kalerkantho


আর্সেনিকের বিষে ২৮ বছরে মৃত ২২

ভয়ের গ্রাম মাড়ুয়া

শাহানুর আলম উজ্জ্বল, চৌগাছা (যশোর)   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ভয়ের গ্রাম মাড়ুয়া

চৌগাছা উপজেলার মাড়ুয়ায় আর্সেনিকে আক্রান্ত রোকেয়া বেগমের ডান হাতের দুটি আঙুল কাটা হয়েছে।

চারপাশের ইটের প্রাচীর, লোহার গেট। বাড়ি দেখলেই বোঝা যায়, পরিবারটি সচ্ছল। কিন্তু গেটে তালা দেখে চিন্তায় পড়তে হয়। কারণ যশোরের চৌগাছা উপজেলার মারুয়া গ্রামের এই বাড়িতে কেউ থাকে না।

গ্রামের লোকজন জানায়, বাড়ির মালিক কাশেম আলী (৬০) ২০০৭ সালে মারা গেছেন। তাঁর স্ত্রী পদ্মা খাতুন (৫৩) ২০১৩ এবং ছেলে আয়ুব হোসেন (৩৮) ২০১৬ সালে মারা গেছেন। তাঁরা তিনজন আর্সেনিকে আক্রান্ত ছিলেন। বেঁচে আছেন আয়ুবের স্ত্রী জাহানারা বেগম (৩৬)। আর্সেনিকের ভয়ে তিনি মহেশপুরে বাবার বাড়িতে থাকেন। জমি বর্গা দেওয়া। বছরে দুবার এসে তিনি টাকা নিয়ে চলে যান।

এ গ্রামের জনসংখ্যা চার হাজার। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার এই রোগে আক্রান্ত। এর দুই হাজার অতি ও মধ্যম মাত্রায় আক্রান্ত। আক্রান্ত হয়ে গত ২৮ বছরে এই গ্রামের মোট ২২ জন মারা গেছে।

গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৫২) বলেন, ‘আমার ডান হাতের দুটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছে। আর্সেনিকের কারণে আমাদের পরিবারে সাতজন মারা গেছে।’ তিনি জানান, ১৯৯০ সালে প্রথম মারা যান তাঁর দেবর আনিছুর রহমান (২০)। এরপর শ্বশুর ইয়াকুব আলী (৭০) ১৯৯১ সালে, স্বামী মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন (৫৫) ২০০৪ সালের ২৯ জানুয়ারি, শাশুড়ি নূরজাহান (৬৫) ২০০৬ সালে, স্বামীর ভাই আব্দুল আজিজ (৫২) ২০০৮ সালে, ইউছুফ আলী (৩৫) ২০০৯ সালে, ইউছুফের স্ত্রী সালমা খাতুন (৩০) ২০১৩ সালে মারা গেছেন।

স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ির মৃত্যুর পর এই পাকা বাড়ি ছেড়ে ঝিনাইদহে বাবার বাড়িতে বাস করেন জাহানারা বেগম।

এই গ্রামে আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে আরো মারা গেছেন ২০১৭ সালে আকরাম হোসেন (৪০), ২০১৫ সালে নূর ইসলাম (৫৫), ২০০৬ সালে হোসেন আলী (৫০), ২০০৫ সালে ময়না বিবি (৪০), ২০০২ সালে মুকতার আলী (৪৫), ২০১২ সালে আতিয়ার রহমান (৪৮), ২০০৩ সালে আক্কাচ আলী (৪৪), ২০০২ সালে মনসের আলী (৪২), ১৯৯৮ সালে ইলাহুড়ি (৬৭) এবং ২০১৩ সালে ইউনুচ আলী (৫৫)।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অফিস ও এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক বেশ কিছু গ্রামকে আর্সেনিকযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো মাড়ুয়া, বেড়গোবিন্দপুর, কুষ্টিয়া, রামভদ্রপুর, ফুলসারা, জগদীশপুর, পাতিবিলা, সিংহঝুলী, জগন্নাথপুর, হাকিমপুর, কয়ারপাড়া, মাজালী, বলিদাপাড়া, সুখপুকুরিয়া, তেঘোরি, গরীবপুর, জাহাঙ্গীরপুর ও চৌগাছা।

জগদীশপুর ইউনিয়ন পরিষদের মাড়ুয়া গ্রামের সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ আলী বলেন, ‘আর্সেনিকের গ্রাম বললে সবাই মাড়ুয়াকে বোঝে। এ গ্রামের অল্পসংখ্যক লোক বাদে সবাই আর্সেনিকের রোগী। আমিও এ রোগে আক্রান্ত।’

আকরাম হোসেনের দুটি আঙুল কাটার পর ২০১৬ সালে মারা যান। তাঁর স্ত্রী মাইরুনও আক্রান্ত। তাই বাড়িটি তালাবদ্ধ।

এ গ্রামের বাসিন্দা ও এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের সংগঠক লুৎফর রহমান বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি লিটার পানিতে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা ০.০১ মিলিগ্রাম। কিন্তু দেশে ০.৫ মিলিগ্রাম সহনীয় মাত্রা ধরা হয়। সেখানে এই গ্রামে গড়ে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে ৮৫ মিলিগ্রাম। আবার দক্ষিণপাড়ায় ১০০ মিলিগ্রাম উপস্থিতি পাওয়া গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ গ্রামে দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার রোগী রয়েছে। যা প্রমাণিত। আমিও আক্রান্ত। আর্সেনিকের কারণে আমার ফুসফুসে ক্যান্সার হয়েছে।’

তিনি জানান, ২০০১ সালে এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক এই গ্রামে বিশেষ গবেষণা শুরু করে। মাটি, পানি, মানুষের রক্ত, মলমূত্রসহ নানা বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। তারা আর্সেনিকযুক্ত পানির উৎস বন্ধ করার পরিকল্পনা করে। পরবর্তী সময়ে নিরাপদ পানির জন্য পরিশোধক স্থাপন করে। ২০০৮ সালে তাদের প্রকল্প শেষ হয়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে পরিশোধক থেকে মানুষ পানি সংগ্রহ করতে পারছে না। এ ছাড়া পুরো গ্রামে নিরাপদ পানি সরবরাহের জন্য একটি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৫ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৫ সালে রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যার পর ওই প্রকল্প আর আলোর মুখ দেখেনি।

আর্সেনিকে আক্রান্ত। তাই আর্সেনিকমুক্ত পানির জন্য গ্রামের নারী-পুরুষের অপেক্ষা।   ছবি : কালের কণ্ঠ

গত শনিবার ওই গ্রামে গেলে অন্তত ২০ জন আক্রান্তের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। এর মধ্যে মাড়ুয়া বাজার মসজিদের মুয়াজ্জিন আনছার আলী (৬৫) বলেন, ‘২০ বছর ধরে এ রোগে ভুগছি। এখন শ্বাসকষ্ট আর হৃদযন্ত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ১০ কাঠা জমি বেচে চিকিৎসা করিয়েও সুস্থ হইনি।’

এ বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা জনস্বাস্থ্য অফিসের সহকারী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘২০০৩ সালে এ উপজেলার ৩৬ হাজার নলকূপ পরীক্ষা করে ১৬ হাজার নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এরপর আর জরিপ হয়নি। জনগণ পানি নিয়ে অফিসে এলে সেটা পরীক্ষা করা হয়।’ তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে সরকারিভাবে ৭৯টি পাতকুয়ার বরাদ্দ এসেছে। প্রতিটি পাতকুয়া নির্মাণ করতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। জনগণকে মাত্র দুই হাজার ৫০০ টাকা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে জমা দিতে হবে।

উপজেলা ৫০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আওরঙ্গজেব বলেন, ‘হাতেপায়ে ক্ষত বা ক্ষত বৃদ্ধির উপশমের জন্য কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। তবে সরকারিভাবে সরবরাহ নেই। এ কারণে হাসপাতালে রোগীর পরিমাণ কম।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সেলিনা বেগম বলেন, ‘আক্রান্তদের তালিকা তৈরি করে চিকিৎসা দিচ্ছি। প্রাথমিকভাবে চিকিৎসার পাশাপাশি আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করলে রোগ ভালো হয়।’

চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইবাদত হোসেন বলেন, ‘আর্সেনিকযুক্ত এলাকায় সরকার দৃষ্টি দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে পাতকুয়া দেওয়া হচ্ছে। জনগণ সচেতন হলে, নিরাপদ খাবার পানির জন্য টিউবওয়েলের ওপর ভরসা করার দরকার নেই। বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে পান করতে পারি। এ ছাড়া অনেক পুকুর আছে। সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করে ফুটিয়ে খেতে পারি।’



মন্তব্য