kalerkantho


পটুয়াখালী

বাঁধাজাল বাধা!

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাঁধাজাল বাধা!

এভাবেই বাঁধাজালে বাঁধা পড়েছে তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরঙ্গ নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট। ছবিটি চরকুকরিমুকরির পশ্চিম পাশের বহমান তেঁতুলিয়া নদী থেকে গত শুক্রবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিস্তীর্ণ জলরাশি। অন্যতম নৌপথ। অথচ যাত্রীবাহী লঞ্চ, নৌকা কিংবা মাছ ধরার ট্রলার চলাচল প্রায় বন্ধ এ পথে। নিষিদ্ধ বাঁধাজাল এভাবেই দখল করে রেখেছে তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরঙ্গ নদীকে। সাগর উপকূলের এই দুই নদী এবং এদের মোহনা বাঁধাজালের দখলে থাকায় প্রতিদিন ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের কয়েক হাজার কোটি রেণু ও পোনা ধ্বংস হচ্ছে। এক শ্রেণির অসাধু মহাজন ও তাদের দাদন নেওয়া জেলেরা বড় মাছের রেণু-পোনা বাঁধাজালের ফাঁদ পেতে ধ্বংস করছে। সরেজমিনে এমন ছবিই পাওয়া গেছে তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরঙ্গ নদীতে।

পটুয়াখালী ও ভোলা জেলার সীমানা নির্ধারণ করেছে তেঁতুলিয়া নদী। নদীর পূর্ব পাশে ভোলা এবং পশ্চিম পাশে পটুয়াখালীর অবস্থান। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া থেকে লঞ্চযোগে ভোলার লালমোহন উপজেলার নাজিরপুর লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণে প্রবহমান তেঁতুলিয়ার বুকে বাঁধাজালের ছড়াছড়ি। নাজিরপুর লঞ্চঘাটের দক্ষিণে পুরো তেঁতুলিয়া নদীতে কয়েক হাজার বাঁধাজাল মাকড়শার জালের মতো পেতে রাখা হয়েছে। যত দূরে চোখ যায়, শুধু বাঁধাজাল। বাঁধাজালের ড্রাম ছাড়া চলমান কোনো নৌযান দেখা যায়নি। আর জালের সংখ্যা গুনে শেষ করা যাচ্ছিল না। নাজিরপুরবাসী জানায়, ১ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ প্রজনন মৌসুমের ওই কয়েক দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও পরে জেলেরা নৌকা নিয়ে পুরো নদী দখলে নেয় বাঁধাজাল দিয়ে। বাঁধাজালে রেণু-পোনা শিকার চলে টানা ছয় থেকে আট মাস। মো. রহম আলী নামের এক বাসিন্দা জানান, নদীর ওই স্থানের গভীরতা অনেক বেশি। তাই সাগর থেকে মাছ তেঁতুলিয়ার দিকে তেড়ে আসে আর ওই স্থান দিয়ে সাগরে চলে যায়। তাই ওখানে বাঁধাজাল এত বেশি।

নাজিরপুরের বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী তেঁতুলিয়া নদীর দক্ষিণে যাত্রা শুরু করলাম। লোকজনের বক্তব্যের চেয়ে বাস্তবে তেঁতুলিয়ায় বাঁধাজাল আরো বেশি। দক্ষিণে তেঁতুলিয়ার ভোলা সীমান্তে চরফ্যাশন উপজেলার সব নদীর জলে শুধু বাঁধাজালেরই দেখা পাওয়া গেল। এই উপজেলার চরকুকরিমুকরি, চরকলমি, বকসি, মাইনকা, দারভাঙ্গা, ডালচর ও কচ্ছবিয়া এলাকার তেঁতুলিয়াতে বাঁধাজাল বেশি পেতে রেখেছে জেলেরা।

ওই এলাকা থেকে নৌযানে পশ্চিম দিকে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজের দক্ষিণ ও পশ্চিমে তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরঙ্গ নদীতেও বিপুল পরিমাণ বাঁধাজাল দিয়ে মাছ ধরছে জেলেরা। এসব বাঁধাজালে মাছের ডিম পর্যন্ত আটকে যায়। এসব বাঁধাজালে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইলিশের পোনা ধরা পড়ছে। অক্টোবর মাসে প্রজনন মৌসুমে ইলিশ সাগর থেকে উঠে এসে মিঠা পানিতে যে ডিম ছেড়েছে ওই ডিমের পোনাই এখন ধরা পড়ছে বাঁধায়। স্থানীয় বাজারে এই পোনা ‘চাপিলা মাছ’ নামে পরিচিত। সব বাজারে এখন চাপিলায় সয়লাব। ৪০-৫০টি চাপিলা একত্রে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। আর বাঁধাজালে শিকার অন্য প্রজাতির মাছের পোনা ‘কাচকি’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে বাঁধাজালের কারণে। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে সুতার জাল দিয়ে ইলিশ শিকারি জেলেরা ওই সব বাঁধাজাল দিয়ে রেণু কিংবা ছোট মাছ শিকারিদের ওপর ক্ষুব্ধ। তারা ইলিশ রক্ষায় সরকারের আচরণের ওপরও ক্ষুব্ধ। চরমোন্তাজের জেলে (সুতার জাল) মো. দেলোয়ার হোসেন গাজী বলেন, ‘অবরোধের (নিষেধাজ্ঞা) কালে আমরা সরকারের আদেশ মাইন্যা নদীতে-সাগরে ইলিশ ধরি না। ইলিশে ডিম ছাড়বে এই লইগ্যা। কিন্তু ডিম ছাইড়্যা লাভ অয় কী, কন। ইলিশ যে ডিম ছাড়ছে সেসবের পোনা বাঁধাজাল দিয়া জাইল্লারা ক্যামনে ধরে চোহেই দেখছেন। সরকার আমাগোরে বাধা দেয় আর এহন কোনো কিছুই করে না। নদীতে কোস্ট গার্ড, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট কেউই নাই। ইচ্ছামোত ইলিশের পোনা, চাপলি মাছ ধইরগা ব্যাচে।’ একই এলাকার বাঁধাজালের মাছ শিকারি মোহন আলী খাঁ বলেন, ‘এই জাল বাওনের লইগ্যা কোস্ট গার্ড জাইল্লাগো তোন টাহা নেয়। হ্যারা সাহায্য না করলে আমরা এই জাল বাইতাম না।’ বিষয়টি নিয়ে ১১ জন জেলের সঙ্গে কথা হয়। সবাই একই ধরনের কথা বলে। চরমোন্তাজের জেলে মো. মজির হোসেন রাঢ়ি বলেন, ‘শুধু ডিম ছাড়লেই ইলিশ হবে না। ডিমের পোনাও বড় করণের লইগ্যা সরকারের পদক্ষেপ নেওন লাগবে। এই জন্য সরকারের উচিত একটা নীতিমালা তৈরি করা। মাছ ধরারও বিধিনিষেধ জেলেদেরকে জানানো। মাছ শিকার বন্ধের সময় জেলেদের সাহায্য বা বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। না হলে ইলিশ পাওয়া যাবে না।’

বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে কাজ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বাঁধাজাল মাছ উৎপাদনে বড় অন্তরায়। ওই জালে মাছের ডিম পর্যন্ত আটকে যায়। তাই এ জাল ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। দক্ষিণাঞ্চল সামুদ্রিক মাছ উৎপাদনের ভাণ্ডার। তাই এখানকার নদীগুলোতে মাছ উৎপাদনের জন্য সব অন্তরায় দূর করতে হবে। আইনের প্রয়োগ ও জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে একটি নদীকে বাঁধাজালমুক্ত করে এর সুফল সুবিধাভোগী জেলেদের কাছে তুলে ধরতে হবে। তখন সচেতনতা বাড়বে।’

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘জেলেরা বাঁধাজাল দিয়ে মাছ ধরে আমরা জানি। কিন্তু আমাদের বাজেট বরাদ্দের অভাবে নদীতে অভিযান চালাতে পারছি না। এমনকি মা ইলিশ রক্ষায় যখন নদীতে অভিযান করা হয়েছে তখন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা নানাভাবে দেনাগ্রস্ত হয়েছেন। বাজেট পেলে আমরা নদীতে বাঁধাজালবিরোধী অভিযান চালাব।’

পটুয়াখালী জেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা ড. আবুল হাসানাত বলেন, ‘নদীতে শিগগিরই আমাদের ১৫ দিনব্যাপী বাঁধাজাল ও সব অবৈধ জালের বিরুদ্ধে একটি চিরুনি অভিযান হবে।’

কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোনের স্টাফ অফিসার অপারেশন লে. দেবায়ন চক্রবর্তী বলেন, ‘নদীতে আমাদের নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে। হয়তো বাঁধাজাল পাতার টাইমিংয়ের সঙ্গে টহল টাইমিং মিলছে না এ কারণে একটু সমস্যা হচ্ছে। তবে যেসব পয়েন্টে বাঁধাজাল আছে, সেখানে আমাদের জাহাজ কয়েক দিন নোঙর করে থাকবে। কোস্ট গার্ডের বিরুদ্ধে আর্থিক অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

 



মন্তব্য