kalerkantho


বনদস্যুদের সরকারের সাধারণ ক্ষমা

জঙ্গল থেকে জীবনে

মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সুন্দরবনের জীবজন্তুসহ বনজীবীদের মূর্তিমান আতঙ্কের নাম মজনু গাজী। বনদস্যু মজনু বাহিনীর প্রধান তিনি। তাঁর দলের সদস্যসংখ্যা ৪০-৪২ জন। বনাঞ্চলে মজনুর নাম শুনলে বাঘে-মহিষে যেন এক ঘাটে জল খেত। তা খুব বেশি দিনের কথা নয়। দস্যুদের হাতে নিঃস্ব হয়ে প্রতিশোধ নিতেই ভয়ংকর ডাকাত হয়ে ওঠেন মজনু। দস্যুতা শুরু করার আগে কঠিন হৃদয়ের এ মানুষটির বড় কোনো স্বপ্ন ছিল না। শুধু দুবেলা-দুমুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন।

মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সাতক্ষীরার মজনু গাজী। গহিন সুন্দরবনে জেলেদের কাছ থেকে পাইকারি দরে মাছ কিনে স্থানীয় হাট-বাজারে খুচরা বিক্রি করে সংসার চালাতেন। জেলেদের কাছে মাছ না মিললে নিজেই মাছ শিকার করে বিক্রি করতেন মজনু। মাছ ব্যবসায় মজনু গাজীর ধারাবাহিক লাভের খবর জানতে পেরে তাঁর ওপর অত্যাচার শুরু করে বনদস্যুরা। তাদের চাঁদা দিতে দিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় দুইবার অপহরণ হন ওই সময়ের বনদস্যু আক্কাস বাহিনীর হাতে। জীবন বাঁচাতে চাঁদা পরিশোধ করে বাড়ি ফিরতে তাঁর সব লাভের টাকা শেষ হয়ে যায়।  ২০০৬ সালে শেষবার যখন অপহূত হয়েছিলেন, মুক্তিপণ দিয়ে ফেরার পর আর্থিক সংকটে আর ব্যবসা দাঁড় করাতে পারেননি। বিভিন্ন সমিতি ও সুদখোর মহাজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঋণে জর্জরিত হয় পড়েন। পাওনাদের তাড়নায় পালিয়ে থাকার মতো অবস্থা হয়।

প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে নিজেই গঠন করেন বনদস্যু গ্রুপ। ৪০-৪২ জন সদস্য নিয়ে গড়া এ গ্রুপের নাম হয়ে ওঠে মজনু বাহিনী। অবৈধ পথে সংগ্রহ করা অস্ত্রের ঝনঝনানির মুখে সবাই তাদের ভয় পেতে শুরু করে। প্রায় এক দশক দাপিয়ে বেড়িয়েছে গোটা সুন্দরবনে। প্রতিদ্বন্দ্বী বনদস্যু বাহিনী, পুলিশ, কোস্ট গার্ড বা র‌্যাবের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধেও জড়িয়েছে একাধিকবার। নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন কয়েকবার। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে স্বজনদের সান্নিধ্য ছাড়াই ১০ বছর নিঃসঙ্গতায় পার করেছেন।

সেই ভয়ংকর বনদস্যু মজনু এখন স্বাভাবিক জীবনে। আত্মসমর্পণের পর সরকারের সাধারণ ক্ষমায় তাঁর জীবনে নতুন আলোর রেখা দেখা দিয়েছে। মজনু এখর আর সুন্দরবনের ত্রাস নন। তিনি আবার মাছ ব্যবসা শুরু করেছেন।

আত্মসমর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া অনুদান নিয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের মৌখালীতে চুনা নদীর চরে গড়ে তুলেছেন শুঁটকির খুঁটি (শুঁটকিপল্লী)। গত শুক্রবার দুপুরে কথা হয় মজনু বাহিনীর প্রধান মজনু গাজীর সঙ্গে। দস্যুজীবনের নানা ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখন অনেক ভালো আছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার বাহিনীতে ৪০-৪২ জন সদস্য ছিল। অস্ত্র ছিল ৬০ থেকে ৬৫টি।

দস্যুজীবনে বনদস্যু হাফিজ, নুর আলম, হবিবুর, খয়লারকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের মুখোমুখি বন্দুকযুদ্ধ করেছি কয়েকবার। কখনো জিতেছি, কখনো বা পালিয়েছি। ২০০৮ সালে একবার সুন্দরবনের নিশানখালীতে সম্মুখযুদ্ধে আমার হাতে ও গলায় গুলি লাগে। ২০১৪ সালের দিকে র‌্যাবের তৎপরতা বেড়ে গেলে মৃত্যুভয়ে ভারতে আত্মগোপন করি। তখন ভাবতাম বেশি দিন বোধ হয় বাঁচব না। পরে আবার যখন বনে ফিরি তখনই এক সাংবাদিকের কাছ থেকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাই। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। আত্মসমর্পণ করিয়ে সরকার আমাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ হতো। মরি কি বাঁচি—এসব না ভেবে বিশ্বাস করেই আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু না, তিনি কথা দিয়ে কথা রেখেছেন। আত্মসমর্পণের পর এখন প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেক বছর বাঁচতে ইচ্ছে করছে।’

মজনু আরো বলেন, ‘পরিস্থিতির শিকার হয়ে দস্যুজীবনে প্রবেশ করলেও সব সময় চাইতাম স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। জীবনের মায়া ছিল না, তাই মনের ওপর জোরও ছিল না। অবশেষে অপেক্ষার প্রহর গোনা শেষ হয় ২০১৬ সালে। মোংলায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে আট মাস জেলে ছিলাম। তারপর জামিন পেলে সরকার প্রত্যেককে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়। অনুদানের টাকা পেয়ে আমি, আমার দলের এনামুল, বাবু ও খোকন চিন্তা করতে থাকি কী করা যায়। তারপর চারজনের টাকা দিয়ে শুরু করলাম শুঁটকির ব্যবসা। এখন আমাদের শুঁটকির খুঁটিতে আটজন কর্মচারী কাজ করছেন। জেলে রয়েছে ৫০-৬০ জন। তাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা দিয়ে মাছ কিনি। আর এই মাছ শুকিয়ে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। কিছু কাঁচা মাছ খুলনায় যায়। সব মিলিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব ভালো আছি।’

মজনু গাজী সরকারের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আত্মসমর্পণের পর মামলা চালানোর সক্ষমতা না থাকায় এখনো অনেক দস্যু জেলে রয়েছে। সরকারের কাছে দাবি, তাদের মামলার বিষয়টি বিবেচনা করে মুক্তজীবন খুঁজে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।’


মন্তব্য