kalerkantho


নাটোরে অনিয়মের ট্যুরে ট্যুরিস্ট পুলিশ

অপকর্ম ধামাচাপা দিতে সাংবাদিক ম্যানেজের চেষ্টা

রেজাউল করিম রেজা, নাটোর   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নাটোরে অনিয়মের ট্যুরে ট্যুরিস্ট পুলিশ

দায়িত্বে অবহেলা, প্রভাবিত হয়ে মিথ্যা তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে নাটোর ট্যুরিস্ট পুলিশের কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের চিত্র উঠে এলেও অভিযোগ অস্বীকার করছেন কর্মকর্তারা। পরে নিজেদের অপকর্ম ধামাচাপা দিতে টাকা দিয়ে সাংবাদিক ম্যানেজের চেষ্টাও করেছেন নাটোর ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক।

জানা যায়, ২০১৭ সালের মাঝামাঝিতে ২০ সদস্যের সমন্বয়ে যাত্রা শুরু হয় ট্যুরিস্ট পুলিশের নাটোর সাবজোন অফিসের। উদ্দেশ্য ছিল উত্তরা গণভবন, বঙ্গজল রাজবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে তারা। অভিযোগ আছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অবহেলা করছেন ট্যুরিস্ট পুলিশের কর্মকর্তারা। গত ৬ সেপ্টেম্বর সারা দিন গণভবনে নজরদারি করেন গণমাধ্যমকর্মীরা। সেখানে আসা দর্শনার্থীরা ট্যুরিস্ট পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। বিকেলে হাফিজ ও পরিমল নামে দুজন ট্যুরিস্ট পুলিশ সদস্য মূল গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছিলেন। এ সময় সাংবাদিকরা দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তাঁরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। দায়িত্বে অবহেলা ছাড়াও আদালত থেকে পাওয়া সিআর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ ট্যুরিস্ট পুলিশের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত মার্চ মাসের শুরুতে ময়মনসিংহে অ্যারিস্টো ফার্মায় মেডিক্যাল ইনফরমেশন অফিসার পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় নাটোরের কৈগাড়ি কৃষ্ণপুরের রনি আক্তার কম্পানির মোটরসাইকেলসহ ৬২ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। পরে কম্পানির কর্মকর্তাদের কাছে ২২ মার্চ টাকা ও মোটরসাইকেল ফেরতের অঙ্গীকারনামা দেন রনি। অঙ্গীকারনামা অনুযায়ী, ১ এপ্রিল সব কিছু অ্যারিস্টো ফার্মার এরিয়া ম্যানেজার আসাদুজ্জামান আসাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। নির্ধারিত সময়ের কয়েক দিন পর মোটরসাইকেল ফেরত দিলেও টাকা নিয়ে টালবাহানা শুরু করেন রনি। পরে এ বিষয়ে নাটোর সদর থানায় অভিযোগ দায়ের হলে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সোহেলের উপস্থিতিতে ১১ জুন রনি দুই মাসের মধ্যে টাকা ফেরত দিতে ফের অঙ্গীকারনামা করেন। এরই মধ্যে টাকা না দিয়ে আদালতে উল্টো প্রতিষ্ঠানটির এরিয়া ম্যানেজার আসাদুজ্জামান আসাদের নামে তিন লাখ টাকা আত্মসাতের মামলা ঠোকেন রনি। আদালত এর তদন্তভার দেন নাটোর ট্যুরিস্ট পুলিশকে। অভিযোগ উঠেছে, কোনো তদন্ত না করেই মনগড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন কর্মকর্তারা।

ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘ট্যুরিস্ট পুলিশের এসআই নুর ইসলাম তদন্ত না করেই আদালতে রিপোর্ট প্রদান করেছেন। আমার সঙ্গে রনি আক্তারের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে ঝামেলা নেই। আমি কম্পানির টাকা তুলতে এসে উল্টো মামলার শিকার হয়েছি। আমার কাছে শক্ত এভিডেন্স আছে। তদন্তকালে কেউ আমার কাছে আসেনি। আমলে নেওয়া হয়নি সদর থানা পুলিশের কাছে রনির অঙ্গীকারনামার বিষয়টি।’

এসআই নুর ইসলাম বলেন, তিনি সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সত্যতা পেয়েই প্রতিবেদন (রিপোর্ট) দিয়েছেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, মামলায় অভিযুক্ত আসাদুজ্জামানের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি তাঁকে পাননি। 

অভিযোগ পাওয়া গেছে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন নাটোরে কর্মরত এক সাংবাদিক। কিন্তু প্রভাবিত হয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশের এসআই মোশারফ হোসেন আদালতে মিথ্যা প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। ওই সাংবাদিক বলেন, এক ব্যক্তি পুকুর মালিক সেজে তাঁর (সাংবাদিক) বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা করেন। অথচ মামলাকারীর পুকুরই নেই। যে পুকুর নিয়ে মামলা হয়েছে, সেটা আলাল উদ্দিন নামে অন্য একজনের। আলাল নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সাংবাদিকের পক্ষে এফিডেফিট করে দেন। তার পরও ট্যুরিস্ট পুলিশ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন দেয়। মামলার বাদী স্বীকার করেছেন, টাকার মাধ্যমে তিনি ট্যুরিস্ট পুলিশকে প্রভাবিত করেছেন, যা ওই সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধারণ করা আছে। 

এসআই মোশারফ হোসেন তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তদন্তে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তিনি যা পেয়েছেন, সেই মোতাবেক রিপোর্ট দিয়েছেন।

নাটোর ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক খাদেমুল ইসলাম বলেন, দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি সঠিক নয়। ট্যুরিস্ট পুলিশ ঠিকঠাক মতো দায়িত্ব পালন করছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের কোনো কর্মকর্তা তদন্তে গাফিলতি করলে বা মিথ্যা প্রতিবেদন দিলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ কথা বলার পরদিনই পরিদর্শক খাদেমুল ইসলাম সাংবাদিকের কাছে প্রতিবেদন না করার জন্য বড়হরিশপুর বাইপাসে টাকা নিয়ে হাজির হন। এটি গোপন ক্যামেরাসহ আশপাশের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির জেলা সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক জানান, নাটোর এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ না থাকায় কোনো জবাবদিহি নেই। এ জন্য তারা দায়িত্বে অবহেলাসহ নানা অপকর্ম করার সুযোগ পাচ্ছে।

ট্যুরিস্ট পুলিশের অনিয়মের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন। তবে ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রম নিজেদের আওতায় নয় বলে জানিয়ে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি নাটোরের পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার।



মন্তব্য