kalerkantho


চত্বরে মাদকসেবীদের আখড়া

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১৯ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশ-কৃষি ও উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা ও নিরীক্ষার জন্য সুনামগঞ্জে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক অফিস উদ্বোধন করা হয়েছিল আড়াই বছর আগে। কিন্তু জনবলের অভাবে কোনো কার্যক্রমই শুরু করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। এর দৃষ্টিনন্দন চত্বর এলাকা সন্ধ্যায় মাদকসেবীদের নিরাপদ আখড়ায় পরিণত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাওর-ভাটি হিসেবে পরিচিত ভিন্ন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের জলাভূমি হাওরের উন্নয়ন ও হাওরবাসীর জীবনমানের উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠনের নির্দেশনা দেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৭ সালে ‘বাংলাদেশ হাওর উন্নয়ন বোর্ড’ গঠিত হয়। ১৯৮২ সালে তখনকার সরকার প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত করে। ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’ নামে পুনর্গঠিত করেন। ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর মন্ত্রিসভায় বোর্ডটিকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটিকে ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর’ নামে প্রজ্ঞাপন জারি করে। হাওরের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা, বন্যা ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিকল্পে ২০১৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সুনামগঞ্জে অধিদপ্তরের আঞ্চলিক অফিস উদ্বোধন করেন। তবে উদ্বোধনের পর কোনো কাজে আসতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। তৃতীয় তলাবিশিষ্ট অফিসটির নিচতলা অফিস সহায়ক ও নিরাপত্তারক্ষীদের আবাসকক্ষ এবং তৃতীয় তলা গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় তলা সার্বক্ষণিক তালাবদ্ধ থাকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাঝেমধ্যে এলে এক দিনের জন্য খোলা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিদপ্তরের পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) মো. নাজমুল আহসানকে সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে শুরু থেকেই। সর্বশেষ মে মাসে একবার এসেছিলেন তিনি।

গত বুধবার দুপুরে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরে অধিদপ্তরের গিয়ে দেখা যায়, অফিসে প্রবেশের কলাপসিবল গেট তালাবদ্ধ। ডাকাডাকি করার পর সাংবাদিক পরিচয় দিলে গেট খুলে দেন নিরাপত্তাকর্মী মো. আব্বাস উদ্দিন। এ সময় অফিস সহায়ক ইয়াসিন শেখও এগিয়ে আসেন। তাঁরা জানান, লোকবল না থাকায় তাঁরা ভবনটি শুধু পাহারাই দিচ্ছেন। জানা গেছে, অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী আবুল কালাম আজাদ মাঝেমধ্যে আসেন। বর্তমানে অফিস সহায়ক ও নিরাপত্তারক্ষীই অফিস পাহারা দেন। মাদকসেবীদের ভয়ে তাঁরা অফিসের প্রবেশপথের কলাপসিবল গেট বন্ধ করে রাখেন সার্বক্ষণিক। গত ৪ রমজান রাতে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় অফিসের জানালার কাচ ভেঙে তাদের হুমকি-ধমকি দিয়ে যায় মাদকসেবীরা। এ ঘটনায় নিরাপত্তাপ্রহরী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। তাঁরা জানান, অফিস পরিচালনার জন্য তাঁদের কোনো কাজ নেই। তাই ভবন পাহারার কাজই করছেন তাঁরা।

মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘হাওরাঞ্চলের সার্বিক কৃষি ও উন্নয়নের সমন্বয়, গবেষণা ও নিরীক্ষাই মূলত এই অফিসের কাজ। সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক অফিসে ১৮ জন কর্মীর মধ্যে আছেন মাত্র দুজন। কোনো কর্মকর্তা নেই। তাই এখানে অফিস উদ্বোধনের পর থেকে আমাদের তেমন কাজ হচ্ছে না।’

‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আমাদের কোনো কাজে লাগছে না শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর ভবন। যে লক্ষ্যে সরকার প্রতিষ্ঠানটি চালু করেছিল তার কোনো সুফল পাচ্ছে না জেলার মানুষ।’ অবিলম্বে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠান চালুর দাবি জানান তিনি।

হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক অফিসের পরিচালক (অতিরিক্ত) মো. নাজমুল আহসান বলেন, ‘আমাদের লোকবল একেবারেই নেই। এই প্রতিষ্ঠান মূলত হাওর জলাভূমির প্রকৃতি-পরিবেশ-কৃষি ও উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা ও সমীক্ষা করবে। আমরা সীমিত জনবল দিয়েই এই কাজ করছি। সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে গতিশীল করতে লোকবল নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে।’

 



মন্তব্য