kalerkantho


অক্সিজেনহীন ময়ূর

কৌশিক দে, খুলনা   

১৭ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



অক্সিজেনহীন ময়ূর

খুলনা নগর সংলগ্ন ময়ূর নদ এখন জলজপ্রাণীর বসবাস অযোগ্য। ছবি : কালের কণ্ঠ

এক পাশে জলকপাট, আরেক পাশে ভরাট। মাঝখানে খনন করে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় করেছে খুলনা সিটি করপোরেশন। কিন্তু এতেও ময়ূর নদের পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে পারেনি।

খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ময়ূর নদের দৈর্ঘ্য ২২ কিলোমিটার। এই নদ একসময়ে এ অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানি ও মাছের অন্যতম আধার ছিল। পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার হতো। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে অপ্রতিরোধ্য দখলে দিন দিন নদী তার আয়তনও হারাচ্ছে। ২০১৫ সালে সিটি করপোরেশন পাঁচ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নদের পাঁচ হাজার মিটার খনন করে। তবে এর কোনো প্রভাব চোখে পড়ে না। এক প্রান্তে আলুতলা বাঁধ নামক স্থানে একটি জলকপাট থাকলেও সেটি বন্ধ। আরেক প্রান্ত ভরাট ও বেদখল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে নদ এক প্রকার বন্ধ দূষিত কূপে পরিণত হয়েছে।

এই নদের পানি নিয়ে খুলনার পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১১ সালে পরীক্ষা শুরু করে। পরীক্ষায় নদের পানিতে দিন দিন দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে আসছে বলে তথ্য মিলেছে, যা জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা ও কৃষিকাজে ব্যবহার অনুপযোগী।

পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী, মাছ জলজ প্রাণী বেঁচে থাকা ও কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন সর্বনিম্ন প্রতি লিটারে পাঁচ মিলিগ্রাম থাকার কথা।

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার সিনিয়র কেমিস্ট মো. কামরুজ্জামান সরকার জানান, ২০১১ সালে নদের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা ছিল প্রতি লিটারে চার মিলিগ্রাম। চলতি বছরের জানুয়ারিতে নদের প্রতি লিটার পানিতে অক্সিজেনের দ্রবীভূত মাত্রা ছিল ১.৪ মিলিগ্রাম। ফেব্রুয়ারিতে ১.৫, মার্চে ১.৫, এপ্রিলে ১.৬, মেতে ১.৫ থেকে ১.৬, জুনে ১.২ থেকে ১.৪ ও জুলাইয়ে ১.২ থেকে ১.৪ মিলিগ্রাম ছিল। তিনি বলেন, ‘দিন দিন নদের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে বায়োলজিক্যালি অর্থাৎ বৈজ্ঞানিকভাবে এই নদীর মৃত্যু হয়ে যেতে পারে। নদীটি বাঁচাতে হলে প্রাথমিকভাবে নদীর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। নদীর ধর্ম অনুযায়ী পানিপ্রবাহ না থাকলেও কোনো কিছুতেই বাঁচানো সম্ভব নয়। এখানে বর্তমানে যে অক্সিজেনের মাত্রা তাতে সেখানে কোনো জলজ প্রাণী থাকার কথা নয়।’

অন্যদিকে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষণা অনুয়ায়ী, আরএস খতিয়ানে ময়ূর নদের যে এলাকা ছিল সেখান থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দখল হয়েছে ৫.১২ শতাংশ। ২০০৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আরো ৩.৬৯ শতাংশ জমি দখলদারের কবলে চলে গেছে। আর ২০১০ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত সর্বশেষ আয়তনের ৪.১৭ শতাংশ হারিয়েছে।

কুয়েটের সহকারী অধ্যাপক তুষার কান্তি রায় তাঁর গবেষণার তথ্য দিয়ে বলেন, ‘ময়ূর নদের পানির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বর্তমানে বাধাগ্রস্ত। রূপসা নদীর সঙ্গে সংযোগস্থলে জলকপাট নির্মাণ ও তা রক্ষণাবেক্ষণ না করায় ময়ূর একটি বদ্ধ জলাধারে পরিণত হয়েছে। এর ফলে এই পানিতে দূষণের মাত্রা বাড়ছে।’

খুলনা সিটি করপোরেশনের মুখ্য পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবীর উল জব্বার জানান, ময়ূর নদকে রাজধানীর হাতির ঝিলের আদলে তৈরির জন্য সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য প্রথমে নদকে ময়লা-আবর্জনামুক্ত করতে হবে। প্রায় ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্পে খনন, পার বাঁধা, সেতু নির্মাণ ও দৃষ্টিনন্দন করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে। দাতা সংস্থা বা সরকারি সহায়তা পেলে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। এতে খুলনার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। তিনি বলেন, ‘ময়ূর নদ খননে আগেও সিটি করপোরেশন অর্থ ব্যয় করেছে। অব্যাহত দূষণের কারণে সুফল পাওয়া যায়নি। এ জন্য সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।’

 



মন্তব্য