kalerkantho


ছোট যমুনার বড় ক্ষতি

আলমগীর চৌধূরী, জয়পুরহাট   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ছোট যমুনার বড় ক্ষতি

জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার চেঁচড়া গ্রামে ছোট যমুনার বুকে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। ইনসেটে নদীতে আড়াআড়ি বালু ব্যবসায়ীদের সড়ক ও সেতু। ছবি : কালের কণ্ঠ

নিয়ম-নীতি ও প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি উপজেলার ছোট যমুনা নদী এবং এর আশপাশের ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নদীর বুকে ড্রেজার ও ফসলি জমিতে মেশিন বসিয়ে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সংগৃহীত বালু ট্রাকে ট্রাকে বিক্রি করছে প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীরা। এমনকি তারা নদীর পাড় থেকেও লুট করছে বালু। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে জেলার জীববৈচিত্র্য, ফসলি জমি ও বেশ কিছু স্থাপনা। জয়পুরহাট সদর উপজেলার চকশ্যাম, দুয়ানীঘাট, ছাওয়ালপাড়া, মাধবের ঘাট; পাঁচবিবির চেঁচড়া, বাগজানা, কোকতারাসহ বেশ কিছু এলাকা ঘুরে বালু উত্তোলনের এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে।

জেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট যমুনা নদীতে ১৪টি সরকারি বালুমহাল রয়েছে। নীতিমালা মেনে চলতি মৌসুমে এসব বালুমহালের মধ্যে দরপত্রের মাধ্যমে ১১টি ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শর্ত মোতাবেক টাকা পরিশোধ না হওয়ায় জয়পুরহাট সদরের দোয়ানী-কুটিবাড়ী, পাঁচবিবি উপজেলার মাধবের ঘাট ও মৃধাপাড়া বালুমহাল বন্ধ করে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ভূমি অফিস কর্তৃপক্ষ।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার চকশ্যাম গিয়ে দেখা গেছে, ওই এলাকার ফসলের জমি থেকে বালু বিক্রি করা হচ্ছে। তখনো পাঁচ-ছয়টি মেসিতে (ট্রাকজাতীয়) বালু ভরা হচ্ছে। প্রতি মেসি বালুর দাম নেওয়া হচ্ছে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকা। প্রতিদিন ওই এলাকা থেকে ৫০-৬০ মেসি বালু বিক্রি করা হয়। জমি থেকে বালু তোলার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা ৮-১০ ফুট নিচু হয়ে গেছে। ফলে পাশের ফসলি জমি সহসাই ভেঙে যাচ্ছে।

এ সময় কথা হয় জয়পুরহাট শহরের সাহেবপাড়া গ্রামের বালু ব্যবসায়ী জাকির হোসেনের সঙ্গে। তিনি দাবি করেন, জমি ইজারা নিয়ে সেখানকার বালু বিক্রি করছেন। তবে এটা সরকারি কোনো বালুমহাল নয় বলেও জানান তিনি। জাকির হোসেন আরো জানান, তিনি বর্তমানে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

চকশ্যামের পাশে জিতারপুর এলাকায় দেখা গেছে, ছোট যমুনার পাড় কাটা হয়েছে। তা ছাড়া সেখানকার ফসলের জমি থেকেও মাটি কাটার মেশিন দিয়ে বালু কেটে নেওয়া হচ্ছে। কারণ জানতে চাইলে মেশিনচালক আমজাদ হোসেন জানান, কুসুম নামের এক ব্যক্তির নির্দেশে তিনি মাটি কাটছেন। এ সময় কুসুমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দোগাছি ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া হোসেন ওই জায়গা থেকে মাটি বিক্রি করেছেন। পরে যুবলীগ নেতা জাকারিয়া হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই ওই জমি থেকে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে। এ সময় তিনি প্রশাসনের অনুমতিপত্র দেখানোর জন্য সময় নিয়েও আর আসেননি।

এদিকে পাঁচবিবি উপজেলার কোকতারা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট যমুনায় গিয়ে দেখা গেছে, নদীর বুকে অস্থায়ী সেতু তৈরি করে নদীর পাড় কেটে বালু নিচ্ছেন ওই এলাকার রতন, আজাদ ও দিলদার। সেখানে দেখা মেলে জাকির হোসেনের সঙ্গে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি নদীর পাড় হলেও জায়গাটি তাদের পৈতৃক। তাঁর বাবা জাহেদুল, চাচা জয়বর ও আবু সাইফুল এ জমির মালিক। বালু ব্যবসায়ী রতন, আজাদ ও দিলবর তাঁদের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে এখানকার বালু বিক্রি করছেন।’ এ বিষয়ে বালু ব্যবসায়ী রতন জানান, তাঁরা তিনজন মিলে বৈধভাবে জমি ইজারা নিয়ে বালুর ব্যবসা করছেন। তবে এ প্রসঙ্গে কোকতারা গ্রামের আব্দুল বারিক বলেন, ‘নদীর পাশে সরকারি জায়গায় প্রচুর গাছ ছিল। তা বৈধভাবে ইজারা নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। পরে সেখান থেকে স্থানীয় প্রভাবশালীরা বালু উত্তোলন করায় গাছসহ জায়গা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

পরে পাঁচবিবি উপজেলার আটাপাড়ার চেঁচড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নদীর তলদেশে মেশিন বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। জানতে চাইলে সেখানকার দায়িত্বে থাকা মশিউর রহমান নামের এক যুবক জানান, পাঁচবিবি উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মিননুর রহমান ঘাটটি ইজারা নিয়ে বৈধভাবে বালু বিক্রি করছেন। তিনি মশিউরকে এটা দেখাশোনার জন্য নিয়োগ দিয়েছেন। তবে জয়পুরহাট জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখা থেকে সরবরাহ করা বালুমহালের তালিকায় চেঁচড়া বালুমহালের কোনো নাম পাওয়া যায়নি।

বাগজানা কুটাহারা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি সদস্য ইসমাইল হোসেন জানান, ছোট যমুনা নদীর পাশে তাঁর মুরগির খামার রয়েছে। ওই নদী থেকে বোরিং করে বালু তোলার কারণে তাঁর খামারের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে ওই এলাকার বেশ কিছু জমি হুমকির মুখে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ জন মিলে বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে দরখাস্ত করেছেন।

নদী ও জমি থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে যুবলীগ নেতার সম্পৃক্ততার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা যুবলীগের সভাপতি সুমন কুমার সাহা বলেন, ‘যুবলীগের কয়েকজন নেতা বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে তাঁরা বৈধভাবে ইজারা নিয়েই এ ব্যবসা করছেন।’

জেলা প্রশাসক মো. মোকাম্মেল হক বলেন, ‘বালুমহাল ইজারা নিলেও বোরিং করে কেউ বালু উত্তোলন বা বিক্রি করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। অন্যদিকে জমি থেকে বালু উত্তোলন বা বিক্রির ক্ষেত্রেও প্রশাসনের অনুমতির প্রয়োজন।’ এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে অবৈধ বালু ব্যবসা এর আগেও বন্ধ করা হয়েছে। এখন যদি কেউ আবারও তা শুরু করে, তাহলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


মন্তব্য