kalerkantho


টিআরএম হয়নি ভরাট নদী

যশোরের ভবদহ অঞ্চলে ফের জলাবদ্ধতার আশঙ্কা

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

২০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



টিআরএম হয়নি ভরাট নদী

যশোরের ভবদহ অঞ্চলের বিলে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা জোয়ারের পানি তুলে বিলে পলি অবক্ষেপণ) চালু না থাকায় সংলগ্ন নদীগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের পথ নেই বললেই চলে। ফলে এবারও ভবদহ অঞ্চলটি জলাবদ্ধ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে ভবদহ এলাকা চিহ্নিত। এ এলাকার পানি নিষ্কাশিত হয় মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী দিয়ে। শ্রী ও হরি নদীর মুখেই ভবদহে ২১ কপাটের (ভেন্ট) জলকপাট। এর উত্তরাংশের কোনো বিলে টিআরএম কার্যক্রম চালু না থাকায় শ্রী-হরি-ভদ্রা অববাহিকায় পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টিপাতে এরই মধ্যে ভবদহের বেশ কিছু এলাকায় পানি জমতে শুরু করেছে।

সরেজমিন ভবদহ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে যে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী, হরি নদী এবং শ্রী-হরির নিম্নাংশ ভদ্রা নদী পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। ডুমুরিয়ার খর্ণিয়ায়ও ভদ্রা শুকিয়ে যাচ্ছে। ভাটার সময় এখানে তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট পানি থাকে। খর্ণিয়ার সামান্য উত্তরে শোলগাতিয়ায় ভাটার সময় হরি নদীর ওপর সেতুতে দাঁড়ালে এক চিলতে পানির রেখা দেখা যায়। খালি চোখেই দেখা যায়, নদীর দুই পাশজুড়ে থকথকে পলির আস্তর। আর নদীর মধ্যে পলি জমে অনেক স্থান উঁচু হয়ে গেছে। জোয়ারের সঙ্গে আসা পলি নদীর বুকে ও পারে দ্রুত জমে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। ভবদহ জলকপাটের দুটি কপাট খোলা। সেই খোলা কপাট দিয়ে জোয়ারের সামান্য পানি ভেতরের দিকে যাচ্ছে।

শ্রী নদীর পাশে বাড়ি মণিরামপুর উপজেলার কপালিয়া গ্রামের কালিপদ মণ্ডলের। তিনি বলেন, ‘নদী মইরে গেছে। ভাটায় এক হাত আর জোয়ারে বুকসমান জল থাকে। এবার নদী দিয়ে জল সরবে না। আমাগে আবারও ডুবে মরতি হবে।’ তিনি আরো বলেন, বিল খুকশিয়ায় টিআরএম বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই নদীতে বিপুল পরিমাণ পলি জমতে শুরু করেছে। এখন নদী একেবারে শুকিয়ে গেছে। অথচ বিল খুকশিয়ায় টিআরএম চলাকালে এ নদীতে ৩০ হাতেরও বেশি পানি ছিল।

ভবদহ কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল মতলেবও একই কথা বলেন। তাঁর মতে, বিল খুকশিয়ায় টিআরএম বন্ধ করে দেওয়ার পর বিল কাপালিয়ায় টিআরএম চালু হলে নদীর এ অবস্থা হতো না। অবশ্য এলাকার মানুষের প্রতিরোধের মুখে তখন টিআরএম চালু করা যায়নি। মানুষ এখন তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। তারা টিআরএমের দ্রুত বাস্তবায়ন চাইছে। এখন মানুষের দাবি, অবিলম্বে বিল কাপালিয়ায় টিআরএম বাস্তবায়ন করা হোক। গত বছর শ্রী-হরি নদীতে খনন করা হয়েছিল, অবশ্য তা কোনো কাজে আসেনি। এবার নদীর অবস্থা গত বছরের চেয়েও খারাপ। ফলে এলাকার অবস্থাও খারাপ হবে।

বিল কাপালিয়ায় টিআরএমে জনগণের বাধা দেওয়া সম্পর্কে নাগরিকদের সংগঠন পানি কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ এ বি এম শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিল খুকশিয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড যথাযথভাবে টিআরএম বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বিশেষ করে এ জন্য জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে পারেনি। এ জন্য মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছিল।’ তিনি জানান, বিল কাপালিয়া এলাকায় প্রচুর খাসজমি ছিল, এসব খাসজমির ওপর নির্ভর করে প্রচুর মানুষের জীবন-জীবিকা চলে। যেহেতু তারা জমির মালিক নয়, তাই তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান নেই। এসব মানুষের মনেও ক্ষোভ ছিল। প্রকৃতপক্ষে জমি অধিগ্রহণের আদলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পদ্ধতিটি টিআরএম সম্পর্কে মানুষের মনে বিরূপ ধারণা তৈরি করেছে।

টিআরএম নিয়ে গবেষণা করছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার দত্ত। তিনি বলেন, ‘টিআরএম বিষয়টি প্রাকৃতিক। তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য কারিগরি এবং সামাজিক নানা বিষয় মোকাবেলা করতে হয়। শুধু কারিগরি দিক বিবেচনায় নিয়ে টিআরএম বাস্তবায়ন করা যাবে না। আবার টিআরএম বাস্তবায়ন না করা গেলে এ অঞ্চলের নদীগুলো বাঁচানো যাবে না।’ সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাখিমারা বিলে টিআরএম বাস্তবায়নের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে টিআরএম করার ফলে কপোতাক্ষ নদী এখন প্রমত্তা।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, ‘চলতি বছর ভবদহ এলাকায় টিআরএম বাস্তবায়ন করা যাবে না। কারণ সরকার এখনো এ খাতে প্রস্তাবিত ৪৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেনি।’



মন্তব্য