kalerkantho


সব ধরনের যান চলাচলে বাধা

সুনামগঞ্জে মালিক-শ্রমিকদের পরিবহন ধর্মঘট

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গত দুই দিন দিরাই-মদনপুর আঞ্চলিক সড়কে ধর্মঘটের পর সুনামগঞ্জ জেলাজুড়ে গতকাল রবিবার সকাল থেকে পরিবহন ধর্মঘট পালন করছে শ্রমিক-মালিকরা। অনির্দিষ্টকালের এই ধর্মঘটে বাস, মিনিবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা—এমনকি মোটরসাইকেল চলাচলে বাধা দিচ্ছে পরিবহন শ্রমিকরা। এতে চরম যাত্রী দুর্ভোগ লক্ষ করা গেছে।

গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রাহেল মিয়া বাসচাপায় মারা যান। এর প্রতিবাদে নোয়াখালী বাজারে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বাস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এরপর ঘর্মঘট ডাকে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় সুনামগঞ্জ নতুন বাসস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, দূরপাল্লাসহ অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলকারী সব বাস সারি সারি করে রাখা হয়েছে। সড়কে চেয়ার-টোল নিয়ে শ্রমিকরা সব ধরনের গাড়ি চলাচলে বাধা দিচ্ছে। সংঘবদ্ধ শ্রমিকরা এ সময় সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা, এমনকি মোটরসাইকেল থেকেও যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে চালকের চাবি কেড়ে নিয়ে গাড়িগুলো স্টেশনের ভেতরে নিয়ে রাখে। এ সময় যাত্রীরা প্রতিবাদ জানালে তাদের হুমকি-ধমকি দেয় শ্রমিকরা। মোড়ে মোড়ে শ্রমিক-মালিক পরিষদের কর্মীদের টহল দিতে দেখা গেছে।

এ সময় বাসস্টেশনে দেখা যায়, দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা রাস্তায় দুঃসহ গরমে অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে বয়স্ক, অসুস্থ মানুষ, শিশুরা গরমে খোলা আকাশের নিচে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছিল। রাস্তার পাশে কোনো স্থাপনা না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা অপেক্ষা করছিল। কোনো যাত্রী এ সময় লেগুনা, অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে যেতে চাইলে তাদের বাধা দেয় শ্রমিকরা। এ সময় দেখা গেছে ট্রাক, পিকআপ, ভ্যান, মোটরসাইকেল, সিএনজি, লেগুনাসহ অন্তত ৩০টি যানবাহন আটকে রাখা হয়েছে স্টেশনের ভেতরে। চাবি দিতে অস্বীকার করায় কয়েকজন চালককে মারধরও করা হয়েছে। মোটরসাইকেলের চালক শফিকুল একজন রোগীর স্বজনকে নিয়ে হাসপাতালে আসার পথে তাঁর মোটরসাইকেলটি আটকে দেয় শ্রমিকরা। এ সময় বাধা দিলে এই প্রতিবেদকের সামনেই তাঁকে চড়-থাপ্পড় দেয় একজন শ্রমিক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু বাসস্টেশন নয়, পাগলা, নীলপুর, মদনপুর পয়েন্ট, ডাবর পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্থানে পরিবহন শ্রমিকরা সব ধরনের যান চলাচলে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে যাত্রীদের সঙ্গে তাদের তর্ক হয়েছে।

পাগলা বাজার যাওয়ার জন্য সুভাষ পাল নামের এক তরুণ তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে অটোরিকশায় রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাসস্টেশনে তাঁদের নামিয়ে দেয় শ্রমিকরা। কেড়ে নেয় চালকের চাবি। তিনি তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর দোহাই দিয়েও রেহাই পাননি। সুভাষ পাল বলেন, ‘অন্তঃসত্ত্বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গরমে কষ্ট পাচ্ছে।’

বিশ্বম্ভরপুরের যাত্রী সিদ্দিকুর রহমান জানান, জরুরি কাজে সিলেট যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেলে এসেছিলেন। তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে চাবি নিয়ে যায় শ্রমিকরা। তিনি বলেন, ‘বাসচালক, মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে একটি দুর্ঘটনার পর এলাকাবাসী প্রতিবাদ করেছে। এখন সব যানবাহন বন্ধ করে ধর্মঘট করা বেআইনি ও অন্যায়। এটা নৈরাজ্য ও অমানবিক।’ তিনি আরো বলেন, ‘নিজেদের স্বার্থে যাত্রীদের জিম্মি করাটা সন্ত্রাস। তারা বাস ধর্মঘট ডাকতে পারে। কিন্তু সব ধরনের যানবাহন চলাচলে বাধা দিতে পারে না।’

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ পরিবহন শ্রমিক-মালিক ঐক্য পরিষদের মহাসচিব মো. জুয়েল মিয়া বলেন, ‘দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের বাস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। আমরা নিরাপত্তার দাবিতে এবং ক্ষতিপূরণের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট পালন করছি। তা ছাড়া আমাদের দাবির মধ্যে রাস্তাঘাট সংস্কারের বিষয়টিও আছে।’

সুনামগঞ্জ জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. নূরুল হক বলেন, ‘পুলিশের সামনে আমাদের গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। পরিবহন ও শ্রমিকদের কোনো নিরাপত্তা নেই। নিরাপত্তার দাবি ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে আমরা স্থানীয়ভাবে দুই দিন ধর্মঘটের পর রবিবার থেকে জেলাব্যাপী অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছি। তবে মোটরসাইকেল বা অন্যান্য ছোট যানবাহনের যাত্রী চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আমরা বলিনি।’

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. বরকতুল্লাহ খান বলেন, ‘আমরা আজকেই মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করে ধর্মঘট প্রত্যাহারের আবেদন জানানোর প্রস্তুতি নিয়েছি। রাতেই আমরা বসব। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি অবগত করা হয়েছে।’



মন্তব্য