kalerkantho


চাঁদা তুলে বাজিতপুরে লাশ দাফন

কুড়িয়ে পাওয়া পটকা মাছ খেয়ে দাদি-নাতনির মৃত্যু

চার শিশুসহ সাতজন হাসপাতালে

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



কুড়িয়ে আনা পটকা মাছ খেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ফজিলা আক্তার খাতুন নামের এক বৃদ্ধা ও মরিয়ম নামে চার বছরের এক শিশুর মৃত্যু ঘটে। তারা সম্পর্কে দাদি-নাতনি। একই মাছ খেয়ে হতদরিদ্র ওই পরিবারের ছয় সদস্যসহ আরো সাতজন অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে চারটি শিশু। শিশুদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।

হূদয়বিদারক এ ঘটনার শিকার পরিবারটির সদস্যরা কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের বলিয়ারদী গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে ওরা চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বারইয়ারহাট পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডভুক্ত সোনাপাহাড় এলাকার হাজি খান সাহেবের বাড়িতে কয়েক বছর ধরে বসবাস করে। গৃহকর্তা শহীদুল্লাহ বারইয়ারহাট পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীর (সুইপার) কাজ ও দিনমজুরি করে সংসার চালান। ঘটনাটি ঘটেছে সেখানেই।

গতকাল শুক্রবার ভোরে দাদি-নাতনির মৃতদেহ দাফনের জন্য বাজিতপুরে নিয়ে আসা হয়। পরে গ্রামবাসী চাঁদা তুলে দুজনের লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে। চাঁদার টাকায় মৃতদেহ বহন ও হাসপাতালের খরচের জোগান দেওয়া হচ্ছে বলেও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শহীদুল্লাহ (৩৫) এ প্রতিবেদককে জানান, বৃহস্পতিবার ভোরে তিনি কাজে চলে যাওয়ার পর তাঁর মা ফজিলা আক্তার (৭০) বারইয়ারহাট মাছবাজার থেকে কুড়িয়ে দুটি সামুদ্রিক পটকা মাছ বাসায় নিয়ে যান। তাঁর স্ত্রী বিলকিস বেগম দুপুরবেলা খাবারের জন্য মাছ দুটি ভাজি করেন। পরে মা, স্ত্রী, পাঁচ ছেলে-মেয়ে এবং এক শ্যালকসহ সবাই মিলে পটকা মাছ ভাজা খান।

শহীদুল্লাহ জানান, কিছুক্ষণের মধ্যে তিনিসহ একে একে পরিবারের সবাই অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে। অন্য অসুস্থরা হচ্ছে তাঁর মা ফজিলা আক্তার, স্ত্রী বিলকিস বেগম, দুই ছেলে রাব্বি ও সাব্বির, তিন মেয়ে আছিয়া, ঝরনা ও মরিয়ম এবং শ্যালক হামজা। পরে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে অসুস্থ ৯ জনকেই পাশের মস্তানগর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর চার বছরের শিশুকন্যা মরিয়ম মারা যায়। একপর্যায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাকি সবাইকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর বৃদ্ধা মা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু আইসিইউ ওয়ার্ডের চিকিৎসক ডা. তাসমিরা ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, অসুস্থ চার শিশুকেই আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাকি তিনজন বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে। শিশুদের মধ্যে সাব্বিরের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়।

গতকাল দুপুরে সরেজমিন বাজিতপুরের শাহপুর গ্রামে গিয়ে জানা যায়, শহীদুল্লাহর বাড়ি ছিল ঘোড়াউত্রা নদীপারের বাঞ্ছারামপুর গ্রামে। প্রায় তিন যুগ আগে নদীভাঙনের শিকার হয়ে পরিবারটির আশ্রয় হয় শাহপুর গুচ্ছগ্রামে। শহীদুল্লাহ এলাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সংসারের বোঝা বইতে না পেরে তিনি কয়েক বছর আগে পরিবারসহ চট্টগ্রামে চলে যান।

গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায় মানুষের ঢল। মাকে হারিয়ে শহীদুল্লাহর একমাত্র ভাই নজরুল মিয়া ও তিন বোন নাদিরা, তৌহিদা ও তাহমিনা কেঁদেকেটে অজ্ঞানপ্রায়। গ্রামের নারী-পুরুষ ও শিশুরা এসে শহীদুল্লাহর ‘ভিটা’য় ভিড় জমিয়েছে। তাহমিনা বলেন, ‘এক মাস আগে মাইয়া (মা) ফুতের (ছেলের) দারও (কাছে) গেছিন। লাশ অইয়া আইল।’ নাদিরা মাথা চাপড়াতে থাকেন।

বলিয়ারদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাফিউদ্দিন জানান, পরিবারটি খুবই গরিব। লাশ দাফনের খরচ জোগানোরও সাধ্য নেই। পরে তিনিসহ গ্রামবাসী গতকাল সকাল থেকে চাঁদা তুলে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করেছে। চাঁদা তুলে অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসা খরচের জন্যও চাঁদার টাকা চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে।



মন্তব্য