিনটি গুলিবিদ্ধ হয়। আমি জ্ঞান হারাই।’

কথাগুলো বললেন সেদিন প্রাণে বেঁচে যাওয়া আলফাডাঙ্গা উপজেলার কুসুমদী গ্রামের প্রবীণ কাঠমিস্ত্রি উপেন্দ্রনাথ বাগচী ওরফে উকিল বাগচী। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ১৯-২০ বছরের তরুণ কাঠমিস্ত্রি। পরিবারের সবার বড় বলে মা-বাবাকে রেখে যুদ্ধে যেতে পারেননি তিনি।

কুসুমদী গ্রামে ৪৭ বছর আগে হানাদার বাহিনীর তাণ্ডবের কথা বলতে গিয়ে আজও শিউরে ওঠেন উকিল বাগচী। তিনি বলেন, ‘সেদিন গুলিতে আহত হওয়ার পর দুপুরের দিকে আমার জ্ঞান ফিরে আসে। স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের সহায়তায় ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব হয়। পরে অন্যদের সঙ্গে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের পশ্চিম বাংলার বনগাঁ হাসপাতালে চিকিৎসা নিই। তবে আজও স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারি না। গুলিবিদ্ধ স্থানে এখনো ব্যথা করে।’

উকিল বাগচী বলেন, ‘স্বাধীনতার পর আর কেউ খোঁজ নেয়নি। ছয়জনের সংসার চালাতে আজও কাঠমিস্ত্রির কাজ করতে হয়। তবে মাত্র ছয় মাস আগে স্থানীয় পৌর কাউন্সিলের সহযোগিতায় প্রতিবন্ধী কার্ড পেয়েছি। ওই কার্ড দেখিয়ে একবার তিন হাজার (প্রতি মাসে ৫০০) টাকা ভাতা পেয়েছি। সরকার যদি যুদ্ধাহত বলে কোনো স্বীকৃতি দেয় বা চিকিৎসার খরচ দেয়, তাহলে ভালো হয়। সহযোগিতা পেলে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারতাম। ৬৬ বছর বয়সে আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই।’

আলফাডাঙ্গা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. মিজানুর রহমান জানান, ১৯৭১ সালের ১১ মে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী ও ভাটিয়াপাড়া যাওয়ার পথে বাজারের দোকানপাটে আগুন দিয়ে কুসুমদী গ্রামে হানা দেয়। অন্যরা পালিয়ে যেতে সমর্থ হলেও গ্রামের ছয়জন হানাদারদের গুলিতে নিহত এবং তিনজন আহত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় উকিল বাগচী আহত হলেও সরকারি কোনো স্বীকৃতি পাননি। শুধু প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন।



মন্তব্য