kalerkantho


তাড়াইল

রতনের ঋণ সন্ত্রাস

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



রতনের ঋণ সন্ত্রাস

মহিউদ্দিন ভূঁইয়া রতন

একবার ঋণ নিলে মাসে মাসে সুদ দিতে হয়। এরপর মূল টাকা পরিশোধ করলেও ঋণমুক্তি ঘটে না। কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে মো. মহিউদ্দিন ভূঁইয়া রতনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে নিঃস্ব হয়েছে তিনটি পরিবার। রতন তাড়াইল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া কাঞ্চনের বড় ভাই।

সাবু নিয়োগী, সুশীলা রানী সূত্রধর ও রেখা বেগম। তাঁরা সবাই তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। সবার বয়স ৫০ পেরিয়েছে, চাকরিও শেষের দিকে। এ অবস্থায় তাঁরা ঋণের জালে জড়িয়েছেন।

সাবু নিয়োগী স্ত্রী-সন্তান নিয়ে হাসপাতাল কোয়ার্টারে থাকেন। কম বেতনের চাকরি করেন বলে দারিদ্র্য ঘোচেনি। প্রায় দুই বছর আগে ঝাড়ুদার সাবু বিপদে পড়ে ৩৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন রতনের কাছ থেকে। এই ঋণ পেতে সই করে একটি খালি চেক দিয়েছেন। সুদসহ সব টাকা পরিশোধের পরও গত মাসে রতন ৩৬ লাখ টাকা দাবি করে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন। এ নোটিশ পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন সাবু। তিনি অভিযোগ করেন, ‘ব্যাংকের চেক বইসহ সব কাগজপত্র নিয়ে গেছে রতন। চেকসহ অনেক কাগজে সইও রাখা হয়েছে আমার কাছ থেকে।’

সাবু নিয়োগী জানান, মাসে তিন হাজার টাকা করে গত দেড় বছর সুদ দিয়েছেন। আসলও পরিশোধ করেছেন। তবু তাঁর নামে উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তাঁকে কয়েক মাস আগে টাকার জন্য ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দুই দিন আটকে রাখার পর তাঁর স্ত্রী হাতে-পায়ে ধরে তাঁকে মুক্ত করে আনেন। এখন মামলার ভয় দেখানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে একসঙ্গে ৩৬ লাখ টাকা চোখেই দেখি নাই।’ তবে রতন ভূঁইয়ার পক্ষে তাঁর আইনজীবী ফরিদ উদ্দিন আহমেদ সুমনের পাঠানো উকিল নোটিশে বলা হয়, গত ৬ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসা ও জমি কেনার প্রয়োজনে তাঁর মক্কেলের কাছ থেকে ৩৬ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। সাবুর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, তাদের ওপর নানাভাবে চাপ দিয়ে বলা হচ্ছে, প্রয়োজনে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে পেনশনের টাকায় ঋণ পরিশোধ করতে হবে। উকিল নোটিশ, মামলার হুমকি ও চাকরি ছাড়ার চাপ নিয়ে সাবুর পরিবার এখন দিশাহারা।

স্বামীহারা সুশীলা রানী সূত্রধর তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝাড়ুদারের চাকরি করেন। উপজেলা সদরের সাচাইল গ্রামে ছোট একটি ভাড়া বাসায় একা থাকেন। সংসারে তিন ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেগুলো বিভিন্ন জায়গায় থাকে। মায়ের খোঁজখবর নেয় না। ছেলে রঞ্জন সূত্রধরের চাকরির ব্যবস্থা করতে ওই লোকের কাছ থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি।

সুশীলা জানান, ৬৭ হাজার টাকা সুদ দেওয়ার পর তিনি আর টাকা দিতে পারছিলেন না। পরে গত আশ্বিনে ব্যাংক থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা তুলে এক লাখ টাকা নিয়ে তাঁর কাছে গিয়েছিলেন। এই এক লাখ টাকা নিয়ে তাঁকে ঋণ থেকে মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তাঁকে ধমক দিয়ে রতন বলেন, ‘নাহ, এভাবে আমি টাকা নেব না। আমারে এক সাথে ৪২ লাখ টাকা দেওন লাগব।’ তিনি তখন বলেন, ‘চাকরি যদি ছাইড়াও দেই, তাতেও ৪২ লাখ টাকা অইত না।’

অন্যদিকে সাচাইল ভূঁইয়াপাড়ায় থাকেন তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কুক-মশালচি রেখা বেগম (৫৩)। তিনি রতন ভূঁইয়ার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ধার করেছিলেন। সুদসহ পরিশোধ করেছেন এক লাখ টাকা। ব্যাংকের একটি চেকও দিয়েছিলেন তিনি। এখন ৩৮ লাখ টাকার উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে তাঁর নামে। এই নোটিশ পেয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। স্বামী তাহের উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। এখন কী করবেন বুঝতে পারছেন না। তিনি রতন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাকে সে চাকরি ছেড়ে পেনশনের টাকা দিতে দিতে নানাভাবে চাপ দিচ্ছে।’ স্থানীয় লোকজন জানায়, রতনকে তাড়াইলের সবাই সুদের কারবারি হিসেবে চেনে। দীর্ঘদিন তিনি এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি ব্যাংকের চেক ছাড়া কাউকে ঋণ দেন না। সমস্যা হলে ওই চেক দিয়ে প্রতারণার মামলার ভয় দেখান। প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাড়াইলের এক গণমাধ্যমকর্মী বলেন, শুধু রতন না, এ রকম আরো বেশ কিছু লোক রয়েছে, যারা তাদের সাধারণ ব্যবসার আড়ালে সুদের ব্যবসা করছে। তাড়াইল বাজারের খলিফাপট্টিতে রতনের মসলার মিল রয়েছে। কিন্তু এটি তাঁর মূল ব্যবসা না, আসলটি হলো সুদের ব্যবসা।

এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মহিউদ্দিন ভূঁইয়া রতনকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি মোবাইল ফোনে বলেন, ‘এগুলো মিথ্যা। আমি যাদের নামে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছি তাদের কাছে টাকা পাই। এখানে একটি কথা মিথ্যা নয়। ওরাই তো আমাকে চেক দিয়েছে। আমি যে পরিমাণ টাকা দিয়েছি, কেবল সেই পরিমাণ টাকাই ওদের কাছে দাবি করা হয়েছে।’ কথাবার্তার একপর্যায়ে ‘যাক, এসব কথা আর আপনাকে বলব না, যা বলার কোর্টেই বলব।’ বলে সংযোগ কেটে দেন।

তাড়াইল-সাচাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামরুজ্জামান মহাজন বলেন, ‘লোকমুখে ও ফেসবুকে বিষয়টি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল। সেখান থেকে আমি বিষয়টি জেনেছি। ঘটনাটি আমার ইউনিয়নের। কিন্তু কেউ আমার কাছে নালিশ নিয়ে আসেনি। যদি ভুক্তভোগীরা আমার কাছে লিখিতভাবে সহযোগিতা চায়, আমার পক্ষ থেকে সম্ভব সব কিছুই করা হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দুজন অসহায় নারী ও ঝাড়ুদারের কাছে এক কোটি টাকার ওপরে রতন পাবেন, এটা আমি কেন, তাড়াইলের কেউ বিশ্বাস করে না।’


মন্তব্য