kalerkantho


পরিচ্ছন্নতা মুখ থুবড়ে

১০ কোটি টাকার ‘গ্রিন ঠাকুরগাঁও ক্লিন ঠাকুরগাঁও প্রকল্প’

পার্থ সারথী দাস, ঠাকুরগাঁও   

১৯ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



পরিচ্ছন্নতা মুখ থুবড়ে

ঠাকুরগাঁও পৌর এলাকার কলেজ রোডের অপরাজেয় একাত্তরসংলগ্ন লোহার ব্রিজের পাশে ময়লার স্তূপ। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রতিষ্ঠানের উদাসীনতা ও জবাবদিহি না থাকা এবং পৌর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার জলবায়ু ফান্ডের ১০ কোটি টাকার ‘গ্রিন ঠাকুরগাঁও ক্লিন ঠাকুরগাঁও প্রকল্প’। ছয় বছরেও প্রকল্পটি ভালোভাবে কাজ না করায় ঠাকুরগাঁও এখন ময়লা-আবর্জনার শহরে পরিণত হয়েছে। দুর্গন্ধে ঘটছে বায়ুদূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে পৌরবাসী।

১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও পৌরসভা প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পায় ১৯৯৭ সালে। কিন্তু এখনো প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত পৌরবাসী। বছরের পর বছর সেবার মান না বাড়লেও নাগরিকদের ঘাড়ে বেড়েছে করের বোঝা।

পৌর এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখতে ও সেবার মান বাড়াতে ২০১২-১৩ অর্থবছরে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের ১০ কোটি টাকার অর্থায়নে ‘গ্রিন ঠাকুরগাঁও ক্লিন ঠাকুরগাঁও প্রকল্প’ হাতে নেয় পৌরসভা। চুক্তি হয় স্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) ইএসডিওর সঙ্গে। প্রথম কয়েক মাস পৌরবাসী অর্থের বিনিময়ে কিছুটা সেবা পেলেও পরে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রতিষ্ঠান ও পৌর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় তা মুখ থুবড়ে পড়ে।

শহরের বিভিন্ন রাস্তার ধারে, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অনেক বাসা-বাড়ির লোকজনও উচ্ছিষ্ট, ময়লা রাস্তায় ও ড্রেনে ফেলে। আবর্জনার স্তূপ জমে থাকায় বৃষ্টি হলেই শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। আবর্জনা অপসারণ ও ড্রেন পরিষ্কারে পৌর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ না থাকায় শহর অপরিচ্ছন্ন থাকে সারা বছর। এতে বায়ুদূষণ ঘটছে। স্বাভাবিক সুস্থ পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।

পৌর শহরের কোর্ট চত্বর, জেলা রেজিস্ট্রি অফিস ও কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ফটকের সামনে ময়লার বড় স্তূপ। কলেজ রোডের অপরাজয় একাত্তরসংলগ্ন লোহার ব্রিজের পাশে ময়লা ফেলছে ইএসডিও নিয়োগকৃত পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই। এতে দুর্গন্ধে শিক্ষার্থী ও পথচারীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও কাজ হচ্ছে না। সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ইএসডিওর জমিরুল ইসলাম নামে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ভ্যান থেকে ময়লা ফেলছেন। তিনি বলেন, শহরে কোথাও ময়লা ফেলার জায়গা নেই, তাই এখানে ফেলে।

পৌর এলাকার হাজীপাড়ার বাসিন্দা আবুল হোসেন জানান, পৌরসভা প্রথম শ্রেণির হলেও সেই নাগরিক সুবিধা নেই। প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় নেই ডাস্টবিন। ব্যবসায়ীসহ বেশির ভাগ মানুষ বাধ্য হয়েই তাদের প্রতিষ্ঠান ও বাসা-বাড়ির ময়লা রাস্তার পাশে ফেলে।

ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম জানান, প্রতিদিন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ভ্যানে করে আবর্জনা পুরাতন লোহার ব্রিজের দক্ষিণ কোণে ফেলে। বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁর ময়লাও সেখানে ফেলা হচ্ছে। ওই ময়লার স্তূপ প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কলেজে যাতায়াতের সময় নাক চেপে স্থানটি পার হতে হয়। কালেক্টর পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সানজিদা আক্তার জানায়, তাদের বিদ্যালয়ের সামনে বিশাল ময়লার স্তূপ জমে থাকে মাসের পর মাস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক নলিনী মহন্ত জানান, ওই ময়লা স্তূপ বিদ্যালয়ের পরিবেশকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে। ময়লা অপসারণের জন্য কয়েকবার পৌরসভায় জানানো হলেও কোনো উদ্যোগ নেই। পৌর এলাকার আশ্রমপাড়ার এক গৃহিণী বলেন, ‘আমরা নিয়মিত পৌর কর দিই। তার পরও পৌর কর্তৃপক্ষ কর্তব্য পালন করছে না। ময়লা অপসারণের জন্য ইএসডিওকে প্রতি মাসে ৭০ টাকা দেওয়া হয়। ইএসডিওর কর্মীরা নিয়মিত ময়লা পরিষ্কার করে। কিন্তু এর পরিমাণ নির্দিষ্ট। একটি বাসা-বাড়ি থেকে তারা এক বালতির বেশি ময়লা নেয় না। পৌরসভার নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কখনোই পাড়া-মহল্লায় বর্জ্য পরিষ্কার করে না।’

ঘোষপাড়ার মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান জানান, কয়েক বছর ধরে পৌর এলাকার প্রধান সড়ক আর্ট গ্যালারি থেকে চৌরাস্তার ড্রেনটি পরিষ্কার করা হচ্ছে না। শহরের ড্রেনগুলোর পাশ দিয়ে সুস্থ মানুষ হেঁটে গেলে দুর্গন্ধে অসুস্থ হয়ে পড়বে। ড্রেনগুলো দ্রুত পরিষ্কার করতে আহ্বান জানান তিনি। আশ্রমপাড়ার বাসিন্দা আহসানুল হাবিব বাবু জানান, পৌরসভা ও ইএসডিওর মধ্যে বর্জ্য অপসারণের জন্য কয়েক কোটি টাকার যে চুক্তি তা আলোর মুখ দেখেনি। এতে অর্থ আত্মসাতের কিছুটা লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রকল্পের অর্থ সঠিক খাতে ব্যয় করা হয়নি। হলে পৌরবাসী সুস্থ পরিবেশ পেত। এত বড় পৌরসভায় কোনো ডাস্টবিন নেই!

তবে এসব অভিযোগ মানতে নারাজ ইএসডিওর ‘গ্রিন ঠাকুরগাঁও ক্লিন ঠাকুরগাঁও’-এর প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর প্রবীর কুমার গুপ্ত। তিনি বলেন, প্রকল্পের যে সার্বিক বিষয় রয়েছে তা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে ইএসডিও। শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার রাস্তায় যেসব ময়লা পড়ে থাকতে দেখা যায় তা পরিষ্কার করার দায়িত্ব ইএসডিওর নয়। ইএসডিওর এই প্রকল্পের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা শুধু বাসা-বাড়ির ভেতরের ময়লা অপসারণ করবে। আর লোহার ব্রিজের পাশে কে বা কারা ময়লা ফেলে তা তাঁর জানা নেই। ইএসডিওর কারো সেখানে ময়লা ফেলার কথা নয়। তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী বায়োগ্যাস প্লান্ট পৌরসভা এখন পর্যন্ত ইএসডিওকে বুঝিয়ে দেয়নি। বুঝিয়ে দিলে সেখানে ময়লা ফেলা যেত। তখন এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতো না।

ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের চিকিৎসক শাহজাহান নেওয়াজ জানান, ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে মানবদেহে শ্বাসকষ্টসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে।

ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, ‘ইএসডিওর এই প্রকল্পের ম্যানেজমেন্ট ফেল করার কারণে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। দ্রুত শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে পৌরসভার নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হবে। এতে কিছুটা হলেও জনদুর্ভোগ কমবে।’

৩০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ১২টি ওয়ার্ডের জনসংখ্যা প্রায় এক লাখ ৪১ হাজার এবং হোল্ডিং সংখ্যা ২৯ হাজার। প্রতি হোল্ডিং থেকে ময়লা অপসারণের জন্য প্রতি মাসে ৭০ টাকা নেওয়া হলে মোট আদায় হয় ২০ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তবে ইএসডিও বলছে, এখন পর্যন্ত তাদের আওতায় এসেছে ছয় হাজার হোল্ডিং।



মন্তব্য