kalerkantho


বাহুবলে চলছে চার মাতবরের দুঃশাসন

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি   

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার খাগাউড়া গ্রামে চলছে চার মাতবরের দুঃশাসন। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে এবং গ্রামের সরকারি জলমহালের বিশাল অঙ্কের টাকা নিতে তাঁরা খেয়াল-খুশিমতো বিচার সালিসের মাধ্যমে লোকজনকে সমাজচ্যুত করাসহ নানাভাবে নির্যাতন করছেন বছরের পর বছর ধরে।

দেড় হাজার বাসিন্দার খাগাউড়া গ্রাম বাহুবলের ভাটি অঞ্চল নামে পরিচিত। গ্রামটিতে রয়েছে একটি বড় জলমহাল। এ জলমহালের মাছ বিক্রি থেকে বছরে আয় হয় ৪০-৪৫ লাখ টাকা। সব টাকা গ্রামের চার মাতবরসহ কিছু লোক ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে অবৈধভাবে ভোগ করছে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলেই তার ওপর নেমে আসে নির্যাতন। প্রতিবাদকারীকে করা হয় সমাজচ্যুত, গ্রামে আসতে দেওয়া হয় না। গ্রামে এলে গুনতে হয় জরিমানা। পূজা-পার্বণ ও আত্মীয়-স্বজনের জানাজায়ও অংশ নিতে দেওয়া হয় না। মাতবরদের কথা না শুনলে বা তাঁদের দলে যোগ না দিলে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়, ঘরছাড়া বা একঘরে করে রাখা হয়। দেহব্যবসার অপবাদ দিয়ে নিঃস্ব করে দেওয়া হয় পরিবার বা মানুষজনকে। সমাজচ্যুত করা ব্যক্তিকে সমাজে ফিরতে হলে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে খুশি করতে হয় মাতবরদের। কারো মা-বাবার মৃত্যু উপলক্ষে অনুষ্ঠানে কাদের দাওয়াত দেওয়া যাবে, সে সিদ্ধান্তও নিতে হয় মাতবরদের কাছ থেকে। সিদ্ধান্ত অমান্যকারীকে গ্রামছাড়া করা হয়। অথচ এই গ্রামে জন্ম স্বাধীনতা পদক পাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর মতো আলোকিত ব্যক্তির।

অভিযুক্ত চার মাতবর হলেন খাগাউড়া গ্রামের মৃত লোদাই মিয়ার ছেলে শওকত মিয়া, মৃত আব্দুর নুরের ছেলে শাহ গেদা মিয়া, মৃত শওকত আলীর ছেলে আব্দুস শহীদ ও মৃত আছাব মিয়ার ছেলে আব্দুল মালিক ওরফে সেগেন মিয়া।

খাগাউড়া গ্রামের মহিবুর রহমান হিরা জানান, গ্রামের মাতবরদের কুকর্মের প্রতিবাদ করায় তাঁকে সমাজচ্যুত করা হয়। তিনি মাতবরদের দেড় লাখ টাকা দিয়ে গ্রামে প্রবেশ করেন এবং মাতবররা তাঁকে শর্ত দেন, ‘তুমি টাকা দিয়ে গ্রামের পঞ্চায়েতে উঠেছ মাত্র; কিন্তু তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে কথা বলতে পারবে না। কারণ সেও পাঁচের (পঞ্চায়েত) বাহিরে। যদি কথা বলো, তাহলে আবার জরিমানা দিতে হবে।’ এসব কথা বলতে গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন হিরা। একই গ্রামের জালাল উদ্দিনের ছেলে জুনাব আলী কাঁদতে কাঁদতে জানান, মাতবরদের অপকর্মের প্রতিবাদ করায় তিন-চার মাস আগে তাঁকে গ্রামছাড়া করা হয়। ঘোষণা দেওয়া হয়, গ্রামে দেখলে তাঁকে ধরে যে পঞ্চায়েতের মুখোমুখি করে দিতে পারবে তাঁকে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। তখন তাঁর দাদার মৃত্যু হলেও জানাজা ও দাফনে তিনি অংশ নিতে পারেননি ওই নিষেধাজ্ঞার কারণে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব ঘটনার মূল কারণ গ্রামের জলমহাল। মাছ বেচে বছরে ৪০-৪৫ লাখ টাকা আয় হয় জলমহাল থেকে। টাকাগুলো গুটিকয়েক লোকে ভাগ করে নেয়। যদি পঞ্চায়েতের মাধ্যমে সৎ, সাহসী লোকদের ওপর খড়্গ না চাপানো যায়, তবে তাঁরা ওই বিষয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। ফলে সমস্যাগুলো মাতবররা ইচ্ছামতো বানিয়ে এই অপশাসন চালিয়ে যাচ্ছেন সাত-আট বছর ধরে।

খাগাউড়ার প্রদীপ সূত্রধর কাঁদতে কাঁদতে জানান, তাঁর ওপর গ্রাম্য মাতবরদের নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি নিজ বাড়িতে পূজায় অংশ নিতে পারেননি। বাড়ির ফসলাদি কেটে নিয়ে যায় মাতবরের লোকজন। অর্ধাহারে-অনাহারে গ্রামের বাইরে দিন কাটছে তাঁর। গ্রামের জুনাব আলী বলেন, ‘গ্রামের একজন সদস্য হিসেবে জলমহালের হিসাব চাইতে গিয়ে আমার ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। আমাকে বের করে দেওয়া হয় গ্রাম থেকে। প্রায় তিন বছর আগে চার বছরের মেয়ে তারিন আর ৩২ দিনের ছেলে আরিয়ানকে রেখে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসি। আজ পর্যন্ত বাড়িতে গিয়ে আমার সন্তানদের দেখতে পারিনি। গ্রামের আশপাশে গেলেই মাতবরের লোকজন আমাকে মারধর শুরু করে।’

মঞ্জু মিয়া নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমি বিয়ে করার সময় মাতবরদের কথার অমান্য করে গ্রামের একজনকে দাওয়াত করি। এ কারণে আমাকে গ্রামছাড়া করা হয়েছে। আমি দুই বছর ধরে বিয়ের পরদিন থেকেই গ্রামের বাইরে। রাতের আঁধারে কোনো কোনো দিন বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীর সাথে দেখা করে ভোররাতে গ্রামের কেউ দেখার আগেই চলে আসি।’

সম্প্রতি খাগাউড়ার জুনাব আলীর লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য শোনে। এরই ভিত্তিতে অভিযুক্ত চারজনের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ করে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু তাঁরা নোটিশে সাড়া দেননি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা গ্রামে গিয়ে বিস্তারিত জেনে মর্মাহত হয়েছি। অভিযুক্তরা নোটিশের জবাব দেয়নি এবং শুনানির দিন আসেনি। তারা না এসে অপরাধ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বাহুবল উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বলেন, ‘আমরা প্রশাসনসহ বিষয়টি দেখছি।’

এ ব্যাপারে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে চার অভিযুক্ত মাতবরের একজন আব্দুস শহীদকে পাওয়া যায়। তিনি ‘আমি ত ইতা জানি না’ বলেই সংযোগ কেটে দেন।

 



মন্তব্য