kalerkantho


নাটোরে জিআর বরাদ্দ

দেড় কোটি টাকার চাল বিতরণে অনিয়ম

রেজাউল করিম রেজা, নাটোর    

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



দেড় কোটি টাকার চাল বিতরণে অনিয়ম

অতিথি আপ্যায়নের নামে নাটোর সদর ও নলডাঙ্গা উপজেলায় মানবিক সহায়তা কর্মসূচির (জিআর) বরাদ্দ ৪৬০ টন চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব চালের দাম দেড় কোটি টাকা। বরাদ্দপ্রাপ্তদের অনেকে ডিও লেটার (অনানুষ্ঠানিক চিঠি) হাতে পাননি। পরিবর্তে তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে নামমাত্র টাকা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে নাটোর সদর উপজেলায় ২২২টি প্রকল্পের আওতায় ৩০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। অন্যদিকে নলডাঙ্গায় ১০৯টি প্রতিষ্ঠানের নামে ১৬০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক টন, বিশেষ ক্ষেত্রে তিন টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ দুই উপজেলায় ৩৩১টি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের নামে চাল বরাদ্দের জন্য ২৩৯টি ডিও লেটার দেওয়া হয়। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং, শিশুসদন, অনাথ আশ্রম, মুসাফিরখানা ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিতরণের জন্য চালের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা বরাদ্দ দিয়েছে। বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা প্রায় সবাই সরকারদলীয় স্থানীয় নেতাকর্মী। বরাদ্দ পাওয়া এসব চাল বিক্রির টাকা দিয়ে স্থানীয় মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা, ইসলামী জলসা ও বিভিন্ন মন্দিরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শুধু অতিথি আপ্যায়নে ব্যয় করা হয়েছে। সবখানে বরাদ্দ চাল না দিয়ে সরকারি নিয়মবহির্ভূতভাবে তা বিক্রির নগদ টাকা দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ পাওয়া সব চালের দাম দেওয়া হয়নি।

নাটোর সদর উপজেলার হালসা ইউনিয়নে মাহিষা গোরস্তানের প্রধান মো. আক্কেল আলী প্রামাণিক জানান, গোরস্তানের ইসলামী জলসায় অতিথি আপ্যায়নের জন্য তাঁর নামে এক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু দলীয় এক নেতার মাধ্যমে তিনি নগদ ২১ হাজার টাকা পেয়েছেন।

একই ইউনিয়নের চিরাকোলা গ্রামের মসজিদপ্রধান আব্দুস সামাদ জানান, ইসলামী জলসায় অতিথি আপ্যায়নের জন্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান তাঁকে ২৪ হাজার টাকা দিয়েছেন।

দিঘাপতিয়া ইউনিয়নের ধরাইল হাফিজিয়া কওমি মাদরাসার প্রধান নুরুল ইসলাম নাজিম জানান, ইসলামী জলসায় অতিথি আপ্যায়নের জন্য তাঁর নামে তিন মেট্রিক টন জিআরের চাল বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। কিন্তু তিনি এক নেতার মাধ্যমে নগদ সাত হাজার টাকা পেয়েছেন।

একই ইউনিয়নের ফজলুল উলুম কওমি মাদরাসার নামে তিন মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেখানো হলেও তাঁরা পেয়েছেন মাত্র ২১ হাজার টাকা।

অন্যদিকে নলডাঙ্গা উপজেলার পৌর এলাকা ও পাঁচটি ইউনিয়নে ১০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নে চাল বিক্রির টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এই উপজেলার করের গ্রাম মাদরাসার নামে তিন মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ ছিল। এই প্রতিষ্ঠান নগদ ১১ হাজার টাকা পেয়েছে। আচড়াখালী উত্তরপাড়া ঈদগাহে ইসলামী জলসায় অতিথি আপ্যায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান আবুল হোসেনের নামে তিন মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। সেখানে কোনো জলসা হয়নি। একই উপজেলার ঠাকুর লক্ষীকোল জামে মসজিদের অতিথি আপ্যায়নের জন্য মো. সলিমের নামে তিন মেট্রিক টন জিআরের চাল বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। এই নামে ঠাকুর লক্ষীকোলে কোনো জামে মসজিদ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া কোনো কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জিআরের টাকা ২০১৭ সালের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে খরচ দেখানো হয়েছে। কিন্তু চলতি বছরে সেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়নি বলে স্থানীয়রা জানায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জিআর বরাদ্দের সময় চালের বাজারদর ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা টন থাকলেও প্রতিষ্ঠানকে চাল না দিয়ে ২৭ হাজার টাকা টন দরে বিক্রি দেখানো হয়েছে। এভাবে কম দামে বিক্রি দেখিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এ বিষয়ে নাটোর সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আখতার বানু জানান, সদরের এসি ল্যান্ডকে প্রধান করে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করে গঠিত পাঁচ সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই কমিটির যাচাই-বাছাই করা ২২২টি প্রকল্পের একটি তালিকা তিনি নাটোরের জেলা প্রশাসক, নাটোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার দপ্তরে জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘খাদ্য বিভাগকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ করা ডিও লেটারের মাধ্যমে চাল সরবরাহ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু চালের বদলে কেন টাকা দেওয়া হলো বা কম টাকা দেওয়া হলো সে ব্যাপারে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অভিযোগ আসেনি। এ বিষয়ে কিছুই জানি না। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’

নাটোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম রমজান বলেন, ‘ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, প্রায় প্রতিটি বরাদ্দে কিছু না কিছু অনিয়ম রয়েছে। জনস্বার্থে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

নলডাঙ্গা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এই উপজেলায় বরাদ্দ ১০৯টির মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ চালের সব টাকা পাওয়া যায়নি। সরকারের উচিত মানবিক সাহায্যের এসব কর্মসূচির অনিয়ম তদন্ত করে দেখা।’



মন্তব্য