kalerkantho


রংপুর সিটি নির্বাচন

ভোটের মাঠে তৃতীয় লিঙ্গের নাদিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর   

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভোটের মাঠে তৃতীয় লিঙ্গের নাদিরা

নাদিরা খানম

ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর পাস তৃতীয় লিঙ্গের নাদিরা খানম রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে লড়ছেন। এ লক্ষ্যে তিনি প্রচারণা চালাচ্ছেন।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩৩টি ওয়ার্ডে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৬৫ জন প্রার্থীর মধ্যে নাদিরা একজন। মোবাইল ফোন প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। সিটি করপোরেশনের ১৮, ২০ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যা ৪০ হাজারের ওপর। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আরো চার প্রার্থী রয়েছেন।

নাদিরার মতে, হিজড়া জনগোষ্ঠীর অনেকে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে টাকা আদায় করে। এটা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। অনেক হিজড়ার কারণে সমাজে তাঁদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি নির্বাচিত হলে হিজড়া কর্তৃক জনগণকে হয়রানি বন্ধ করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবেন।

নাদিরার জন্মস্থান দিনাজপুরে হলেও তিনি ছোট থেকে বড় হয়েছেন রংপুরের লালবাগ এলাকায়। ১৯৯১ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৯৩ সালে এইচএসসি, ১৯৯৫ সালে স্নাতক (পাস) এবং ১৯৯৯ সালে স্নাতকোত্তর করেন। বর্তমানে তিনি তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি। তাঁর সংগঠনের সদস্যসংখ্যা ৩৭০। তৃতীয় লিঙ্গ হওয়ায় নির্বাচন কমিশন থেকে কোনো বাধা আসবে কি না, জানতে চাইলে নাদিরা বলেন, ‘দেশে যেহেতু তৃতীয় লিঙ্গের ভোটে দাঁড়ানোর অধিকার নেই, তাই আমি নারী হিসেবে ভোটার হয়েছি।’

রংপুর নগরের লালবাগ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন এই প্রার্থী। নির্বাচনী প্রচারণায় দিন-রাত ব্যস্ত থাকছেন। তিনি জানান, ১৯৯১ সালে এসএসসি পাস করেন। থাকতেন দিনাজপুর নিউ টাউনের বাড়িতে। আদমজী জুট মিলসের উৎপাদন ব্যবস্থাপক সিরাজুল ইসলামের চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বড় বোনের তত দিনে বিয়ে হয়ে গেছে। আর ছোট বোনের বিয়ের কথা পাকাপাকি। হঠাৎ বরপক্ষ থেকে কথা উঠল, মেয়ের বড় বোন ‘হিজড়া’। এই পরিবারে বিয়ে করলে তাদের উত্তরসূরিরা হিজড়া হতে পারে। বিয়েটা ভেঙে গেল। এই কষ্টে তিনি চলে গেলেন দিনাজপুরের পার্বতীপুরে তাঁর মামার বাড়িতে। সেখানে মামার এক নিঃসন্তান বন্ধু তাঁকে সন্তান হিসেবে লালন-পালনের দায়িত্ব নিলেন। দিনাজপুর আদর্শ ডিগ্রি কলেজ থেকে তাঁকে স্নাতক পাস করালেন। এরপর ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর পাস করলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। রাজশাহীতে নাদিরা পালক বাবার সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ভাড়া বাসায় থেকে পড়াশোনা শেষ করেন ১৯৯৯ সালে।

২০০৬-০৭ সালের দিকে নাদিরার পরিচয় হয় রংপুরের তৃতীয় লিঙ্গের নূরজাহানের সঙ্গে। তাঁর পরামর্শে রংপুর চলে আসেন তিনি। তৃতীয় লিঙ্গের উন্নয়নে দাঁড় করান ‘ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থা’। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-ব্যক্তির কাছ থেকে অনুদান নিয়ে তিনি এখন ৩৭০ জন তৃতীয় লিঙ্গের উন্নয়নে কাজ করছেন।

নাদিরা বলেন, ‘আমার মতো যারা তৃতীয় লিঙ্গ এবং হতদরিদ্র মানুষ, তারা বাস্তবের সঙ্গে যুদ্ধ, সংগ্রাম করছে। এমন মানুষদের যেন সেবা করতে পারি।’ তাঁর মতে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও কিছু কাজ করতে পারে। সমাজে তাদেরও কিছু অংশীদারি আছে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি আরো বলেন, ‘সাধারণ ভোটারের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আরেকটু চেষ্টা করলে জয় নিশ্চিত হবে।’ এ বিষয়ে রংপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সাহতাব উদ্দিন বলেন, ‘ভোটার তালিকায় নারী হিসেবে নাদিরার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাই তাঁর নির্বাচন করতে আপাতত কোনো বাধা নেই।’



মন্তব্য