kalerkantho


হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ

তলা কেটে ওপরে ঢালা

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তলা কেটে ওপরে ঢালা

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার মারকুলিতে নির্মাণ করা হচ্ছে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ। বাঁধের গোড়া থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। এতে এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

একটি বাঁধের গোড়া থেকে মাটি কেটে ওপরে ফেলা হচ্ছে। অন্যটিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সড়কে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) নীতিমালা বদলিয়েও হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজে স্বচ্ছতা আনতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে নীতিমালা মানা হয়নি। এতে সরকারের অর্থ অপচয়সহ দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর সুনামগঞ্জের প্রায় অর্ধ শতাধিক হাওরের ফসল রক্ষার জন্য সরকার প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এরই মধ্যে ৬৮ কোটি টাকার বেশি ‘কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি’র সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে গঠিত চূড়ান্ত পিআইসি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা থাকলেও সম্ভাব্য তালিকা পাঠানো হয়েছিল। সেসব প্রকল্প থেকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে প্রায় শতাধিক প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ৮১২টি পিআইসি চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এই চূড়ান্ত পিআইসির তালিকা এখনো পাউবোতে পাঠাননি ইউএনওরা। এ নিয়ে চলছে লুকোচুরি। অভিযোগ রয়েছে, গণশুনানি না করে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানদের মনোনীত কমিটি দিয়ে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পিআইসিতে ইউপি চেয়ারম্যান নেই।

অভিযোগ রয়েছে, ইউএনও চেয়ারম্যানদের প্রকল্প তৈরির একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়েছেন। এ সুযোগে তারা হাওরের ফসল রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নেই এমন একাধিক প্রকল্প নিয়েছেন। এই অনিয়ম পেয়েছেন হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা। তারা প্রতিটি উপজেলায় সরেজমিনে ঘুরে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন জেলা কমিটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে। এ ছাড়া পাউবোর স্থানীয় কর্মকর্তারা নানা অসংগতি ও অব্যবস্থাপনার বিষয়টি লিখিতভাবে তুলে ধরেছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে।

জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, রুটিনকাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন ইউএনওরা। কাবিটা নীতিমালায় প্রতিটি উপজেলায় তাদের সভাপতি করে প্রকল্প তৈরি, অনুমোদন ও অর্থ বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রুটিনের বাইরের এই কাজের দায়িত্ব দেওয়ায় হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। গত অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তারা কিছু কাজ করেও পেরে উঠতে পারেননি। ফলে তারা বাধ্য হয়ে ইউপি চেয়ারম্যানদের দিকে দৃষ্টি দেন।

ইউপি চেয়ারম্যানরা সুযোগ পেয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মালিকানাধীন ভালো সড়কও প্রকল্পভুক্ত করে নিয়েছেন। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং, মোহনপুর, লক্ষ্মণশ্রী, কোরবান নগরসহ কয়েকটি ইউনিয়নে এমন প্রকল্পে কয়েক কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মোহনপুর ও গৌরারং ইউনিয়নের ইনাথনগর থেকে বাণীপুর পর্যন্ত যে তিনটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সেটি প্রতিবছর টিআর, কাবিটা ও কর্মসৃজন প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত মুড়ারবন্দ রাশনগরে বর্তমানে কর্মসৃজন প্রকল্পের তিন লাখ ৪৪ হাজার টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এই সড়কের অধিকাংশ স্থানে এলজিইডির পাকা রাস্তা করে দিয়েছে বিভিন্ন সময়ে।

গত তিন দিন দিরাই ও শাল্লা উপজেলার আটটি বাঁধ পরিদর্শন করেন হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা। তাঁরা দেখেন, শুধু অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নয়, অধিকাংশ বাঁধের গোড়া থেকে মাটি কেটে ওপরে ফেলা হচ্ছে। এই বাঁধ বৃষ্টি বা পানি এলে ধসে যাবে।

এদিকে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সাত সদস্যের একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করেছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে পানি উন্নয়ন বোর্ড, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। এই কমিটিকে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধ নির্মাণকাজ সম্পাদনের লক্ষ্যে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, সাত দিন পর পর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর প্রতিবেদন দাখিল, জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের নির্দেশনা দিয়েছে।

হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, ‘আমি গত তিন দিনে দিরাই ও শাল্লা উপজেলার আটটি ফসলরক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করেছি। কোথাও সাইনবোর্ড চোখে পড়েনি। প্রতিটি বাঁধের গোড়া থেকে মাটি কেটে ওপরে ফেলা হচ্ছে, যা ঝূঁকিপূর্ণ।’ তিনি আরো বলেন, ‘হাওরের বাঁধ নির্মাণ এখন ঠিকাদারিতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আমলাতন্ত্রের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে। যেখানে জবাবদিহি নেই।’

গৌরারং ইউনিয়ন পরিষদেরর সাবেক চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে অপ্রয়োজনীয় একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো গণশুনানি হয়নি। চেয়ারম্যান ও ইউএনও মিলে পছন্দের লোককে পিআইসি করেছে। হাওরের ফসল রক্ষার কাজে আসবে না এমন প্রকল্পেও লাখ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এমনকি দুটি পাকা সড়কেও প্রকল্প দেখানো হয়েছে।’

হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সদর উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর বলেন, ‘আমি সদর উপজেলার ৪৮টির মধ্যে ৩০টি প্রকল্প ঘুরেছি। এর বেশির ভাগ প্রকল্পই হাওরের ফসল রক্ষায় কোনো কাজে আসবে না। তবে স্থানীয়রা চলাচলের জন্য উপকৃত হবেন।’

পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী, কাবিটা বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ কমিটির সদস্যসচিব মো. আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, ‘শুক্রবার পর্যন্ত ৯টি উপজেলার চূড়ান্ত পিআইসির তালিকা আমার কাছে পাঠাননি উপজেলা কমিটির সভাপতিরা। আমি তাদের লিখিত চিঠি দিয়েছি। জবাবও দেননি। এ বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত জানিয়েছি।’



মন্তব্য