kalerkantho


নরসিংদীর ৭০ কোটি টাকার সড়ক প্রকল্প

বিসমিল্লায় গলদ

মনিরুজ্জামান, নরসিংদী   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বিসমিল্লায় গলদ

নরসিংদীর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের বাস্তবায়নে নয়াপুরা-আড়াইহাজার-রায়পুরা-নরসিংদী সড়কের উন্নয়নে মাটি ভরাটের জন্য টাকা বরাদ্দ থাকলেও ঠিকাদার সড়কের পাশের রেলের জায়গা থেকে মাটি তুলে নিচ্ছেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

৭০ কোটি টাকার প্রকল্প। অথচ বিসমিল্লায় (শুরু) গলদ দেখা যাচ্ছে। নরসিংদীর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অধীন নয়াপুরা-আড়াইহাজার-রায়পুরা-নরসিংদী সড়কের বটতলা থেকে কলাগাছিয়া অংশের প্রশস্ত ও মজবুত কাজে এ অনিয়ম হচ্ছে। গত ২৪ জানুয়ারি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) নজরুল ইসলাম প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন।

সওজ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নয়াপুরা-আড়াইহাজার-রায়পুরা-নরসিংদী সড়কের রায়পুরা থেকে নরসিংদীর বটতলা সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। বটতলা থেকে কলাগাছিয়া পর্যন্ত সড়কটি স্থানীয়ভাবে নরসিংদী-মদনগঞ্জ রেললাইন হিসেবে পরিচিত। আগে এ সড়কটি রেললাইন ছিল। পরে রেললাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সওজ এ অঞ্চলের মানুষের চলাচলের জন্য একটি সড়ক নির্মাণ করে, যা ১৮ ফুট প্রশস্ত। তবে অধিগ্রহণ না করায় সড়কের জায়গা বর্তমানে রেল কর্তৃপক্ষের নামেই রয়েছে। সম্প্রতি সড়কটির ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদী থেকে বাইপাস সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর গুরুত্ব বেড়ে যায়। এর প্রশস্তকরণ জরুরি হয়ে পড়ে। তাই সওজের তত্ত্বাবধানে এই সড়কের বটতলা থেকে কলাগাছিয়া (নরসিংদী অংশ) পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার প্রশস্ত ও মজবুতকরণের জন্য দরপত্র ডাকা হয়। এর মধ্যে ৬৯ কোটি ২৫ লাখ ৪০ হাজার টাকায় কাজটি পায় র‌্যাব আরসি প্রাইভেট মেসার্স সালেহ আহমেদ মেসার্স রিজভী কনস্ট্রাকশন নামের একটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজটি সম্পন্ন করতে ঠিকাদার স্থানীয় মীর মোরশেদ ও নুরুল ইসলাম নামের দুই উপঠিকাদার নিয়োগ দেয়।

গত ২৪ জানুয়ারি থেকে সড়ক উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। উন্নয়ন বরাদ্দের মধ্যে প্রশস্তকরণে দুই পাশে মাটি ভরাটের জন্য ব্যয় ধরা হয় সাড়ে ছয় কোটি টাকা, যা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নতুনভাবে মাটি ফেলে ভরাটের কথা দরপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার সড়কের দুই পাশ থেকে রেলওয়ের জমি থেকে গভীরভাবে গর্ত করে মাটি তুলে প্রশস্ত করেছে। এতে সড়কটি কতটুকু মজবুত হবে এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

ধামের বাওলার আবদুর রহমান বলেন, ‘যেইভাবে গাতা (গর্ত) কইরা মাটি তুলছে তাতে রাস্তা বেশিদিন টিকব না। কারণ গাতাগুলো তো আবার রাস্তার মাটি দিয়াই ভরাট হইব। তো রাস্তা থেকে মাটি সইরা গেলে রাস্তা বেশিদিন টিকব? ফাঁক দিয়া রাস্তার ক্ষতি হইব।’

গণেরগাঁওয়ের কামাল মিয়া বলেন, ‘বর্ষায় এই গণেরগাঁও চকে (মাঠে) অনেক পানি ওঠে। রাস্তার পাশ থেইকা মাটি তুললে রাস্তা টিকব না। বর্ষাকালে ভাইঙ্গা লইয়া যাইব। আর সম্ভব যদি গাইড ওয়াল দেয়।’

বানিয়াদির তোতা মিয়া বলেন, ‘রাস্তার দুই পাশ থেকে মাটি উঠানের কথা আমরা এলাকাবাসী জিগাইছিলাম তারা উল্টা খারাপ আচরণ করছে। বলে, আপনাদের রাস্তা হইলেই হলো, এত কিছু দিয়া আপনারা কী করেন? আমাদের রাস্তার মাটি যেখান থেকে খুশি সেখান থেকে নিয়া আসব।’

এ বিষয়ে ঠিকাদার নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি জায়গার মাটি সরকারি রাস্তায় ভরছি, তাতে সমস্যা কোথায়? দরপত্রে মাটি ভরাটের অর্থ বরাদ্দ সাড়ে ছয় কোটি না আরো বেশি হতে পারে সেটা আমরা বুঝব। ঠিকাদারি ব্যবসা করছি তো আর নতুন না।’ এটা কোনো অনিয়মের মধ্যে পড়ে না উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘আমি দরপত্রটরপত্র বুঝি না, আমার নিয়মেই রাস্তা হবে।’

নরসিংদী পৌর মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘আমি দেখেছি যে সড়কের পাশ থেকে মাটি তুলে একেবারে খাল বানিয়ে ফেলেছে। সড়কের যে অংশটুকুতে অনিয়ম হচ্ছে সেটুকু পৌর এলাকার মধ্যে না। তার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সওজ কর্মকর্তাকে বলব।’

রেলওয়ের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (পূর্ব) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘রেলওয়ে সড়ক নির্মাণের জন্য সওজকে ৪০ ফুট প্রশস্ত করে জমি বরাদ্দ দিয়েছে। এখন যদি জমি থেকে তাঁরা মাটি উত্তোলন করে সড়ক প্রশস্ত করে, তাহলে এটা অন্যায়। ওনারা তো বাইরে থেকে মাটি এনে ভরাট করবে। আমি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

সওজ নরসিংদী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কাজ শেষ হওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তিন বছর এর দেখভাল করবে। আমিও দেখেছি যে সড়কের দুই পাশে রেলের জায়গা থেকে মাটি উত্তোলন করা হয়েছে। সব জায়গায় ফসল লাগানোর কারণে মাটি পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই ঠিকাদাররা দুই পাশ থেকেই মাটি উত্তোলন করেছে বলে আমাকে জানিয়েছে।’

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তাঁরা যদি সড়কের দুই পাশ থেকে মাটি উত্তোলন করে থাকে, তবে সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ। একজন ঠিকাদার নিয়ম অনুযায়ী তা করতে পারেন না। বর্তমান সরকার যেকোনো সড়ক উন্নয়ন, বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে এর দীর্ঘস্থায়ী মজবুতকরণের জন্য অতিরিক্ত পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে। যাতে অন্যত্র থেকে মাটি এনে উন্নয়নকাজ করতে পারে। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’


মন্তব্য