kalerkantho


হাজীগঞ্জের ডাকাতিয়া নদী

বিষ-ঘের দিয়ে ধরা হচ্ছে মাছ, হুমকিতে প্রজনন

কামরুজ্জামান টুটুল, হাজীগঞ্জ (চাঁদপুর)    

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



বিষ-ঘের দিয়ে ধরা হচ্ছে মাছ, হুমকিতে প্রজনন

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ডাকাতিয়া নদীতে বিষ (ট্যাবলেট), ভেসাল জাল, ঘের (জাগ) ও ফরত (কঞ্চির বেড়াবিশেষ) দিয়ে অবৈধভাবে মাছ ধরা হচ্ছে। বিষ প্রয়োগের কারণে মাছের অবাধ বিচরণ বন্ধ রয়েছে আর হুমকির মুখে পড়েছে মাছের প্রজননব্যবস্থা। আবার এসব ঘের আর ভেসাল জালের কারণে নৌযান চলাচলে তৈরি হয়েছে প্রতিবন্ধকতা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাঁদপুরের মেঘনা মোহনা থেকে শুরু করে হাজীগঞ্জ উপজেলা হয়ে শাহরাস্তি পর্যন্ত ডাকাতিয়া নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ কিলোমিটার। নাব্য ফিরিয়ে আনাসহ ডাকাতিয়াকে বাঁচাতে গত বছরের নভেম্বর থেকে নদী খননকাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ)। অথচ এক শ্রেণির অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ী ও জেলের কারণে নদীতে সব প্রজাতির দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে।

হাজীগঞ্জের বড়কুল, এন্নাতলী, ধেররা, রামচন্দ্রপুর, প্রতাপপুর এলাকার নদী দুই পাশে ভেসাল জাল, কঞ্চির আড়াআড়ি বাঁধ ও ঘের দিয়ে মাছ আটকে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘেরে মাছ ভেড়াতে সেখানে ঘেরের মালিকরা খাবার দিয়ে থাকে। যে মহল একবার ঘের দিয়ে নদীর যে অংশ দখলে নেয় বছরের পর বছর সেটি তাদের দখলেই থেকে যায়।

হাজীগঞ্জ পৌর এলাকা ধেররার কয়েকজন জেলে (যারা দৈনিক মজুরি হারে অন্যের ঘেরে মাছ ধরে) নাম না প্রকাশের শর্তে কালের কণ্ঠকে জানায়, মাছ ধরার জন্য কঞ্চি ও বড় জাল দিয়ে ঘিরে ঘের তৈরি করা হয়। ঘেরের মধ্যে ফেলা হয় গাছের বড় বড় ডাল। এরপর বিভিন্ন পন্থায় ঘেরের ভেতরের মাছগুলো তুলে আনা হয়। ঘেরের সব মাছ একবারে তুলে আনতে মাছের জন্য তৈরি বিশেষ ধরনের বিষাক্ত ট্যাবলেট ছেড়ে দেওয়া হয় ঘেরে। এর কিছুক্ষণ পর মাছগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে পুরো ঘেরে থাকা মাছগুলো ছেঁকে তুলে আনা হয়। এ প্রক্রিয়াটি বেশি করা হয় রাতে।

ডাকাতিয়া নদীতে মাছের ঘের আর ভেসাল জালের বিষয়টি নিশ্চিত করে ধেররা এলাকার মাছ ব্যবসায়ী রাধাকান্ত দাস রাজু বলেন, ‘যারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে তারা নিতান্ত গরিব। ঘেরের মধ্যে বিষ দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।’

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন-১৯৫০-এ বলা হয়েছে, মাছ ধরার জন্য নদী বা জলাশায়ে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে মাঝখানে বেড়া, বাঁধ, টিবি ও অন্য কোনো কাঠামো নির্মাণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পানিতে বিষ প্রয়োগ, কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ নিক্ষেপ করে মাছের চারণক্ষেত্র দূষিত করে বা অন্য কোনোভাবে মাছ ধ্বংস করা বা সেই উদ্দেশ্যে উদ্যোগ নেওয়া যাবে না। আইন অমান্যকারীদের সর্বোচ্চ দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড (তবে এক বছরের নিচে নয়), অথবা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।

ডাকাতিয়া নদীতে বিপুলসংখ্যক ঘের আর ঘেরে বিষ প্রয়োগের বিষয়টি জানার কথা স্বীকার করে হাজীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহমুদ মোস্তফা বলেন, ‘রাতের বেলা ঘেরে মাছ ধরার সময় বিষটা (ট্যাবলেট) প্রয়োগ করা হয়। এতে শক্তিশালী মাছ পর্যন্ত দুর্বল হলে পড়ে। বিষ প্রয়োগের সময় নদীর পানির স্রোত (জোয়ার-ভাটার কারণে) যেদিকে যায় ওই বিষের পানি সেদিকেই নামতে থাকে। বিষ মিশ্রিত এ পানি যে পর্যন্ত যায় ওই পর্যন্ত মাছ কিংবা মাছের রেণু ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।’ তিনি আরো বলেন, মাছ ধরতে এ ধরনের ট্যাবলেট বা তরল পদার্থের (হিলডন) ব্যবহার মৎস্য আইনে নিষিদ্ধ রয়েছে। এটি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এ বিষ প্রয়োগ করে ধরা মাছ না খেতে লোকজনকে পরামর্শ দিয়ে থাকে মৎস্য অধিদপ্তর।

এক প্রশ্নের উত্তরে মাহমুদ মোস্তফা বলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা নদীপার এলাকার চেয়ারমানদের ও পৌর মেয়রকে চিঠি দিয়েছি (বিষ প্রয়োগ বন্ধ ও ঘের-জাল উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়ে)। এ ছাড়া নদীপার এলাকায় এ বিষয়ে মাইকিং করা হয়েছে। এতে কাজ না হলে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করব।’

বিআইডাব্লিউটিএ চাঁদপুর নৌবন্দর উপপরিচালক আব্দুর রাজ্জাক জানান, মাছ ধরার জন্য ডাকাতিয়ার যেসব এলাকায় ঘের দেওয়া রয়েছে সেসব এলাকা দিয়ে নৌযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে নিতে জেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। 



মন্তব্য