kalerkantho


দোহারে নৌ পুলিশের চাঁদাবাজি

‘টেকা না থাকলে কয়, তেল দে’

দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘টেকা না থাকলে কয়, তেল দে’

চলছে দোহার নৌ পুলিশের চাঁদাবাজি। ছবিগুলো গত বৃহস্পতিবার মৈনট ঘাট এলাকার পদ্মা নদী থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘প্রতিদিন দোহারের মৈনট নদী দিয়া পাবনা থিকা বালু নিয়া বিভিন্ন জায়গায় যাই। কিন্তু নদীতে যে পুলিশ থাকে, তারা সব বডি (বাল্কহেড) থিকা প্রতিদিন ২০০ কইরা টেকা নেয়। টেকা কাছে না থাকলে কয়, তেল (জ্বালানি) দে। না দিলে খারাপ ব্যবহার করে, মারতে আহে। আবার অনেক নৌকায় কাগজপত্র দেহার কতা কইয়া ৫০০ থিকা ২০০০ টেকা পর্যন্ত নেয়।’

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১১টায় এ প্রতিবেদকের মোবাইল ফোনে কল করে এক নৌযানচালক এ অভিযোগ করেন। তিনি পত্রিকায় নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

এই তথ্যের সূত্র ধরে গত বৃহস্পতিবার ভোর থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দোহার উপজেলার মৈনট ঘাট এলাকার পদ্মা নদীতে অবস্থান করেন এ প্রতিবেদক। তাঁর ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ে পদ্মার বুকজুড়ে নৌ পুলিশের চাঁদাবাজির দৃশ্য। মৈনট ঘাট এলাকার একটু সামনে থেকে নদীর বিলাসপুর অংশ পর্যন্ত চলে এই নৈরাজ্য। পুলিশ সদস্যরা ইঞ্জিনচালিত ছোট ট্রলার নিয়ে পদ্মা নদী দিয়ে নানা গন্তব্যে যেতে থাকা বালু ও পণ্যবাহী প্রতিটি ট্রলারে নির্বিঘ্নে টাকা তুলছে। এমন চিত্রও দেখা যায় যে ট্রলার মালিক চাঁদা তোলার বিষয়টি জানার কারণে আগে থেকে টাকা হাতে নিয়ে রেখেছেন। আর নৌ পুলিশ ট্রলার নিয়ে আসামাত্র তা তুলে দিচ্ছেন তাদের হাতে।

স্থানীয়রা জানায়, গত বৃহস্পতিবার নদীতে ট্রলার নিয়ে চাঁদাবাজিতে মত্ত ছিলেন দোহারের কুতুবপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল মো. ইমাম ও মো. রফিকুল ইসলাম। ওই ফাঁড়ির আটজন সদস্য পালাক্রমে নদীতে নামেন চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হয়ে নির্বিঘ্নে চলে রাত পর্যন্ত।

কথা হয় পাবনা থেকে মৈনট ঘাটে বালুবাহী বাল্কহেড নিয়ে আসা চালক শেখ আবুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পুলিশ মাঝ নদীতে আহে নৌকা নিয়া। টাহা না দিলে থানায় নিবার চায়, বাইরা ব্যার আসে। দিনরাইত এই টাহা নেয় ওরা। যে বোটই ধরুক কমপক্ষে ২০০ টাহা নিব। আর বোট বড় আর মাল বেশি দেখলে ১০০০ টাহা। টাহা না থাইকলে তেলের গ্যালন ধইরা লইয়া যায়। টাহা না দিলে কেইস কইরবার চায়। বলে কাগজপত্র দে। ধইরা নিবার চায়। কয়, চল, থানায় যাই।’

একই সুরে কথা বলেন বালু শ্রমিক ফালু মিয়া, ‘আমরা বিদেশি মানুষ, টাহা না দিলে মাইরধইর করে পুলিশে। কয়, বোট ঘাটে ভিড়া। এক হাজার টাহা নিয়া গেল কাইলকা। টাহা না দিয়া নদী দিয়া যাওন যাইব না, কোনো আপিল নাই। না দিলে জোর-জুলুম কইরা নিব।’

পাবনার বেড়া উপজেলা থেকে বালু নিয়ে আসা ট্রলার শ্রমিক হালিম কাজী বলেন, ‘পুলিশে বলে, তোমাগো থিকা টেকা নেই তো তোমাগো ভালোর জন্যে, আমরা তোমাগো পাহারা দেই। গাঙ্গের মইধ্যে কোন চোর-চোট্টা আর ছেবলা তোমাগো যেন ধরবার না পারে তার সহায়তা করি।’

পাবনা থেকে মৈনট ঘাটে বালু নিয়ে আসা মো. রমজান বলেন, ‘আমাগো যেই কষ্টের টাহা ওরা নেয়, তাতে গতর জইল্যা যায় ভাই। বউ-পোলাপান রাইখ্যা রাইতভর কষ্ট কইরা বালু টানি আর নামাই। হেই কষ্টের টাহা পুলিশে নিয়া যায় জোর-জুলুম কইরা। হেরাই নদীর মস্তান, যা কইবে তাই শোনা লাইগবে। এর আগে বোট নিয়া আইছি টাহা দিবার চাই নাই দেইখ্যা পুলিশে বোট ঘাটে ভিড়াইয়া সব স্টাফ ধইরা দোকানে নিয়া গেছে। পরে এক হাজার টাহা দিয়া ছাড়া পাইছি। এইভাবে জোর-জুলুম কইরা টাহা-পয়সা নিলে আমরা গরিব মানুষ চলুম কেইমনে?’

স্থানীয়রা জানায়, পদ্মা নদীর মৈনট ঘাট দিয়ে পাবনা, রাজশাহী, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পণ্য, বালু, সিমেন্ট ও তেলবোঝাই জাহাজ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করে। নৌযানের আকার ও মালের ধরন দেখে প্রতিটি নৌযান থেকে ২০০ থেকে ২০০০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে পুলিশ। শ্রমিক ও চালকদের অভিযোগ, সবচেয়ে বেশি চাঁদা দিতে হয় পুলিশকেই।

এ বিষয়ে কথা বলতে মৈনট ঘাটের পাশে অবস্থিত কতুবপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মিজানুর রহমানের কার্যালয়ে গেলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর অবর্তমানে ফাঁড়ির দায়িত্বে ছিলেন এএসআই আলমগীর হোসেন।

তিনি জানান, মিজানুর রহমান দেশের বাড়িতে। নদীতে টাকা তোলার বিষয়টি জিজ্ঞাসা করতেই তিনি গুলিয়ে যান। প্রতিবেদককে সংবাদটি না প্রকাশ করার জন্য শুরু করেন বিভিন্ন কায়দার তোষামোদি। প্রতিবেদককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ভাই, একটু তো হয়ই, না করলে চলব কিভাবে? প্রতিদিন সরকার যে ছয় লিটার তেল দেয় তাতে হয় না। কী করব বলেন?’



মন্তব্য