kalerkantho


রূপের মায়াপুরী

হাকিম বাবুল, শেরপুর

৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রূপের মায়াপুরী

শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত গজনী অবকাশের কৃত্রিম ডাইনোসর। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত গজনী অবকাশ। এখানকার মেঘ-পাহাড়ের লুকোচুরি, শাল-গজারি বনের আভা, পাহাড়ি ঝরনার কলতান, রকমারি টিলা আর গারো-কোচসহ জাতিতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা মনকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। আয়তনে বড় না হলেও এর প্রাকৃতিক রূপ দেশের অন্য পাহাড়-বনের চেয়ে অনেকটা ভিন্ন। তাই এখানে এলে প্রকৃতির মায়ারূপ ভ্রমণপিপাসুদের পেছন থেকে বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে।

শেরপুর জেলা সদর থেকে আনুমানিক ২৮ কিলোমিটার দূরে ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের প্রায় ৯০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে ১৯৯৩ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অবকাশকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। পাহাড়, বনানী, ঝরনা, হ্রদ—এত সব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যেও কৃত্রিম সৌন্দর্যের অনেক সংযোজনেই গড়ে তোলা হয়েছে অবকাশকেন্দ্রটি। নির্মাণের পর থেকে প্রতিবছর ক্লান্ত জীবনের ব্যস্ততার ফাঁকে অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে হাজারো পর্যটক এখানে ভিড় করেন।

ভ্রমণবিলাসী পর্যটকদের মনকে আরেকটু দোলা দিতে এবার নতুন সাজে সেজেছে গজনী অবকাশকেন্দ্র। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নতুন করে পাহাড়ের বুকজুড়ে তৈরি করা হয়েছে সুদীর্ঘ ওয়াকওয়ে। পায়ে হেঁটে লেকের পাড় ধরে অনায়াসে হেঁটে যাওয়া যাবে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে। উঁচু পাহাড় থেকে তৈরি হয়েছে কৃত্রিম জলপ্রপাত। জলপ্রপাতের নিচে পাথরে বসে আড্ডা আর ওয়াকওয়ের পাশে লেকের ধারে মিনি কফিশপ বিনোদনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এদিকে গজনী অবকাশের পুরনো বটগাছে এবার হঠাৎ করে তৈরি হওয়া ৬৮টি মৌচাক নতুন সজ্জাকে আরো আকর্ষণীয় করেছে। প্রাকৃতিক এ মৌচাকগুলো রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ছোট পরিসরের চিড়িয়াখানায় আগে শুধু হরিণ থাকলেও তাতে নতুন করে যোগ করা হয়েছে মেছোবাঘ, অজগর, ভল্লুকসহ প্রায় ৪০ প্রজাতির বন্য প্রাণী। পড়ন্ত বিকেলে ছোট ছোট নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য রয়েছে লেক। গারো মা ভিলেজেও ছোঁয়া লেগেছে নতুনত্বের। মাশরুম ছাতার নিচে বসে কিংবা পাখি বেঞ্চে বসে পাহাড়ের ঢালে আদিবাসীদের কাজকর্ম, দিগন্তজোড়া ধান ক্ষেতের সৌন্দর্য আর পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা খুব সহজেই উপভোগ করা যাবে। শিশু দর্শনার্থীদের জন্য চুকুলুপি চিলড্রেনস পার্কের পাশাপাশি এবার নতুন যুক্ত হয়েছে শিশু কর্নার। সঙ্গে আছে শেরপুর জেলা ব্র্যান্ডিং কর্নার। ‘পর্যটনের আনন্দে, তুলসীমালার সুগন্ধে শেরপুর’—এই স্লোগানে শেরপুর জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য নির্মিত এই ব্র্যান্ডিং কর্নারে জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য সংবলিত ছবি, পুস্তক এবং ভিডিও চিত্র থাকবে। জেলার ব্র্যান্ডিং পণ্য তুলসীমালা চালের জন্যও থাকছে নির্দিষ্ট স্থান। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে কেবল কার, যা ভ্রমণপিপাসুদের অন্য রকম আনন্দ জোগাবে।

এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে গড়ে তোলা কবিতাবাগ, পদ্মসিঁড়ি, মত্স্যকন্যা, সাইটভি ওয়াচ টাওয়ার, পাতালপুরী বা ড্রাগন টানেল, মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ, রংধনু ব্রিজ, গারো মা ভিলেজ, ক্রিসেন্ট লেক, লেক ভিউ পেন্টাগন, দণ্ডায়মান জিরাফ, হাতি-বানর-বাঘ, ডাইনোসরের প্রতিকৃতি তো রয়েছেই। এসবেও নতুন রঙের প্রলেপ পড়ায় আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। প্রায় ৮০ ফুট উচ্চতার সাইটভিউ টাওয়ারে উঠলে অনায়াসে দেখা যায় পাহাড়ি টিলার অপরূপ বৈচিত্র্যময় দৃশ্য। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সুউচ্চ পাহাড়গুলোও সেখান থেকে দেখা যায়।

গজনী অবকাশ নতুন রূপে সজ্জিত করা প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘শেরপুর জেলাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে তুলে ধরতে জেলা প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করছে। এ জন্য স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাও প্রয়োজন। দীর্ঘ সীমান্ত সড়ক তৈরির ফলে গজনী অবকাশে যাতায়াত আরো সহজ হয়েছে।’

 


মন্তব্য