kalerkantho


অরক্ষিত নিশ্চিহ্নের পথে তালিকায় নেই

একাত্তরের বধ্যভূমি গণকবর

প্রিয় দেশ ডেস্ক   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের বহু স্থানে গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা। হানাদাররা সেসব মুক্তিকামী মানুষের অনেককে কবর দিতে বা সৎকারও করতে দেয়নি। লাশগুলো ফেলে দিয়েছে বধ্যভূমিতে। আবার অনেককে গণকবর দেওয়া হয়েছে। এই শহীদদের বধ্যভূমি ও গণকবরের অনেকটিই আজ অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। কোনো কোনোটা নিশ্চিহ্নের পথে।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল, বুধবার। ভোরে মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি। এমন সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যুদ্ধাস্ত্রবোঝাই একটি গানবোট নিয়ে নদীপথে গোয়ালন্দের কামারডাঙ্গি এলাকায় আসে। জনতার সহায়তায় ইপিআর, আনসার ও মুক্তিবাহিনী হালকা অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু হানাদারের ভারী অস্ত্রের মুখে কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রতিরোধ ভেঙে যায়। হানাদারের গুলিতে প্রথম শহীদ হন আনসার কমান্ডার মহিউদ্দিন ফকির। হানাদাররা দ্রুত গিয়ে বালিয়াডাঙ্গা গ্রাম ঘিরে ফেলে। গুলি ছুড়ে নারী, শিশু, কবি তোফাজ্জল হোসেনসহ স্বাধীনতাকামী ২৪ জনকে হত্যা করে। ঘরবাড়িতে আগুন দেয়। শহীদের লাশগুলো বালিয়াডাঙ্গার খালে ফেলে দেয়। দুপুরে তারা গোয়ালন্দ নদীবন্দরের স্টিমারঘাট, ফেরিঘাট ও বাজার আক্রমণ করে। রাজাকারদের সহায়তায় কয়েক শ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালিয়ে আগুন দেয়।

বালিয়াডাঙ্গার বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের অভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। বালিয়াডাঙ্গার শহীদ পরিবারের সন্তান, স্থানীয় উজান চর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গোলজার হোসেন মৃধা বলেন, ‘২০০৯ সালে সাংবাদিক প্রবীর শিকদারের দিকনির্দেশনায় এলাকাবাসীর সহায়তায় বালিয়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে ওই ২৪ শহীদের একটি নামফলক নির্মাণ করে উত্তরাধিকার ’৭১ নামের সংগঠন। তখন থেকে প্রতিবছর ২১ এপ্রিল নানা কর্মসূচিতে আমরা গোয়ালন্দ গণহত্যা দিবস পালন করে আসছি।’ নামফলকটি উন্মোচন করেছিলেন সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী।

গোয়ালন্দ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আব্দুস সামাদ মোল্লা বলেন, ‘ঢাকা বিভাগের গণকবর ও বধ্যভূমির তালিকায় বালিয়াডাঙ্গার নাম নেই। বধ্যভূমিটি দ্রুত শনাক্ত করে সংরক্ষণ করা না হলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’ গোয়ালন্দ ইউএনও রুবায়েত হায়াত শিপলু ৪ ডিসেম্বর নামফলকটি পরিদর্শন শেষে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখতে বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের বধ্যভূমিসহ নামফলকটি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) : নবীনগর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের উত্তর-পশ্চিম কোণে মুক্তিযুদ্ধে শত শহীদের গণকবরটি দেড় যুগ আগে চিহ্নিত হয়। তবে সেটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি আজও। মুক্তিযোদ্ধারা জানান, পাকিস্তানি হানাদাররা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় মাঠটির পশ্চিম পাশে প্রায় প্রতিদিনই লোকজনকে ধরে এনে হত্যা করত। ২০০০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সংসদ সদস্য বেগম দিলারা হারুন গণকবরটির জন্য ‘স্মৃতি অনির্বাণ’ নামে স্তম্ভ নির্মাণের লক্ষ্যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। শুক্রবার গিয়ে দেখা যায়, অযত্নে পড়ে থাকা গণকবরটির পূর্ব দিকে গা-ঘেঁষে পাশের বাড়ির শৌচাগারের ট্যাংক তৈরি করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালিব বলেন, ‘বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে, এটি মুক্তিযুদ্ধে শতাধিক শহীদের গণকবর।’ মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার সাবেক সংসদ সদস্য শাহ জিকরুল আহমেদ খোকন বলেন, ‘আমার জানা মতে, উপজেলায় কমপক্ষে ছয়টি গণকবর রয়েছে—নবীনগর সদরে হাই স্কুলের মাঠে, নবীনগর থানার অভ্যন্তরে, বাঘাউড়া গ্রামে, শ্রীরামপুর দত্তবাড়ী শিবিরের কাছে, খারঘরে ও ইব্রাহিমপুরের বিলে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড নবীনগরের সভাপতি আব্বাস উদ্দিন হেলাল বলেন, ‘গণকবরগুলো সংরক্ষণে সরকারের প্রতি আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।’ ইউএনও মোহাম্মদ মাসুম বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে শহীদদের গণকবর দ্রুত সংস্কারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’

পরশুরাম (ফেনী) : উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের মালিপাথর (গ্রাম) বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হলেও সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখনো চিহ্নিত করা হয়নি সলিয়া বধ্যভূমি। ফেনী অঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি ছিল বিলোনিয়া। এখানে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন ইপিআর সদস্য রৌশন আজিজ, মোয়াজ্জেম হোসেন, আজিজুল হক ও গোলাম মোস্তফা। বিলোনিয়ায় প্রাচীন স্থাপনাগুলোতে এখনো রয়েছে গুলির চিহ্ন। ৬ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় বিলোনিয়া ও ফেনী। এ সময় গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। হানাদাররা শহীদদের লাশ ফেলে দিয়েছিল সলিয়া দিঘিতে। দীঘির পাশে নির্মাণ করা হয়েছে বিলোনিয়া যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। কিন্তু অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। পরশুরাম উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হুমায়ন শাহরিয়ার জানান, সলিয়ায় হত্যাকাণ্ডের স্থানটি আজও চিহ্নিত করা হয়নি। ইউএনও মোহাম্মদ রাসেলুল কাদের বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণবিষয়ক প্রকল্প আছে। এসব বধ্যভূমি সংরক্ষণে আমরা চিঠি পাঠাব।’

নন্দীগ্রাম (বগুড়া) : স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও অবহেলায় পড়ে আছে নন্দীগ্রাম উপজেলার বামন গ্রাম ও হাটকড়ই গ্রামের বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল রাতে পাকিস্তানি বাহিনী এখানে গণহত্যা চালায়। এলাকার লোকজন বাঁশের বেড়া দিয়ে স্থানটি ঘিরে রাখলেও অনেক সময় সেখানে বাধা হয় গরু-ছাগল। চারদিকে গড়ে উঠেছে জঙ্গল। সরকারিভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া না হলে মুছে যাবে বধ্যভূমির স্মৃতি।

উপজেলা সংসদের মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কমান্ডার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করতে হলে বধ্যভূমির স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখা জরুরি। দুটি বধ্যভূমি সংরক্ষণে ইউএনওর কাছে আবেদন করা হয়েছিল।’ ইউএনও শারমিন আখতার বলেন, ‘জেলা পরিষদ দুই লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে এবং উপজেলা পরিষদের একটি প্রকল্প দিয়ে বধ্যভূমি সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জকিগঞ্জ (সিলেট) : ১৯৭১ সালের এপ্রিলে জকিগঞ্জ উপজেলার লোহার মহল গ্রাম থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী ১২ জন মানুষকে ধরে এনে পৌর এলাকার ছয়লেন মসকন্দর খালের পারে করুণা বিশ্বাসের বাড়িতে জীবন্ত কবর দিয়েছিল হানাদার বাহিনী। এই গণহত্যা চালায় স্থানীয় জল্লাদ রাজাকার মস্তু ও পাকিস্তানি বানারস খান। লোহার মহলের বীর শহীদরা হলেন আব্দুল জলিল, হায়াত আলী, ইলিয়াস আলী, নীলাম্বর আলী, চেরাগ আলী, আছার উদ্দিন (আছাই), নুর উদ্দিন, ছানুহর আলী, আব্দুর রহমান, আকদ্দস আলী। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও পৌর মেয়র মো. খলিল উদ্দিন জানান, এখনো গণহত্যা চালানো জায়গাটি ঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। অযত্নে পড়ে আছে। তৎকালীন এমপি আব্দুল লতিফ, তমিজ উদ্দিনসহ আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের পরপরই শহীদদের দেহাবশেষ সরকারিভাবে উঠিয়ে সিলেট হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে লাশ চিহ্নিত করে কুশিয়ারা নদীর তীরে লোহার মহলে মতিউর রহমানের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) : উপজেলার বধ্যভূমিগুলো স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অবশ্য শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি রক্ষার্থে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতায় কুলাউড়া ডাকবাংলো মাঠে নির্মাণ করা হয়েছে স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ। একাত্তরে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি কুলাউড়ার ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও ছাত্র, যুবক, কৃষকসহ প্রায় ৪৫০ জনকে হত্যা করে। চাতলগাঁও, রেল এলাকা, জয়চণ্ডীর কামারকান্দি, উত্তর জয়পাশা এলাকা, পদ্মদীঘির পার, হাসপাতালের পুকুরপার, শরীফপুর ইউনিয়নের নমুজা ও মনু স্টেশনে নদীর তীরবর্তী স্থানে শহীদদের গণকবর দেওয়া হয়। এসব স্থান আজও সংরক্ষণ করা হয়নি।

মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল গফুর বলেন, রবির বাজারের বধ্যভূমি সংরক্ষণে আন্দোলন করেও কাজ হয়নি। জায়গাটি রয়েছে অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। শহীদদের কবরের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন কুলাউড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুশীল চন্দ্র দে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আ স ম কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বধ্যভূমিগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিফলক তৈরির জন্য প্রকল্প নিয়েছি।’

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন কালের কণ্ঠর গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী), নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), পরশুরাম (ফেনী), নন্দীগ্রাম (বগুড়া), জকিগঞ্জ (সিলেট) ও কুলাউড়া প্রতিনিধি]


 



মন্তব্য