kalerkantho


দরপত্রে দেড় কোটি টাকার ঘাপলা

রাজশাহী গণপূর্তর ১৫ কোটি টাকার প্রকল্প

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



রাজশাহী গণপূর্ত অধিপ্তরের একটি দরপত্রে ফের বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রে ঘোষিত ব্যয়ের চেয়ে ১০ শতাংশ নিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে উচ্চ দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের লোকসান হবে অন্তত দেড় কোটি টাকা।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অধিদপ্তর একচেটিয়াভাবে বাণিজ্য করে একটি প্রতিষ্ঠানকেই একের পর এক কাজ দেওয়া হচ্ছে। এতে বারবার দরপত্র জমা দিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন ঠিকাদাররা। আবার সরকারকেও গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। সেই টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হচ্ছে। পাশাপাশি কাজের মানও হচ্ছে নিম্নমুখী।

রাজশাহী গণপূর্ত অধিপ্তর ডিভিশন-২ সূত্র মতে, এই দপ্তরের আওতায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য গত ৪ জুলাই দরপত্র ডাকা হয়। ১৫ কোটি টাকার ওই কাজে শিডিউল কেনেন অন্তত ১০ ঠিকাদার। এই দরপত্র ডাকার পরে সংশোধনী দিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকা মূল্যের একটি জেনারেটর ও প্রায় ৬০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ট্রান্সফর্মার সরবরাহ কাজে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। ফলে শিডিউল সংগ্রহ করেও অনেকে অংশ নিতে পারেননি।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, পাবনার সাজিন এন্টারপ্রাইজকে কাজটি দিতে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত দুটি দরপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশন ১০ শতাংশ কম দর দেয়। আর সাজিন এন্টারপ্রাইজ দর দেয় সরকারি নির্ধারিত মূল্যের সমান।

নিয়ম মতে, যিনি কম দর দেবেন তাঁকেই সাধারণত কাজটি দেওয়া হয়। যাতে সরকারি অর্থ সাশ্রয় হয়। কিন্তু সাজিনকে কাজ দিতে টালবাহানা করেন প্রকৌশলীরা। ফলে নির্ধারিতের চেয়ে কম দর দিয়ে কাজ পায়নি ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশন। এতে সরকারকে অন্তত দেড় কোটি বেশি খরচ করতে হবে।

ঠিকাদারদের দাবি, ছয় মাসে সাজিন এন্টারপ্রাইজকে প্রায় ৬৫ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে অলিখিতভাবে চুক্তি রয়েছে গণপূর্ত দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীর। ফলে তাঁকেই বিপুল অঙ্কের বাণ্যিজের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হচ্ছে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে।

একজন ঠিকাদার জানান, বড় বড় কাজে মনগড়া অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। ফলে অন্য ঠিকাদাররা এতে অংশ নিতে পারেন না। এই সুযোগে কখনো অতিরিক্ত দরে আবার কখনো সমদরে কাজ দেওয়া হচ্ছে সাজিনকে। এ নিয়ে একজন ঠিকাদার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও অভিযোগ করেছেন। আরেকজন ঠিকাদার গণপূর্ত অধিপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেছেন। এসব অনিয়ম নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিকবার অভিযোগ করেছেন ঠিকাদাররা।

আরেকটি সূত্র জানায়, সাজিন এন্টারপ্রাইজকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ থেকে কালোতালিকাভুক্ত করা হয় সম্প্রতি। পিপিআর অনুযায়ী, দরপত্র সক্ষমতা লঙ্ঘন করেই অতিরিক্ত কাজ দেওয়া হচ্ছে একই প্রতিষ্ঠানকে। এর মধ্যে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার ভবন নির্মাণ, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ভবন সম্প্রসারণ, মোহানপুরে টিটিসি ভবন নির্মাণকাজও রয়েছে। এই কাজগুলোর একটিও শুরু করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি কাজগুলো এরই মধ্যে বিক্রি করে বা সরকারি আগাম অর্থ উত্তোলন করার চেষ্টা করছে। যদিও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শুরু করতে না পারায় এরই মধ্যে কার্যাদেশ বাতিলের পর্যায়ে গেছে।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে রাজশাহী গণপূর্ত অধিপ্তর ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফেরদৌস শাহ নেওয়াজ কান্তা বলেন, ‘দরপত্র সংশোধনী পরে দেওয়া হয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শক্রমে। যেহেতু বড় কাজ তাই, সব কিছু বিবেচনা করেই সংশোধনী দেওয়া হয়।’ একজন ঠিকাদারকে কাজ দিতে মনগড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সেটি ঠিক নয়। নিয়মের মধ্যে থেকে যা হবে, সেটিই করা হয়েছে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে যিনি কাজ পাওয়ার যোগ্য তাঁকেই দেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।’

অন্যদিকে এই কাজের তদারককারী রাজশাহী গণপূর্ত অধিপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিল্লুর রহমান বলেন, ‘শুনেছি কাজটি সাজিন এন্টারপ্রাইজ পেয়েছে। তবে কিভাবে পেল বলতে পারব না।’

 

 



মন্তব্য